২০২৬ বিশ্বকাপে রোনালদোর শুরুটা ভালো হলো না, ধুঁকছে পর্তুগাল
২০২৬ বিশ্বকাপে রোনালদোর শুরুটা ভালো হলো না

২০২৬ বিশ্বকাপে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর শুরুটা ভালো হয়নি। অনেক দিক থেকে দেখলে, এটা আসলে তাঁর দোষ নয়। আপনাকে যদি দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্রয় দেওয়া হয় এবং প্রতিনিয়ত বলা হতে থাকে যে আপনি এখনো আগের মতোই সব করতে পারেন, তাহলে আপনিও সেটিই বিশ্বাস করবেন। চারপাশের সব প্রমাণ যখন খুব স্পষ্টভাবে দেখায় যে আপনার সেই চেনা সামর্থ্য আর নেই, তখনো আপনি খেলা চালিয়ে যেতে চাইবেন। এটাই তো স্বাভাবিক মানুষের মনস্তত্ত্ব।

যদি এমন একজন কোচ আপনাকে নিয়মিত মূল একাদশে রাখেন, যিনি সবার চোখে পড়া কঠিন বাস্তবতাটি স্রেফ উপেক্ষা করে যান, তবে আপনার মনে হতেই পারে যে জাদুকরি সেই সামর্থ্য এখনো আপনার ভেতরে অক্ষুণ্ন আছে। যখন আপনি এমন একটি স্টেডিয়ামে প্রবেশ করেন, যেখানে হাজারো মানুষ এসেছে বিশেষভাবে কেবল আপনাকে দেখতে; আর গ্যালারিতে কোনো ভক্তের হাতে লেখা থাকে—‘বিশ্বকাপ থাক বা না থাক, আপনি সব সময়ই আমার সর্বকালের সেরা’—তখন নিজেকে অপরিহার্য মনে হওয়াই সংগত।

আসলে বিদায় বলা বা ছেড়ে দেওয়া বড় কঠিন। বিশেষ করে যখন চোখের সামনে প্রতিনিয়ত নতুন কোনো মাইলফলক উঁকি দিতে থাকে। ক্যারিয়ারে এক হাজার গোলের এক সম্মোহনী লক্ষ্য সামনে ঝুলছে। খেলার জন্য সামনে রয়েছে আরেকটি বড় টুর্নামেন্ট। এর ওপর যখন আপনার সমসাময়িকেরা ও পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বীরাও এখনো মাঠ মাতিয়ে যাচ্ছেন, তখন থামার সিদ্ধান্ত নেওয়া আরও বেশি জটিল হয়ে পড়ে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কিন্তু রূঢ় বাস্তবতা হলো, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো আর সেটি করতে পারছেন না। অন্তত পর্তুগালের মতো বিশ্বসেরা দলের হয়ে যে মানের পারফরম্যান্স প্রয়োজন, তার ধারেকাছেও তিনি এখন যেতে পারছেন না। অথচ কাগজে-কলমে পর্তুগালকে এই বিশ্বকাপের অন্যতম শক্তিশালী দল ধরা হয়। বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচে এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে রোনালদো মাঠে কার্যত কিছুই করতে পারেননি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এমনও নয় যে তিনি খুব বাজে ফুটবল খেলছিলেন। বরং সত্যিটা হলো, তিনি খেলার মধ্যেই ছিলেন না বললেই চলে। মাঠে তাঁর উপস্থিতি ছিল একধরনের শূন্যতা। তাত্ত্বিকভাবে তিনি রক্তমাংসের একজন ফুটবলার হলেও বাস্তবে যেন ছিলেন কেবল এক চেনা ছায়ামূর্তি। এমন এক আত্মা, যার খেলায় কোনো দৃশ্যমান অস্তিত্ব বা প্রভাব ছিল না। ভুল শট, বাজে পাস কিংবা চোখে পড়ার মতো কোনো বড় ভুল—এসবের কিছুই তিনি করেননি। তেমন কিছুই ঘটেনি, যেগুলো জোড়া লাগিয়ে কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে হাস্যরসের ভিডিও বানাতে পারে। আসলে পুরো ম্যাচে তাঁর তরফ থেকে দেখার মতো কিছুই ছিল না।

বিরতির পর অবশ্য রোনালদো দুটি শট নিয়েছিলেন। দুটি শটই প্রায় একই রকম। গোললাইনের কাছ থেকে কাটব্যাক পেয়ে নেওয়া শট, যা কাছের পোস্টের বাইরে দিয়ে চলে যায়। এই দুটি সুযোগের কোনোটিই একেবারে নিশ্চিত গোলের সুযোগ ছিল না। যদিও অনেকে বলবেন, নিজের সোনালি সময়ে থাকা রোনালদো হয়তো এমন সুযোগ অনায়াসেই জালে জড়িয়ে দিতেন। প্রথম সুযোগটি এসেছিল এমন একটি পাস থেকে, যা তাঁর কিছুটা পেছনে ছিল এবং সেখান থেকে বল গোলমুখে পাঠানো বেশ কঠিন ছিল। আর দ্বিতীয় সুযোগটি ছিল কিছুটা প্রতীকী। কারণ, রোনালদো যদি বলটি ছেড়ে দিতেন, তবে তাঁর ঠিক পেছনে থাকা ব্রুনো ফার্নান্দেস আরও ভালো অবস্থানে থেকে শট নেওয়ার সুযোগ পেতেন।

ফক্স স্পোর্টসের ম্যাচ বিশ্লেষণে সাবেক ফরাসি তারকা থিয়েরি অঁরি এই বিষয়টিই তুলে ধরেছেন, ‘দলের গোল প্রয়োজন। সেটা তোমারই (রোনালদোর) করতে হবে এমন নয়।’ অঁরির ইঙ্গিত ছিল পরিষ্কার—রোনালদো যেন দলের চেয়ে নিজের গোলের কথাই বেশি ভাবছিলেন। তিনি আরও যোগ করেন, ‘সে যদি ছয় গজের বক্সের দিকে চলে যেত, তাহলে ব্রুনো ফার্নান্দেসের জন্য এটি সহজ এক ট্যাপ-ইন গোল হতে পারত।’

আবারও প্রায় কিছুই না। ম্যাচের বাকি সময়ে রোনালদোকে ঘিরে উল্লেখ করার মতো আর তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত সম্ভবত ওই দুটি মিস করা সুযোগের কোনোটিই ছিল না। সেটি ছিল কিছুক্ষণ পরের একটি ঘটনা। ডান দিক থেকে একটি দুর্দান্ত ক্রস আসে। রোনালদো তখন দূরের পোস্টে পজিশন নিয়েছিলেন। বলের গতিপথটি দেখতে বেশ ভালোই ছিল। ঠিক সেই ধরনের বল, যেগুলোতে একসময় রোনালদো অসাধারণ ভঙ্গিতে বাতাসে লাফিয়ে উঠে হেড করে গোল করতেন। কিন্তু এবার তিনি ওপরে উঠলেন না। আক্ষরিক অর্থেই উঠলেন না, তিনি লাফই দিলেন না। কেন? তিনি কি আর পারছিলেন না, নাকি চাইলেন না? কে জানে! শেষ পর্যন্ত বলটি হেডে ক্লিয়ার করে দেন ডিআর কঙ্গোর ডিফেন্ডার শানসেল এমবেম্বা। যা একসময়কার বিধ্বংসী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বিপক্ষে খুব সাধারণ একটি ডিফেন্ডিংয়ে পরিণত হয়।

ওই সুযোগগুলোর কিছুক্ষণ পর স্টেডিয়ামে থাকা হাজার হাজার পর্তুগাল সমর্থক রোনালদোর নাম ধরে গান গাইতে শুরু করেন। তাঁকে জাগিয়ে তোলার এক আকুল চেষ্টা করছিলেন তাঁরা। অতীতে যেসব অসাধারণ মুহূর্ত তিনি তৈরি করতেন, সে রকম আরেকটি জাদুকরি মুহূর্ত যেন ঘটিয়ে তোলার প্রার্থনা ছিল সেটি। রোনালদোও সেই স্লোগানে সাড়া দেন। হয়তো তিনিও নিজের ভেতর ঘুমিয়ে থাকা সেই পুরোনো সত্তাকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু তিনি পারেননি।

এই মুহূর্তে ৪১ বছর বয়সী রোনালদোকে মাঠে রাখার পক্ষে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য যুক্তি হলো, তিনি প্রতিপক্ষের মনোযোগ নিজের দিকে টেনে নেন, যার সুবিধা তাঁর সতীর্থরা নিতে পারেন। বিবিসির বিশ্লেষণে সাবেক ইংলিশ স্ট্রাইকার ওয়েইন রুনি বলেছিলেন, ম্যাচের একটা বড় সময় রোনালদো অফসাইড পজিশনে দাঁড়িয়ে থাকেন। রুনির ভাষ্যমতে, ‘এর মানে এই নয় যে তিনি অলসতা করছেন, বরং এটা তাঁর বুদ্ধিমত্তা। তিনি ডিআর কঙ্গোর রক্ষণভাগকে তাঁকে খুঁজতে বাধ্য করছেন, যা তাঁর সতীর্থদের জন্য ফাঁকা জায়গা তৈরি করে দিচ্ছে। এর আরেকটি সুবিধা হলো, বল যখন উইংয়ে চলে যায়, তখন তিনি আবার অফসাইড পজিশনে ফিরে এসে বড় রকমের বিপদ তৈরি করতে পারেন।’

সমস্যা হলো, রোনালদো এখন আর সেই ধরনের কোনো বিপদ তৈরি করতে পারছেন না। কারণ, সেই অতিমানবীয় ক্ষমতা তাঁর আর নেই। আর প্রতিপক্ষও এখন সেটা খুব ভালো করেই জানে। ম্যাচের পর ডিআর কঙ্গোর খেলোয়াড়েরা এতটাই বিচক্ষণ ও সম্মানজনক আচরণ করেছেন যে তারা সরাসরি এ নিয়ে কোনো খোঁচা দেননি। কিন্তু এটা স্পষ্ট যে তারা মাঠের ভেতরের আসল সত্যটা জানেন। কঙ্গোর মিডফিল্ডার এনগালায়েল মুকাউ যেমন বললেন, ‘আমরা জানতাম সে আগের মতো নেই, তাই জানতাম সে কম দৌড়াবে। আমি হয়তো তার কাছ থেকে একটু বেশি আশা করেছিলাম, কিন্তু এটা স্বাভাবিক, তার বয়স তো হয়েছে। তার বিপক্ষে খেলতে পারা সম্মানের বিষয়।’

আবারও বলতে হয়, এর জন্য রোনালদোকে পুরোপুরি দায়ী করা যায় না। ম্যাচের পর পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্তিনেজ শুধু তাঁকে দলে রাখার সিদ্ধান্তই নয়, পুরো ৯০ মিনিট মাঠে রাখার সিদ্ধান্তও জোরালোভাবে সমর্থন করেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘যে ম্যাচে আমাদের গোল দরকার, সেখানে ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার কোনো অর্থ হয় না।’ সম্ভবত কোচ ইচ্ছা করে বলেননি, কিন্তু তিনি সেখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করেছেন—‘ইতিহাস’। রোনালদো এখন শুধুই ইতিহাস, অতীত।

আর এটি নতুন কোনো বিষয় নয়। এমনও নয় যে মার্তিনেজ এটা আগে থেকে বুঝতে পারতেন না। ডিআর কঙ্গো ম্যাচটি ছিল বড় টুর্নামেন্টে টানা দশম ম্যাচ, যেখানে রোনালদো কোনো গোল করতে পারলেন না। যদি মার্তিনেজ তাঁকে একধরনের প্রতীকী চরিত্র হিসেবে দলে রাখতেন, যাঁকে দেখে অন্য তরুণ খেলোয়াড়েরা অনুপ্রাণিত হবেন অথবা বেঞ্চে রাখা একটি ‘জরুরি অবস্থায় ব্যবহারযোগ্য’ বিকল্প হিসেবে রাখতেন—যেমনটা কার্লো আনচেলত্তি ইদানীং নেইমারের ক্ষেত্রে ভেবেছেন—অথবা শুধু বিশেষজ্ঞ পেনাল্টি শুটার হিসেবে ব্যবহার করতেন, তবে সেটি যুক্তিযুক্ত হতো। কিন্তু তিনি এখনো বিশ্বকাপের অন্যতম প্রতিভাবান উইঙ্গার ও মিডফিল্ডারদের আক্রমণভাগের প্রধান অস্ত্র হিসেবে এমন একজন খেলোয়াড়কে টানা খেলিয়ে যাচ্ছেন, যিনি ম্যাচের বেশির ভাগ সময় কেবল হেঁটে বেড়ান এবং গোল করার মতো তেমন কোনো হুমকি তৈরি করতে পারেন না।

আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে বাছাইপর্বের শেষ ম্যাচের আগেরটিতে পাওয়া লাল কার্ডের কারণে যদি রোনালদো নিষিদ্ধ থাকতেন এবং রহস্যজনকভাবে তিন ম্যাচের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে দুই ম্যাচের মওকুফ না পেতেন, তাহলে মার্তিনেজ ও পর্তুগালের অবস্থা আরও আগেই পরিষ্কার হতো। গত মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক ফুটবলে যা ঘটেছে, তার সঙ্গে তুলনা করলে বিষয়টি আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেদিন ফুটবলের অন্য বড় তারকারা দারুণভাবে নিজেদের সামর্থ্য দেখিয়েছেন। নরওয়ের হয়ে আর্লিং হলান্ড দুটি গোল করেছেন। ফ্রান্সের হয়ে কিলিয়ান এমবাপ্পের গোলও দুটি। আর ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যক্তিগত দ্বৈরথের আরেক নাম, লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে করেছেন চোখধাঁধানো হ্যাটট্রিক। অথচ রোনালদো সেখানে নিষ্প্রভ।

ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর রোনালদো ধীরে ধীরে সরাসরি টানেলের দিকে হাঁটা শুরু করেন। পথের মাঝামাঝি গিয়ে তিনি ক্ষণিকের জন্য থেমেছিলেন, পেছনে ঘুরে কয়েকজন সতীর্থ ও প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের সঙ্গে হাতও মিলিয়েছেন। তারপর আবার ঘুরে মাঠ ছাড়ার পথ ধরেন। পর্তুগালের অধিকাংশ খেলোয়াড় তখন মাঠে জড়ো হয়ে সমর্থকদের হাততালি দিয়ে অভিনন্দন জানাচ্ছিলেন। রোনালদো ততক্ষণে স্টেডিয়ামের ভেতরে চলে গেছেন। এমন কিছু ঘটেনি, যা দেখে বলা যাবে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে সতীর্থদের বা সমর্থকদের উপেক্ষা করেছেন। কিন্তু তিনি শুধু...চলে গিয়েছিলেন। একা। নিজের মতো। সতীর্থদের কোনো কাজে না লেগে। রূপক হিসেবে দেখলে বিষয়টি খুব সূক্ষ্ম নয়, বরং ভীষণ স্পষ্ট। অনেক দিক থেকে দেখলে, এটা আসলে তাঁর একক কোনো দোষ নয়। কিন্তু নিষ্ঠুর সত্য হলো, তিনি আর পারছেন না।