হলি ওয়াটার স্ক্যান্ডাল: ব্রাজিলকে হারাতে ঘুমের ওষুধ দিয়েছিল আর্জেন্টিনা?
ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার হলি ওয়াটার স্ক্যান্ডালের কাহিনি

আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের ফুটবল ম্যাচ মানেই বাড়তি উন্মাদনা। আর সেখানে বিতর্কিত ঘটনা থাকলে তা আলোচনায় প্রাধান্য পায়। ১৯৯০ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে আর্জেন্টিনার ফিজিও ব্রাজিলের খেলোয়াড় ব্রাংকোকে ঘুমের ওষুধ মিশ্রিত পানি খাইয়েছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে, যা ‘হলি ওয়াটার’ স্ক্যান্ডাল নামে পরিচিত।

১৯৯০ বিশ্বকাপ: দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি

ইতালিতে অনুষ্ঠিত ১৯৯০ বিশ্বকাপের রাউন্ড অব সিক্সটিনে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল মুখোমুখি হয়। এখনকার মতো তখনও এই ম্যাচকে ঘিরে সমর্থকদের মধ্যে ছিল তুমুল উন্মাদনা। বিশ্বকাপে এর আগে তিনবার মুখোমুখি হয়ে ব্রাজিল জিতেছিল ১৯৭৪ ও ১৯৮২ সালে, আর ১৯৭৮ সালে ম্যাচটি অমীমাংসিত ছিল। তাই বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রথমবারের মতো ব্রাজিলকে হারানোর বড় সুযোগ ছিল আর্জেন্টিনার।

তবে আর্জেন্টিনার অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। ম্যারাডোনার নৈপুণ্যে আগের বিশ্বকাপ জিতলেও অনেক তারকা ইনজুরি ও খারাপ ফর্মের কারণে ১৯৯০ বিশ্বকাপের দলে ছিলেন না। বিশ্বকাপের শুরুটাও স্বস্তিদায়ক ছিল না: প্রথম ম্যাচে ক্যামেরুনের কাছে ১-০ গোলে হেরে বসে আর্জেন্টিনা। গ্রুপপর্বের পরের ম্যাচে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ২-০ গোলে হারালেও রোমানিয়ার সঙ্গে ১-১ ড্র করে গ্রুপে তৃতীয় হয়ে কোনোমতে শেষ ষোলো নিশ্চিত করে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অন্যদিকে, ব্রাজিল ছিল ওই বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট। সেবাস্তিও ল্যাজারনির অধীনে গোছানো দল নিয়ে এসেছিল সেলেসাওরা। গ্রুপপর্বের সব ম্যাচ জিতে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করে তারা। তাই ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা মহারণে ফেভারিট ছিল ব্রাজিলই।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ম্যাচের বিবরণ: ব্রাজিলের আক্রমণ, আর্জেন্টিনার প্রতিরোধ

১০ জুন তুরিনে ম্যাচে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে ব্রাজিল। অন্যদিকে, ফর্মের অভাবে আর্জেন্টিনা ব্যাকফুটে চলে যায়। মিডফিল্ডে দুঙ্গা ও অ্যালেমাওর দাপটে বল পাচ্ছিল না আর্জেন্টিনা। কিন্তু জালের দেখা মিলছিল না। আর্জেন্টিনার পরিকল্পনায় কাউন্টার অ্যাটাকে গোল আদায়ের চেষ্টা ছিল, কিন্তু ব্রাজিলের ডিফেন্ডার ও ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডাররা ম্যারাডোনাকে কড়া পাহাড়ায় রাখায় তিনি সুবিধা করতে পারছিলেন না। বিশেষ করে ব্রাজিলিয়ান লেফটব্যাক ব্রাংকো অসাধারণ খেলছিলেন।

দ্বিতীয়ার্ধে আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার পেদ্রো ত্রগলিও আহত হয়ে পড়ায় কিছুক্ষণ খেলা বন্ধ ছিল। খেলা পুনরায় শুরু হওয়ার পর ব্রাংকোকে আগের মতো চনমনে লাগছিল না; মনে হচ্ছিল, কিছু একটা হয়েছে।

ম্যারাডোনার মুহূর্ত ও গোল

ব্রাংকোর হুট করে পরিবর্তনের সুযোগ নিলেন ম্যারাডোনা। ৮১ মিনিটে ব্রাংকোকে ফাঁকি দিয়ে ডানপ্রান্ত দিয়ে বল নিয়ে এগিয়ে যান তিনি। ব্রাজিলের ডিফেন্স ভেঙে পড়ে। ম্যারাডোনাকে ঘিরে ধরলে ক্লদিও ক্যানিজিয়া আনমার্কড হয়ে যান। ম্যারাডোনা বল বাড়িয়ে দিলেন ক্যানিজিয়াকে, আর তিনি ব্রাজিলের গোলকিপার তাফারেলকে একা পেয়ে গোল করেন।

গোলের পর ব্রাংকোকে উত্তেজিত দেখাচ্ছিল; তিনি সতীর্থদের কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন। ৮৫ মিনিটে ব্রাজিলের অধিনায়ক রিকার্ডো গোমেজ লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। ম্যাচ শেষ হয় ১-০ গোলে, ব্রাজিল বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়, আর্জেন্টিনা যায় কোয়ার্টার ফাইনালে।

বিতর্কের শুরু: ‘হলি ওয়াটার’ অভিযোগ

ম্যাচ শেষে ব্রাংকো দাবি করেন, দ্বিতীয়ার্ধে ত্রগলিওর ইনজুরির সময় আর্জেন্টিনার ফিজিও মিগুয়েল ডি লরেঞ্জোর কাছ থেকে পানি নিয়ে পান করেছিলেন তিনি। সেই পানি পান করেই মাথা ঝিমঝিম করছিল এবং অসুস্থতা বোধ করছিলেন। ব্রাংকো যে আর্জেন্টিনার ফিজিওর আনা পানি খেয়েছিলেন তার প্রমাণ রয়েছে, তবে পানিতে কিছু মেশানোর অভিযোগ প্রমাণের সুযোগ ছিল না। আর্জেন্টিনার প্রেস ব্রাংকোর অভিযোগ উড়িয়ে দেয়, ফলে তখন বিষয়টি তেমন চর্চা হয়নি।

ম্যারাডোনার স্বীকারোক্তি ও পরবর্তী প্রতিক্রিয়া

২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার এক টিভি চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ম্যারাডোনা স্বীকার করেন, সেদিন ব্রাংকোকে দেওয়া পানিতে তারা ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দিয়েছিলেন! এই বক্তব্যের পর আবার পুরনো আগুন জ্বলে ওঠে। সিবিএফ সেক্রেটারি জেনারেল অ্যান্টোনিও টেক্সেইরা ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানাতে চাইলেও প্রেসিডেন্ট রিকার্ডো টেক্সেইরা তা না করার সিদ্ধান্ত নেন।

ওই ম্যাচের সময় আর্জেন্টিনার কোচ কার্লোস বিলার্দো অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং ম্যারাডোনাকে বাস্তবে ফেরার পরামর্শ দেন। ফিজিও নিজেও ঘটনা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। তবে ফিজিওর বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেন ১৯৯০ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ফরোয়ার্ড বেবেতো। তিনি বলেন, ‘লরেঞ্জো যদি এ ঘটনা অস্বীকার করে থাকেন তবে তিনি মিথ্যা বলেছেন, লরেঞ্জো পরে আমার কাছে সমস্ত ঘটনা স্বীকার করেছিলেন।’

তখনকার ব্রাজিল কোচ ল্যাজারনি বলেন, ‘এটা কিছুতেই স্পোর্টসম্যানশিপের অংশ হতে পারে না, এটা সম্পূর্ণ নোংরা একটা খেলা। ঘটনা ১৪ বছর আগে হোক বা ১৪ দিন, ফিফার উচিত এই ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্টদের কঠিন শাস্তির আওতায় এনে একটা উদাহরণ স্থাপন করার। কে নিশ্চয়তা দিতে পারে আর্জেন্টিনা অন্য কোনো দলের বিপক্ষে এমন কোনো নোংরা খেলে খেলেনি?’