ইরানের পাল্টা হামলায় বিপর্যস্ত ইসরাইল, কট্টরপন্থীদের যুদ্ধের ডাক
ইরানের পাল্টা হামলায় বিপর্যস্ত ইসরাইল, কট্টরপন্থীদের যুদ্ধের ডাক

ইসরাইলের অভ্যন্তরে আকস্মিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান, যা দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক মহলকে পুরোপুরি হতভম্ব করে দিয়েছে। এই অভাবিত হামলার পর তেল আবিবসহ বিভিন্ন শহরে তুমুল শঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছে এবং ইসরাইলি ভূখণ্ডে সাইরেন বাজার পর হাসপাতালগুলো থেকে নবজাতকদের ভূগর্ভস্থ নিরাপদ বাঙ্কারে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

ইরানের এই পদক্ষেপকে ইসরাইলের জন্য একটি বড় ধরনের ‘কৌশলগত বিপর্যয়’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। এই ঘটনার পর দেশটির রাজনীতি ও সংবাদমাধ্যম দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। কট্টরপন্থীরা ইরানের বিরুদ্ধে অবিলম্বে সর্বাত্মক যুদ্ধের দাবি তুলছেন, অন্যদিকে বিশ্লেষকদের একাংশ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নীতি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অতি-প্রভাবকে এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী করছেন।

গোয়েন্দা ব্যর্থতা ও যুদ্ধের সূত্রপাত

ইসরাইলের ‘চ্যানেল থার্টিন নিউজ’-এর সামরিক সংবাদদাতা অ্যালন বেন ডেভিড জানিয়েছেন, এই হামলা ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। কিছুদিন আগেই সম্পন্ন হওয়া ইসরাইল-মার্কিন যৌথ অভিযানের পর তেল আবিবের ধারণা ছিল যে ইরান আর ইসরাইলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার সাহস দেখাবে না।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কিন্তু রোববার (৭ জুন) বৈরুতের দক্ষিণে ইসরাইলি বিমান হামলায় দুই লেবানিজ নাগরিক নিহত হওয়ার পর, ইরান একে যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন আখ্যা দিয়ে পাল্টা আঘাত হানে। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসরাইল তেহরানসহ বিভিন্ন ইরানি শহরে বিমান হামলা চালালে পরিস্থিতি দ্রুত সংঘাতের দিকে মোড় নেয়। সোমবারও (৮ জুন) দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র গোলাগুলি অব্যাহত ছিল, যার পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উভয় পক্ষকে অবিলম্বে যুদ্ধ থামানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা

এই সংকটের মধ্যে ইসরাইলি গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করছেন। প্রবীণ ইসরাইলি সাংবাদিক বেন ক্যাসপিট ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন যে ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তাকে ওয়াশিংটনের কাছে ‘ব্যক্তিগতকরণ’ বা ইজারা দেওয়া হয়েছে, যেখানে সামরিক সিদ্ধান্তের জন্য ট্রাম্পের অনুমোদনের অপেক্ষা করতে হয়।

অন্যদিকে, ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ (আইএনএসএস)-এর ইরান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড্যানি সিট্রিনোভিচ মনে করেন, চলতি বছরের শুরুতে ইরান বিরোধী যৌথ সামরিক অভিযানটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। তার মতে, ইসরাইল এখন এক মারাত্মক উভয়সংকটে পড়েছে। হয় তাকে ট্রাম্পের নির্দেশ অমান্য করে সরাসরি সংঘাতে জড়াতে হবে, অথবা লেবাননে তাদের সামরিক অভিযানকে সীমিত করতে হবে। বর্তমানে ইসরাইলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা কমে গেছে এবং ইরানের আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে গেছে।

জরুরি অবস্থা ও কট্টরপন্থীদের প্রতিক্রিয়া

এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইসরাইলজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। স্কুল-কলেজ ও গণজমায়েত বাতিল করা হয়েছে, সীমিত আকারে চলছে গণপরিবহন ও হাসপাতালগুলো। তবে এমন সংকটেও নেতানিয়াহু সরকারের কট্টরপন্থী মন্ত্রীরা চরম উগ্র অবস্থান নিয়েছেন। জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভির সরাসরি বলেছেন যে ‘তেহরানকে পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়া উচিত’। অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ দাবি তুলেছেন, ইসরাইলে আঘাত হানা প্রতিটি ইরানি মিসাইলের জবাবে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরতলীর ডজন ডজন ভবন মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। সংস্কৃতি মন্ত্রী মিকি জোহরও জোর দিয়ে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য কেবল শক্তির ভাষা বোঝে, তাই হামলা জারি রাখতে হবে।

সরকারের পাশাপাশি বিরোধী শিবিরের ডানপন্থী নেতারাও ইরানের কৌশলগত অবকাঠামোতে অবিলম্বে পাল্টা আঘাত হানার পক্ষে মত দিয়েছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেত, বিরোধী দলীয় নেতা অ্যাভিগডোর লিবারম্যান এবং সাবেক সেনাপ্রধান বেনি গ্যান্টজ একযোগে হিজবুল্লাহ ও ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। ইসরাইলি সেনাবাহিনী ইতোমধ্যেই রিজার্ভ সেনাদের তলব করতে শুরু করেছে এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

যুদ্ধবিরোধী কণ্ঠস্বর

তবে এই যুদ্ধংদেহী মনোভাবের তীব্র বিরোধিতা করেছেন ইসরাইলের মধ্যপন্থী ও প্রগতিশীল বিরোধী নেতারা। ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে ‘দুর্বল’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ইসরাইলকে আরেকটি যুদ্ধের আগুনে ছুড়ে দেওয়ার কোনো ম্যান্ডেট এই সরকারের নেই। তিনি অভিযোগ করেন, নেতানিয়াহু কেবল নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এবং দেশে আগাম নির্বাচন এড়াতেই লেবানন ও ইরানে ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তেজনা উসকে দিচ্ছেন। দলের অপর আইনপ্রণেতা গিলাদ কারিভও যোগ করেন, বর্তমান সরকার দেশের প্রতিটি নাগরিকের জীবনকে চরম ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে এবং নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।