ইরানি অ্যাথলেটদের পালানোর লড়াই: খেলার মাঠ থেকে রাজনৈতিক চাপে বিদেশে আশ্রয়
ইরানি অ্যাথলেটদের পালানোর লড়াই: রাজনৈতিক চাপে বিদেশে আশ্রয়

ইরানি অ্যাথলেটদের জন্য আন্তর্জাতিক মঞ্চ: খেলা নাকি পালানোর পথ?

আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে পদক জয়ের প্রতিযোগিতা এখন ইরানি অ্যাথলেটদের কাছে পেছনে ফেলে দিয়েছে। তাদের জন্য প্রতিযোগিতা হয়ে উঠেছে দেশ থেকে পালানোর একটি সুযোগ। গত মার্চ মাসের শুরুতে অস্ট্রেলিয়ায় নারী এশিয়ান কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়ার পর ইরানি নারী ফুটবল দলের বেশ কয়েকজন সদস্য আর দেশে ফেরেননি। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই পলায়ন মোটেও অপ্রত্যাশিত ছিল না, বরং এটি একটি ক্রমবর্ধমান প্রবণতা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

রাজনৈতিক চাপের নিচে নারী ফুটবলাররা

এবারের টুর্নামেন্টটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে যখন ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত বিমান হামলা চলছিল। নিজ দেশের শাসকগোষ্ঠী যখন টিকে থাকার লড়াইয়ে মগ্ন, তখন নারী ফুটবলারদের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল আতশি কাঁচের নিচে। প্রথম ম্যাচে জাতীয় সংগীত গাইতে অস্বীকার করলেও পরিবারের ওপর হুমকির মুখে পরবর্তীতে তারা তা গাইতে বাধ্য হন। রক্ষণশীল মহল তাদের ‘যুদ্ধকালীন বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে আখ্যা দেন, যা তাদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তোলে এবং দেশ ছাড়ার পথকে আরও জরুরি করে তোলে।

পাওয়ারলিফটার থেকে কুস্তিগির: পালানোর গল্প

দেশ ছাড়ার এই তালিকায় শুধু ফুটবলাররাই নন, রয়েছেন পাওয়ারলিফটার আমির আসাদোল্লাহজাদেহর মতো অ্যাথলেটরাও। ২০২১ সালে নরওয়েতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ চলাকালীন তাকে নিহত জেনারেল কাশেম সোলাইমানির ছবি সম্বলিত টি-শার্ট পরতে চাপ দেওয়া হয়। আসাদোল্লাহজাদেহ বলেন, ‘আমি অস্বীকৃতি জানালে আমাকে বলা হয়, দেশে ফিরলে জেল, নির্যাতন এমনকি ফাঁসিও হতে পারে।’ প্রাণ বাঁচাতে ভোররাতে হোটেল ছেড়ে ২০০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে তিনি নরওয়েতে আশ্রয় নেন।

ইরানি অ্যাথলেটদের বিদেশ সফরের সময় ‘হরাসাত’ নামক বিশেষ নিরাপত্তা রক্ষীরা সবসময় নজরদারি করেন। অনেক সময় দেশ ছাড়ার আগে অ্যাথলেটদের পরিবারের সম্পত্তি বা অর্থ বন্ধক রাখা হয়, যাতে তারা পালিয়ে গেলে তা বাজেয়াপ্ত করা যায়। এক অ্যাথলেটের ভাষ্যে, তিনি সাতবার চেষ্টা করার পর অবশেষে জার্মানিতে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

খেলাধুলা ও রাজনীতির অদৃশ্য সীমানা

সাবেক কুস্তিগির সারদার পাশায়ির মতে, ইরানে খেলাধুলা এবং রাজনীতি আলাদা নয়। তিনি বলেন, ‘এই দলটি জনগণের নয়, বরং ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতিনিধিত্ব করে।’ অন্যদিকে, সাবেক ফুটবলার শিভা আমিনি জানান, ২০১৭ সালে হিজাব ছাড়া খেলার ছবি ভাইরাল হওয়ায় তাকে শিরশ্ছেদ করার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ইরানি ফেডারেশন নারী দলকে কেবল ফিফার নিয়ম রক্ষার জন্য টিকিয়ে রেখেছে, তাদের কোনও মর্যাদা বা স্বাধীনতা নেই।

এই পরিস্থিতি ইরানি অ্যাথলেটদের জন্য ক্রীড়া ক্ষেত্রকে একটি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত করেছে, যেখানে প্রতিটি আন্তর্জাতিক সফর পালানোর একটি সম্ভাব্য সুযোগ হিসেবে দেখা হয়। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর প্রতিবেদন অনুসারে, এই প্রবণতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ইরানের ক্রীড়া ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে গভীর সংযোগকে উন্মোচিত করে।