বাফুফের জাতীয় দলের কোচ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বিপুল সংখ্যক আবেদন জমা পড়েছে, যা হয়তো বাফুফের কর্তা ব্যক্তিরাও ভাবেননি। ইউরোপ, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকা থেকে হামজা-জামালদের কোচ হতে অসংখ্য জীবনবৃত্তান্ত জমা পড়েছে। নতুনদের পাশাপাশি দু-একজন পুরনো কোচও আবেদন করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম ইংলিশ কোচ জেমি ডে, যিনি হাভিয়ের কাবরেরার আগে দীর্ঘ সময় জামালদের ডাগআউটে ছিলেন।
জেমি ডের পটভূমি
২০২২ সালে বাংলাদেশ অধ্যায় শেষ করার পর গত চার বছর ইংল্যান্ডের চতুর্থ টায়ারের তিনটি ক্লাবে সহকারী কোচ হিসেবে কাজ করেছেন ডে। ২০১৮ সালে দায়িত্ব নেওয়া এই কোচের অধীনে ২৯ ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। সাফল্যের হার মাত্র ৩১.০৩ শতাংশ—৯ জয়ের বিপরীতে ১৫ হার ও ৫টি ড্র। টানা ব্যর্থতার কারণে চুক্তির মেয়াদ থাকা সত্ত্বেও ২০২১ সালের অক্টোবরে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি তাকে। পরে দেশে ফিরে গেছেন এবং বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কও ছিন্ন হয়। তবে তার অধীনেই বাংলাদেশ অলিম্পিক দল ২০১৮ এশিয়াডের দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠেছিল।
সাক্ষাৎকারের সংক্ষিপ্ত বিবরণ
উয়েফা প্রো লাইসেন্সধারী এই কোচ নতুন করে কেন বাংলাদেশের দায়িত্ব নিতে চান এবং নিজেকে কেন যোগ্য মনে করছেন, তা নিয়ে ইংল্যান্ড থেকে বাংলা ট্রিবিউনকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন ৪৬ বছর বয়সী এই কোচ।
প্রশ্ন: চার বছর পর আবারও বাংলাদেশ দলের কোচ হতে আবেদন করলেন কেন?
জেমি ডে: বর্তমানে ইংল্যান্ডের একটি পেশাদার ক্লাবের সঙ্গে আমার চুক্তি রয়েছে। তবে বাংলাদেশ জাতীয় দলের দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়টি আমাকে বেশ আকৃষ্ট করে। তাই নতুন করে আবেদন করেছি।
প্রশ্ন: আপনার বিদায়টা তো সুখকর ছিল না...
জেমি ডে: কাজের ক্ষেত্রে অনেক কিছুই হতে পারে। গতবার খেলোয়াড়দের সঙ্গে কাজ করাটা দারুণ উপভোগ করেছি। আমরা মাঠে যেমন কিছু চমৎকার স্মৃতি তৈরি করেছি, তেমনি মাঠের বাইরেও আমার অনেক ভালো বন্ধু তৈরি হয়েছে। তাই এখানে অন্য কিছু ভাবার নেই।
প্রশ্ন: এখন দলে হামজা চৌধুরীর মতো খেলোয়াড় আছে, রয়েছে আরও বংশোদ্ভূত ফুটবলার। দলের মানও কিছুটা বেড়েছে—এগুলো কি আপনাকে আকৃষ্ট করেছে?
জেমি ডে: হ্যাঁ, তা বলতে পারেন। বাইরের দেশ থেকে আসা খেলোয়াড়দের সমন্বয়ে বর্তমান স্কোয়াডটি আগের চেয়ে শক্তিশালী মনে হচ্ছে। আর তাবিথ (বাফুফে সভাপতি) একজন ভালো মানুষ। একজন পেশাদার কোচ হিসেবে আমি নিজেকে যোগ্য মনে করি। বাংলাদেশ দলকে নতুন করে কিছু শেখাতে পারবো, কিছু দেওয়ারও ইচ্ছে আছে।
প্রশ্ন: প্রায় ৩০০ জীবনবৃত্তান্ত জমা পড়েছে। বিশ্বকাপে কাজ করা কোচও আছেন। আপনি নিজেকে নিয়ে কতটা আত্মবিশ্বাসী?
জেমি ডে: আমি জানি অনেক অভিজ্ঞ ও হাই-প্রোফাইল কোচ এই পদের জন্য আবেদন করবেন। এমনকি আগের কোচরাও ফিরতে চাইতে পারেন। তাই প্রতিযোগিতা কঠিন হবে। তবে আমি বাংলাদেশকে চিনি। যুক্তরাজ্যে কাজ করে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, তাতে আমি এখন আগের চেয়ে অনেক উন্নত কোচ। সুযোগ পেলে হামজাদের নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই—এ বিষয়ে আমি আত্মবিশ্বাসী।
প্রশ্ন: আপনি যদি দায়িত্ব না পান...
জেমি ডে: যিনিই দায়িত্ব পান, আমার প্রত্যাশা থাকবে তিনি যেন বাংলাদেশের ফুটবলকে আরও উন্নতির দিকে নিয়ে যান এবং সফলতা পান। হামজা ও অন্যান্য খেলোয়াড়দের আগমনে দলটি আরও শক্তিশালী হয়েছে। ঘরোয়া লিগ বা তৃণমূল পর্যায়ে কাঠামোগত উন্নয়ন কতটা হয়েছে, তা নিশ্চিত নই। তবে মূল স্কোয়াড শক্তিশালী হওয়ায় যে কোনও প্রতিযোগিতায় ভালো করার সুযোগ এখন অনেক বেশি।
প্রশ্ন: আপনার সময়ে বাংলাদেশ দল ডিফেন্সিভ ফুটবল খেলতো, এখন আক্রমণাত্মক ফুটবলে ঝুঁকছে...
জেমি ডে: অনেক হাই-প্রোফাইল কোচ আবেদন করছেন, যা হয়তো তাদের দৌড়ে কিছুটা এগিয়ে রাখবে। তবে আপনার হাতে যখন শক্তিশালী খেলোয়াড় থাকে, তখন আরও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে পারেন। আধুনিক ফুটবলে আক্রমণ ও রক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি।
প্রশ্ন: আপনার সময়ে সাফল্যের পরিসংখ্যান খুব একটা স্বস্তিদায়ক ছিল না...
জেমি ডে: প্রবাসী খেলোয়াড়রা যুক্ত হওয়ায় সমর্থকরা এখন ভালো ফল আশা করবেন। কেমন কাজ করেছি, সেটা আমার বলার বিষয় নয়। তবে আমি বিশ্বাস করি ভালো কাজই করেছিলাম। যখন দায়িত্ব নিয়েছিলাম, তখন বাংলাদেশের মানুষের মন থেকে ফুটবল প্রায় হারিয়ে গিয়েছিল। আমরা সেই মানসিকতা বদলে দিয়েছিলাম, তরুণ খেলোয়াড়দের সুযোগ দিয়েছিলাম এবং মানুষের মধ্যে আবার বিশ্বাস ফিরিয়ে এনেছিলাম। প্রথম বছরে এশিয়ান গেমসে ভালো পারফরম্যান্স, বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে জায়গা করে নেওয়া এবং জয়ের হার ধরে রাখার চেষ্টা করেছি—আমাদের পারফরম্যান্স যথেষ্ট ভালো ছিল।
আমার মনে হয়, মধ্যবর্তী সময়ে ধারাবাহিক উন্নতি করেছিলাম। কিন্তু হয়তো আমরা ভালো করায় মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেড়ে গিয়েছিল, যা বড় দলগুলোর বিপক্ষে পূরণ করা কঠিন ছিল। মানুষ এটাও ভুলে যায় যে, বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের মাত্র একটি ম্যাচ আমরা বাংলাদেশে খেলেছিলাম, বাকি সবগুলো ছিল দেশের বাইরে। তবু আমরা এশিয়ান কাপের জন্য কোয়ালিফাই করতে পেরেছিলাম।



