বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের কোচ পিটার বাটলারের তীব্র সমালোচনা: বাফুফের অব্যবস্থাপনা ও প্রস্তুতির ঘাটতি প্রকাশ্যে
বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল আজ রাত দুইটায় অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে রওনা দিয়েছে, প্রথমবারের মতো এএফসি এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে অংশ নিতে। তবে দেশ ছাড়ার আগে দুপুরে বাফুফে ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলের ইংলিশ কোচ পিটার বাটলার রীতিমতো বিস্ফোরক কথাবার্তা বলেছেন, যা দলের অন্দরমহলের অস্থিরতা ও প্রস্তুতির দৈন্য দশা স্পষ্ট করে তুলেছে।
বাফুফের ফুটবলীয় জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন
পিটার বাটলার সরাসরি বাফুফে কর্তাদের ফুটবলীয় জ্ঞান ও পেশাদারত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, "হয়তো এই বাফুফেতে সবাই ফুটবলকে সেই স্তরে বোঝেন না। জীবনে যেমন হয়, ফুটবলও তেমন। অনেক সময় আপনি জয় আর ফলাফল দিয়ে ফাটলগুলো কাগজ দিয়ে ঢেকে রাখেন। কিন্তু বিষয়টা শুধু প্রথম ১০ মিনিটে ২ গোল করা, তার পরের ২০ মিনিটে আবার ২ গোল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।"
তিনি যোগ করেন, "বিষয়টা হলো, এমন পারফরম্যান্স গড়ে তোলা, যেখানে বিশ্বাসযোগ্য, মানসম্মত পারফরম্যান্সের ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা যায়।" বাটলারের এই মন্তব্যে বাফুফের অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা ও দলের প্রস্তুতিতে ঘাটতি নিয়ে তাঁর জমানো ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে।
প্রস্তুতি ম্যাচ বাতিল ও লিগের অগ্রাধিকার নিয়ে সমালোচনা
বাটলার ডিসেম্বরের পর আর প্রস্তুতি ম্যাচ না হওয়া প্রসঙ্গে বাফুফেকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর মতে, জাতীয় দলের প্রস্তুতির চেয়ে ঘরোয়া লিগকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, ১৯ ফেব্রুয়ারি ফিলিপাইনের বিপক্ষে খেলার কথা থাকলেও লিগের ম্যাচ পেছানোর ফলে ১০ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি দুটি লিগ ম্যাচ খেলতে হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক ম্যাচের জন্য অসম্ভব চাপ তৈরি করেছে।
একই সমস্যা মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের বিপক্ষে প্রস্তাবিত ম্যাচের ক্ষেত্রেও হয়েছে। বাটলার বলেন, "আমি বাস্তব জগতে বাস করি, রূপকথার রাজ্যে নয়। প্রস্তুতির চেয়ে লিগ বেশি অগ্রাধিকার পেয়েছে, যা আদর্শ মানের হয়নি। আমি রিঅ্যাকটিভ হওয়ার চেয়ে প্রোঅ্যাকটিভ হওয়া পছন্দ করি।"
দায়িত্ব নিতে রাজি, কিন্তু মিথ্যা বলা বন্ধের দাবি
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই বাটলার তাঁর মায়ের একটি প্রবাদ টেনে বলেন, "আমার মা বলতেন, যত কম কথা, তত কম ঝামেলা। কিন্তু মাঝেমধ্যে সত্যটা বলতেই হয়। আমাদের প্রস্তুতি নিয়ে অনেক মিথ্যাচার করা হয়েছে। আমি কাউকে আঙুল দিয়ে দোষারোপ করছি না, তবে আমাদের পরিকল্পনাগুলো কাজে লাগেনি।"
তিনি আরও যোগ করেন, "আমি লাইবেরিয়া, বতসোয়ানা, ইংল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় কাজ করেছি। আমি কারও হাতের পুতুল নই। যখন সবকিছু গোলমেলে হয়ে যায়, তখন সবাই বলে এটা 'বাটলারের দোষ' বা 'বাটলারের পরিকল্পনা'। আমি এই দলের জন্য দায়বদ্ধ হতে রাজি, কিন্তু তার আগে লোকেদের মিডিয়ার কাছে গিয়ে মিথ্যা বলা বন্ধ করতে হবে।"
নারী উইংয়ের প্রধান মাহফুজা আক্তারের স্বীকারোক্তি
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত বাফুফের নারী উইংয়ের প্রধান মাহফুজা আক্তার দলের প্রস্তুতির ঘাটতি স্বীকার করে নেন। তিনি বলেন, "প্রস্তুতিটা আরও ভালো হতে পারত। আমি হতাশ বলব না, তবে বাইরে পাঠিয়ে ট্রেনিং বা আরও প্র্যাকটিস ম্যাচ খেলাতে পারলে তুষ্টিটা আরেকটু বাড়ত।" সঙ্গে তিনি যোগ করেন, "কিন্তু আমি একা সিদ্ধান্ত নিই না, আমার ওপর শীর্ষ কর্তারা আছে।"
উল্লেখ্য, বাফুফের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত ছিল থাইল্যান্ডে ক্যাম্প করে একটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলে দল সিডনি যাবে, কিন্তু তা বাতিল হয়েছে। থাইল্যান্ড বাতিল হওয়ার পর ফিলিপাইনে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়, সেটাও কোচ রাজি না হওয়ায় হয়নি। ফলে প্রস্তুতির ঘাটতি নিয়েই বাংলাদেশকে এশিয়ান কাপে অংশ নিতে হচ্ছে।
তরুণ খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সে সন্তুষ্টি, কিন্তু ভুলের মাশুল নিয়ে সতর্কতা
বাটলার দলের তরুণ খেলোয়াড় আলপি, প্রীতি ও উমেলাদের পারফরম্যান্সে বেশ সন্তুষ্ট। বিশেষ করে প্রীতি সম্পর্কে তিনি বলেন, "সে এখন অদম্য শক্তিতে ফিরে এসেছে। তরুণেরা এখন সিনিয়রদের ঘাড়ের ওপর নিশ্বাস ফেলছে, যা দলের জন্য ইতিবাচক।"
তবে তিনি সতর্ক করেন যে বড় দলগুলোর বিপক্ষে ভুলের মাশুল ভয়াবহ হতে পারে। তাঁর মতে, উজবেকিস্তান, চীন বা উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ভুল করলে বড় ব্যবধানে হারার ঝুঁকি থাকবে।
সর্বোপরি, পিটার বাটলারের এই সমালোচনা বাংলাদেশ নারী ফুটবলের প্রশাসনিক দুর্বলতা ও প্রস্তুতির ঘাটতিকে উন্মোচিত করেছে, যা আসন্ন এশিয়ান কাপে দলের চ্যালেঞ্জকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
