অভাবের মাঝেও বিশ্বকাপে সেনেগালের ঐতিহাসিক জয়, সংকট কাটিয়ে দলের দারুণ প্রত্যাবর্তন
অভাবের মাঝেও বিশ্বকাপে সেনেগালের ঐতিহাসিক জয়

ইরাকের বিপক্ষে ৫-০ গোলের জয় উদযাপন করেছে সেনেগাল। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের এই ম্যাচে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়েছে আফ্রিকার অন্যতম সেরা দলটি। তবে মাঠের বাইরে চরম সংকটে রয়েছে সেনেগাল দল। খেলোয়াড়দের জন্য বরাদ্দ পর্যাপ্ত টাকা নেই, কোচের কোনো চুক্তি নেই, এমনকি খাবারও নিজেদের কিনে খেতে হচ্ছে।

কোচের চুক্তি নেই, বেতনও বকেয়া

সেনেগালের প্রধান কোচ পাপে থিয়াও বেশ কয়েক মাস ধরে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছাড়াই দলের দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর আগের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। গত পাঁচ মাস ধরে তিনি কোনো বেতনও পাননি। সেনেগালের রাষ্ট্রপতি নিজে এ সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেওয়া সত্ত্বেও ফুটবল ফেডারেশন কোচের নতুন চুক্তিতে সই করতে এখনো অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।

খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ

সেনেগাল দলের খেলোয়াড়েরা ফেডারেশন থেকে বরাদ্দ খাবারের মান নিয়ে ক্রমাগত অভিযোগ করছেন। বাধ্য হয়ে তাঁরা বাইরে থেকে খাবার আনিয়ে খাচ্ছেন। পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার বড় কারণ হলো, নিজেদের পেশাদার শেফ ছাড়াই দলটি বিশ্বকাপে অংশ নিতে এসেছে। স্পোর্ট নিউজ আফ্রিকা জানিয়েছে, বিশ্বকাপে দলের পেছনে খরচ কমানোর জন্য কঠোর নিয়ম তৈরি করেছে সেনেগালের ফুটবল ফেডারেশন। আর এই খরচ বাঁচানোর চক্করে পড়ে দলটি কোনো শেফ ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রে এসেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ফেডারেশন কর্মকর্তাদের রাজকীয় জীবন

খেলোয়াড়দের এই কষ্টের পেছনে ফেডারেশনের চরম বৈষম্যকে দায়ী করেছে অনেক খেলোয়াড়। যেখানে দেশের হয়ে খেলতে যাওয়া ফুটবলাররা হোটেলের নিম্নমানের খাবার খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রে রাজকীয় জীবন যাপন করছেন সেনেগাল ফুটবল ফেডারেশনের কিছু কর্মকর্তা। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ফুটবল ফেডারেশনের এই বড় কর্মকর্তারা নিজেদের পরিবার আর আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে গিয়েছেন। আর তাঁদের আমেরিকা ঘোরার সব খরচ দেওয়া হচ্ছে ফেডারেশনের তহবিল থেকে। ফলে কোনো কারণ ছাড়াই ফুটবল ফান্ডের বিপুল পরিমাণ টাকা অপচয় হচ্ছে। ’১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপেও ফেডারেশনের কর্মকর্তারা ঠিক একইভাবে টাকার অপচয় করেছিলেন।

নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সংকট

যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ খেলতে এসে সেনেগাল দল ও তাদের কোচ থিয়াও বেশ কিছু অব্যবস্থাপনার মুখোমুখি হয়েছেন। আমেরিকার বিমানবন্দরে নামার পর থেকেই একের পর এক সমস্যার সম্মুখীন হন তাঁরা। বিমানবন্দরে খুব কড়াভাবে তল্লাশি করা হয় সেনেগালের খেলোয়াড়দের। আন্তর্জাতিক ফুটবলারদের জন্য এই অভিজ্ঞতা ছিল বেশ অস্বস্তিকর। বিশ্বমানের এই খেলোয়াড়দের সুরক্ষার জন্য যে ধরনের কড়া নিরাপত্তা দরকার ছিল, তা দেওয়া হয়নি। তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা ছিল খুবই সাধারণ। পাশাপাশি দলের হোটেল, যাতায়াত ও অফিশিয়াল নানা বিষয় নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

আফকনে বিতর্কিত ঘটনা

এর আগে মরক্কোয় অনুষ্ঠিত আফ্রিকা কাপ অব নেশনস চলাকালীনও সেনেগালের কোচ ও সে দেশের ফুটবল ফেডারেশনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছিল। সেই ঘটনার কয়েক মাস পার হতে না হতেই আবারও একই ধরনের প্রশাসনিক সংকট তৈরি হয়েছে। কোচ থিয়াও নিজেও কয়েক মাস আগে মরক্কোয় অনুষ্ঠিত আফকনের ফাইনালে এক চরম বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ম্যাচ চলাকালীন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির অজুহাত তুলে তিনি দল নিয়ে মাঠ থেকে ওয়াক অফ করেন। সেদিন থিয়াও দল নিয়ে মাঠ ছেড়ে দেওয়ায় সেনেগালের সমর্থকেরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তাঁরা গ্যালারি থেকে মাঠে ঢোকার চেষ্টা করেন, নিরাপত্তারক্ষীদের ওপর হামলা চালান এবং স্টেডিয়ামের বিভিন্ন জিনিসপত্র ভাঙচুর করেন। এ ঘটনার পর গত মার্চ মাসে ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘সিএএফ’ নিয়ম অনুযায়ী মরক্কোকে জয়ী ঘোষণা করে। কারণ, সেনেগাল দল খেলার মাঝপথে মাঠ ছেড়ে নিয়ম অমান্য করেছিল। সেনেগাল অবশ্য সিএএফের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেছে ও ক্রীড়া আদালত ‘সিএএস’-এর হস্তক্ষেপ চেয়েছে।

সংকট কাটিয়ে গ্রুপ পর্বে সাফল্য

এত সব ঝামেলা থাকার পরও ঠিকই গ্রুপ পর্ব পেরিয়েছে সেনেগাল। ফ্রান্স, নরওয়ের মতো শক্তিশালী দলের সঙ্গে হেরেও সেরা ৩২ দলের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে সেনেগাল। অভাব অনটন আর মানসিক চাপের মধ্যে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন সেনেগালের খেলোয়াড়েরা। ইরাকের বিপক্ষে ৫-০ গোলের জয় তাদের এই প্রত্যাবর্তনের সাক্ষ্য বহন করে।