ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ বিশ্বকাপে খেলা যেকোনো ফুটবলারের স্বপ্ন। এই মঞ্চে পারফর্ম করেই কেউ নিজেকে চেনান, কেউ আবার তারকা থেকে মহাতারকা হয়ে ওঠেন। তবে এই মহাযজ্ঞে অংশ নেওয়ার সৌভাগ্য সবার হয় না। বিভিন্ন কারণে প্রতিবার বিশ্বকাপের আগেই তারকা পতনের দেখা মেলে। এবারও যেমন বেশ কজন ফুটবল তারকা অনাকাঙ্ক্ষিত, অপ্রত্যাশিত অথবা ঘটনাচক্রে বিশ্বকাপ মিস করতে যাচ্ছেন। তাঁদের কেউ চোটের কারণে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেছেন, কেউ আবার কোচের পরিকল্পনায় জায়গা না পেয়ে বাদ পড়েছেন। অথচ প্রেক্ষাপট একটু এদিক-ওদিক থাকলে তাঁদের সবারই বিশ্বকাপে খেলার কথা।
ইংল্যান্ডের তারকা বাদ পড়ার তালিকা
ট্রেন্ট আলেজান্ডার-আর্নল্ড
আর্নল্ড ইংল্যান্ডের অন্যতম সেরা আক্রমণাত্মক ফুলব্যাক হিসেবে পরিচিত। সেট-পিস ও ক্রসে দুর্দান্ত দক্ষতার কারণে এই ডিফেন্ডারকে গত বছর লিভারপুল থেকে দলে ভিড়িয়েছিল রিয়াল মাদ্রিদ। তবে ইনজুরি ও ফর্মের ওঠানামায় মৌসুমটা মাদ্রিদে ভালো কাটেনি। ক্লাব ফুটবলে ছন্দে না থাকায় তাঁকে বিশ্বকাপ দলে রাখেননি ইংল্যান্ড কোচ টমাস টুখেলও। জার্মান এই কোচ ডান পাশের ডিফেন্ডার হিসেবে বেছে নিয়েছেন রিস জেমস, ডিয়েড স্পেন্স এবং টিনো লিভ্রামিন্তোকে। ফলে বড় তারকা হয়েও বিশ্বকাপের মূল স্কোয়াডে জায়গা হারাতে হয়েছে আর্নল্ডকে।
হ্যারি ম্যাগুয়ার
ইংল্যান্ডের টানা তৃতীয় বিশ্বকাপ দলে জায়গা হয়নি হ্যারি ম্যাগুয়ারের। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে দারুণ একটি মৌসুম কাটানোর পর সম্প্রতি ক্লাবের সঙ্গে নতুন চুক্তিও পেয়েছিলেন এই ডিফেন্ডার। তবে ইংল্যান্ড কোচ টুখেলের মন জিততে পারেননি। গত মার্চেই তাঁকে জানিয়ে দেন যে তিনি দলে পঞ্চম পছন্দের সেন্টারব্যাক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত হয়েছেও তা-ই।
কোল পালমার
পালমার গত মৌসুমে ঊরুর চোটের কারণে প্রায় তিন মাস মাঠের বাইরে ছিলেন। চেলসির এই ফরোয়ার্ড সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে মৌসুমে মাত্র ১১ গোল ও ৩টি অ্যাসিস্ট করতে পেরেছেন। তবে ক্লাব পর্যায়ে কঠিন মৌসুম কাটালেও ইংল্যান্ড দলে তাঁর না থাকা অনেকের কাছেই চমক হয়ে এসেছে। কারণ, বড় ম্যাচে পারফর্ম করার সক্ষমতা রয়েছে পালমারের। ইংল্যান্ডের হয়ে ২০২৪ ইউরোর ফাইনালে এবং চেলসির হয়ে ২০২৫ ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের ফাইনালে গোল করেছিলেন।
ফিল ফোডেন
ম্যানচেস্টার সিটিতে তারকা হিসেবে আবির্ভাব ফিল ফোডেনের। তবে ইংল্যান্ড জাতীয় দলে ক্লাবের মতো ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দেখাতে পারেননি। দেশের জার্সিতে ৪৯ ম্যাচে করেছেন মাত্র ৪ গোল। এমনকি গত মৌসুমে ম্যান সিটিতেও একাদশে জায়গা হারান এই মিডফিল্ডার। এবার ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ দলেও জায়গা হয়নি ফোডেনের।
ব্রাজিলের তারকা বাদ পড়ার তালিকা
জোয়াও পেদ্রো
পেদ্রো গত গ্রীষ্মে ব্রাইটন থেকে চেলসিতে যোগ দেওয়ার পর স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে চমৎকার একটি মৌসুম কাটিয়েছেন। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে তিনি ক্লাবটির হয়ে করেছেন ২০ গোল। তবে এই পারফরম্যান্সও ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তিকে পুরোপুরি সন্তুষ্ট করতে পারেনি। তাঁর বদলে বিশ্বকাপ দলে সুযোগ পেয়েছেন ইগর থিয়াগো।
রদ্রিগো
আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিলের প্রথম একাদশে রদ্রিগোর থাকা অনেকটা নিশ্চিত বলেই ধরা হচ্ছিল। রিয়াল মাদ্রিদেও আনচেলত্তির সময়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ছিলেন তিনি। কিন্তু মার্চে ক্রুসিয়েট লিগামেন্টে গুরুতর চোট সব হিসাব-নিকাশ বদলে দিয়েছে। এই চোটের কারণে বিশ্বকাপ তো বটেই, ২০২৬-২৭ মৌসুমের বেশ কিছুটা সময়েও বাইরে থাকতে হতে পারে রদ্রিগোকে।
এস্তেভাও
ব্রাজিলের উদীয়মান তারকাদের অন্যতম এস্তেভাও। ব্রাজিলিয়ান ক্লাব পালমেইরাসে থাকার সময়ই নৈপুণ্য দেখিয়ে আলোচনায় আসেন তিনি। এরপর তাঁকে কিনে নেয় চেলসি। কার্লো আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিলের হয়েও দারুণ খেলছিলেন এস্তেভাও। ধারণা করা হচ্ছিল, বিশ্বকাপেও অন্যতম চমক হতে যাচ্ছেন এই উইঙ্গার। কিন্তু মার্চে চেলসির হয়ে খেলার সময় তিনি হ্যামস্ট্রিংয়ে গুরুতর চোট পান। এই চোটের কারণেই বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন ভেঙে যায় তাঁর।
অন্যান্য দেশের তারকা বাদ পড়া
দানি কারবাহাল (স্পেন)
রিয়াল মাদ্রিদের নির্ভরযোগ্য ফুলব্যাক দানি কারবাহাল গত মৌসুমে চোটের কারণে ক্লাবের হয়ে মাত্র ২৩টি ম্যাচ খেলতে পেরেছেন। চোট কাটিয়ে মৌসুমের শেষ দিকে লা লিগার শেষ তিনটি ম্যাচে মাঠে ফিরলেও স্পেনের বিশ্বকাপ দলে জায়গা হয়নি তাঁর। চোটের কারণেই মূলত ৩৪ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডারকে স্কোয়াডে রাখেননি কোচ দে লা ফুয়েন্তে।
ডিন হুইসেন (স্পেন)
রিয়াল মাদ্রিদের কোনো ফুটবলার ছাড়াই এবারের বিশ্বকাপ স্কোয়াড সাজিয়েছেন স্পেন কোচ দে লা ফুয়েন্তে। অনেকের প্রত্যাশা ছিল ডিফেন্ডার ডিন হুইসেনকে অন্তত দলে রাখবেন স্পেন কোচ। কিন্তু বোর্নমাউথের সাবেক এই ডিফেন্ডারকে বিবেচনা করেননি লা ফুয়েন্তে। বাদ পড়ার পর হুইসেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট শেয়ার করেন, যেখানে তিনি লা লিগার মৌসুম-সেরা একাদশে নিজের থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেন। কোচের সিদ্ধান্ত নিয়ে পরোক্ষভাবে প্রশ্ন তুলে বিতর্কের মুখেও পড়েছেন হুইসেন।
উগো একিতিকে (ফ্রান্স)
এপ্রিল মাসে অ্যাকিলিস টেন্ডনের গুরুতর চোটে পড়ে মৌসুম শেষ হয়ে যায় উগো একিতিকের। এই চোটের কারণে ২০২৭ সালের আগে তাঁর মাঠে ফেরার সম্ভাবনা প্রায় নেই বলা চলে। গত গ্রীষ্মে লিভারপুলে যোগ দেওয়ার পর একিতিকে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৪৫ ম্যাচে গোল করেন ১৭টি, যা তাঁকে দারুণ ফর্মে থাকা এক ফরোয়ার্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। এই পারফরম্যান্সে দিদিয়ের দেশমের ফ্রান্স জাতীয় দলেও জায়গা পেয়ে যান তিনি। তবে চোটই বিশ্বকাপের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে তাঁকে।
এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গা (ফ্রান্স)
২০২২ কাতার বিশ্বকাপ ফাইনালে ফ্রান্সের হয়ে খেলেছিলেন কামাভিঙ্গা। কিন্তু এবার বিশ্বকাপের জন্য ফ্রান্স দলে জায়গা পাননি রিয়াল মাদ্রিদের এই মিডফিল্ডার। ফ্রান্স কোচ দিদিয়ের দেশম তাঁর বাদ পড়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন 'ইনজুরিতে ভরা কঠিন একটি মৌসুম'-এর কথা। চোটের কারণে পুরো মৌসুমজুড়েই নিজের সেরা ছন্দে থাকতে পারেননি কামাভিঙ্গা।
মার্ক-আন্দ্রে টের স্টেগেন (জার্মানি)
হতাশাজনক এক মৌসুম কাটানোর পর জার্মানির বিশ্বকাপ দল থেকেও বাদ পড়েছেন মার্ক-আন্দ্রে টের স্টেগেন। বার্সেলোনার এই গোলরক্ষক দীর্ঘদিন ধরে চোটের সমস্যায় ভুগছিলেন। খেলায় ছন্দ ফিরে পেতে জানুয়ারিতে তাঁকে ধারে পাঠানো হয়েছিল জিরোনাতে। কিন্তু সেখানে গিয়েও হ্যামস্ট্রিংয়ের গুরুতর চোটে পড়েন তিনি। ফলে নতুন ক্লাবের হয়ে মাত্র দুটি ম্যাচ খেলতে পেরেছেন। চোটের কারণে তিনি যেমন জিরোনাকে অবনমন থেকে বাঁচাতে পারেননি, তেমনি নিজের বিশ্বকাপ দলে ফেরার সম্ভাবনাও জাগাতে ব্যর্থ হয়েছেন।



