বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল ব্রাজিল। স্টেডিয়াম ছাড়ার সময় কেমন যেন শূন্য শূন্য লাগল। একজন ব্রাজিল সমর্থক হিসেবে আর দশটা মানুষের মতো আমিও চেয়েছিলাম দলটা জিতুক, কোয়ার্টার ফাইনালে উঠুক। কিন্তু নিয়তির লেখা হয়তো অন্য রকম ছিল। তাই আফসোস ছাড়া আর কিছুই করার নেই।
সহজ সুযোগ নষ্টের মহড়া
ব্রাজিলের এই হারের ময়নাতদন্ত করতে গেলে সবার আগে চোখে পড়বে সহজ সব গোলের সুযোগ নষ্টের মহড়া। ফুটবল তো আসলে গোলের খেলা, আর জেতার জন্য গোলটাই সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল। সেই সুবর্ণ সুযোগ ছিল শুরুতেই পেনাল্টি থেকে। কিন্তু গ্যালারিতে বসে থেকেও একটা হিসাব মেলাতে পারলাম না, ভিনিসিয়ুসের মতো তারকা থাকতে পেনাল্টিটা কেন ব্রুনো গিমারাইস নিতে গেলেন?
পেনাল্টি মিসের পরও গোলের জন্য অনেক সময় ছিল। কিন্তু ফিনিশিং হলো না। এনদ্রিক গোলকিপারকে একা পেয়েও বলটা বাইরে মেরে দিলেন। এমন আরও কয়েকটা সুযোগ হাতছাড়া করার খেসারতই দিতে হলো শেষ পর্যন্ত। গোল করতে না পারলে ম্যাচ জেতা যায় না—এই চিরন্তন সত্যটা আরেকবার নির্মমভাবে উপলব্ধি করল ব্রাজিল।
নরওয়ের গোলকিপারের অসাধারণ পারফরম্যান্স
নরওয়ের গোলকিপার ওরইয়ান নিলান্ডের প্রশংসা না করলে অন্যায় করা হবে। গ্লাভস হাতে তিনি যা খেলেছেন, কোনো প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। অসাধারণ, অনবদ্য গোলকিপিং! জোড়া গোল করে আর্লিং হলান্ড যদি নরওয়েকে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ আটে তুলে থাকেন, তবে সেই কৃতিত্বের একটা বড় অংশীদার তাঁদের এই প্রাচীর হয়ে দাঁড়ানো গোলকিপারও। আমার চোখে ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় তিনিই।
হলান্ডের গোলমেশিন পারফরম্যান্স
অবশ্য নরওয়ের ফরোয়ার্ড লাইন এমনিতেও বেশ উঁচু মানের, বিশেষ করে যেখানে হলান্ডের মতো গোলমেশিন থাকে। ম্যাচের আগে অনেকেই বলছিলেন, লড়াইটা আসলে ব্রাজিল বনাম হলান্ড হতে যাচ্ছে। হলান্ড আবারও প্রমাণ করলেন কেন তাঁকে নিয়ে এত আলোচনা। এই মুহূর্তে ‘নাম্বার নাইন’ পজিশনে হলান্ড বিশ্বের শীর্ষ দুইয়ের একজন, অন্যজন নিশ্চিতভাবেই ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন।
ব্রাজিলের খেলায় ছন্দের অভাব
আমি বলব না ব্রাজিল খুব বাজে ফুটবল খেলেছে। তবে তাদের যেভাবে খেলা উচিত ছিল, সেই চেনা ছন্দটা উপহার দিতে পারেনি। বল পজেশন একেবারে যাচ্ছেতাই—মাত্র ৩৪ শতাংশ! অন্যদিকে নরওয়ে ৬৬ শতাংশ।
নরওয়ে যখন প্রথম গোলটা করল, বিশাল স্টেডিয়ামের বড় অংশেই পিনপতন নীরবতা নেমে এল। ব্রাজিলের হাজারো সমর্থকের বুকে তখন প্রথম ধাক্কা। আর দ্বিতীয় গোলের পর? চারপাশের গ্যালারিতে বাঁধভাঙা কান্না আর হাহাকার। অনেককে দেখলাম, চোখের জল মুছতে মুছতে খেলা শেষ হওয়ার আগেই আসন ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। আমি যেখানে বসেছিলাম, তার চারপাশটা ব্রাজিলের সমর্থকে ঠাসা ছিল। সবার চোখে-মুখে তীব্র বেদনা আর স্তব্ধতা। ফুটবলের এই সৌন্দর্যটাই কখনো কখনো কতটা নিষ্ঠুর আর হতাশার হতে পারে, তা গ্যালারিতে বসে টের পেয়েছি।
ব্রাজিলের বিশ্বকাপ যাত্রা নড়বড়ে
সত্যি বলতে, ব্রাজিলের এবারের বিশ্বকাপ–যাত্রাটাই কেমন যেন নড়বড়ে ছিল। মরক্কোর সঙ্গে কোনোমতে ১-১ গোলে ড্রতে শুরু করা দলটার খেলা আস্তে আস্তে কিছুটা উন্নত হলেও, তা কখনোই ‘ব্রাজিলিয়ান ঘরানার’ ফুটবল হয়ে উঠতে পারেনি।
এই দলে একজন নির্ভরযোগ্য ‘নাম্বার নাইন’ বা খাঁটি স্ট্রাইকারের বড্ড অভাব। স্ট্রাইকার না থাকলে গোল আসবে কোত্থেকে? রক্ষণে লেফট ব্যাক আর রাইট ব্যাক পজিশন দুটি একদমই কার্যকর ছিল না, মাঝমাঠের সেই ধার বা নিয়ন্ত্রণও চোখে পড়েনি। এত এত খামতি নিয়ে ম্যাচ জেতা কঠিন, বিশেষ করে নরওয়ের মতো দলের বিপক্ষে, যারা মাঠে ব্রাজিলকে এক ইঞ্চি জমি ছাড়েনি।
নরওয়ের ঐতিহাসিক জয়
আমি ভাবিনি ব্রাজিল বিশ্বকাপের শেষ ১৬ থেকেই বিদায় নেবে। তবে মাঠের খেলা দেখে বলতে বাধ্য হচ্ছি, এই ম্যাচে জয়টা নরওয়েরই প্রাপ্য ছিল। এমনকি ইতিহাস ঘাঁটলেও দেখা যায়, নরওয়ের সঙ্গে আগের চারটি ম্যাচের দুটিতে হেরেছিল ব্রাজিল, আর দুটি ড্র হয়েছে। সেই হিসাবে নরওয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বই ধরে রাখল। ব্রাজিলের কাছে নরওয়ে হয়ে থাকল চির দুঃখের এক নাম।
ব্রাজিলের এই হারে স্বাভাবিকভাবেই মনটা ভীষণ খারাপ। শুধু আমার কেন, দূর বাংলাদেশে থাকা কোটি কোটি ব্রাজিল সমর্থকের বুক ভেঙেছে। অন্তত সেমিফাইনাল পর্যন্ত গেলেও মনকে একটা সান্ত্বনা দেওয়া যেত। কিন্তু ব্রাজিল কোয়ার্টার ফাইনালেও যেতে পারবে না—এটা মেনে নেওয়া কষ্টেরই।
অবশ্য বিশ্বকাপ শুরুর আগে কিন্তু আমরা কেউ ব্রাজিলকে ফেবারিট বলিনি। ফেবারিট হিসেবে নাম এসেছিল ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, স্পেন, পর্তুগালের। স্পেন-পর্তুগাল মুখোমুখি লড়াইয়ে একদল বিদায় নেবে, অর্থাৎ ফেবারিটদের তালিকাটা আরও ছোট হয়ে আসছে। তবে দল যা–ই থাকুক না কেন, ব্রাজিলের বিদায়ে বিশ্বকাপ যে কিছুটা হলেও জৌলুশ হারাবে, তাতে সংশয় নেই।
নরওয়ের সমর্থকদের উল্লাস দেখে একদিক থেকে ভালো লেগেছে, তাদের জন্য এই জয় যেন আকাশের তারা হাতে পাওয়ার মতো এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কিন্তু এনদ্রিক যদি ওই সহজ সুযোগটা নষ্ট না করতেন বা পেনাল্টি থেকে গিমারাইস যদি গোলটা পেয়ে যেতেন, ম্যাচের গল্পটা হয়তো অন্য রকম হতো। কিন্তু ফুটবল কোনো ‘যদি-কিন্তু’র ধার ধারে না। যা হওয়ার তা হয়ে গেছে।
ব্রাজিলের বিদায়ে কষ্ট থাকলেও একজন ফুটবলার ও ফুটবলপ্রেমী হিসেবে বিশ্বকাপের বাকি অংশটা উপভোগ করার চেষ্টা করব আমি। ১০ তারিখে একটা কোয়ার্টার ফাইনাল গ্যালারিতে বসে দেখার ইচ্ছা আছে।
লেখক: বাংলাদেশ ফুটবল দলের অধিনায়ক



