মুকুল চৌধুরীর জ্বলন্ত ব্যাটিং, লক্ষ্মৌর জয়ে নায়ক হয়ে উঠলেন তরুণ ক্রিকেটার
মুকুল চৌধুরীর জ্বলন্ত ব্যাটিং, লক্ষ্মৌর জয়ে নায়ক

মুকুল চৌধুরীর জ্বলন্ত ব্যাটিং, লক্ষ্মৌর জয়ে নায়ক হয়ে উঠলেন তরুণ ক্রিকেটার

অ্যাকশনে মুকুল চৌধুরী। গতকাল রাতে কলকাতা নাইট রাইডার্সের বিপক্ষে এএফপিসবার জহুরির চোখ নেই, কিন্তু জাস্টিন ল্যাঙ্গারের আছে। লক্ষ্মৌ সুপারজায়ান্টসের কোচ আগেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, আগামী চার মাসে তিনি মুকুলকে ভারতের সবচেয়ে ভীতিকর ছয়–সাত নম্বরের ব্যাটসম্যানে পরিণত করবেন। ইডেন গার্ডেনে সেই কথা সত্যি প্রমাণিত হলো।

ম্যাচ জেতানো ইনিংস

কলকাতার ১৮১ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে লক্ষ্মৌর অবস্থা ছিল নাজুক। ১২.৫ ওভারে যখন মুকুল ব্যাটিংয়ে নামেন, তখন জয়ের জন্য ৪৩ বলে ৭৬ রান দরকার ছিল, হাতে মাত্র ৫ উইকেট। মুকুল এখান থেকে ২৭ বলে অপরাজিত ৫৪ রানের এমন এক অবিশ্বাস্য ইনিংস খেলেছেন, যা দেখে আইপিএলে তোলপাড় শুরু হয়েছে। তাঁর ব্যাটিংয়ের ধরন প্রতিপক্ষের জন্য ভীতিকর হয়ে উঠেছে।

মুকুল সব বলেই মারেন না, বরং বুঝেশুনে মারেন। ঠান্ডা মাথায় ব্যাট করার এই দক্ষতা তাঁকে দুর্দান্ত ফিনিশারে পরিণত করেছে। তিনি বলেন, ‘বোলার হয়তো চারটি পারফেক্ট বল করবে। কিন্তু অন্তত একটি তো নিজের আওতায় পাব। ছক্কা মারতে তো একটি বলই লাগে।’ গতকাল তিনি ঠিক এভাবেই ৭টি ছক্কা মেরেছেন, যা ম্যাচের চাপের মধ্যেও তাঁর শক্তিশালী কবজি ও পরিণত মস্তিষ্কের প্রমাণ দেয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

উত্থানের পেছনের গল্প

প্রথম শ্রেণিতে মাত্র ৪ ম্যাচ, লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে ৫ ম্যাচ ও ১০ ম্যাচ খেলা মুকুলের এই উত্থান কীভাবে হলো? তাঁর বাবা দালিপ কুমার চৌধুরী প্রথম ইঙ্গিত পেয়েছিলেন স্থানীয় অনূর্ধ্ব–১৯ পর্যায়ের একটি ম্যাচে। মুকুলের ক্রিকেটার হয়ে ওঠার যাত্রা শুরু হয়েছিল তাঁর জন্মের আগেই, বাবার স্বপ্ন থেকে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ঝুনঝুনুতে জন্ম নেওয়া মুকুলের জন্য সেখানকার ব্যবস্থা পর্যাপ্ত ছিল না। তাই বাবা তাঁকে সিকরের এক একাডেমিতে ভর্তি করান। শুরুতে পেসার হিসেবে খেলা শুরু করলেও, একদিন উইকেটকিপারের দরকার পড়ায় তিনি সেই দায়িত্ব নেন। এরপর থেকেই তিনি উইকেটকিপার–ব্যাটসম্যান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

পরিবারের ত্যাগ

মুকুলের ‘ক্লিন হিটার’ হয়ে ওঠার যাত্রা সহজ ছিল না। অ্যালার্জির সমস্যা থাকায় হোস্টেলে থাকা কঠিন ছিল তাঁর জন্য। পরিবার বাধ্য হয়ে পার্শ্ববর্তী একটি বাসা ভাড়া করে দেয়। পরে জয়পুরে বড় একাডেমিতে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর মা ও বোন সেখানে চলে যান, যাতে একাকিত্বে ভুগে তিনি পথ না হারান।

দালিপ চৌধুরী ছেলেকে ক্রিকেটার বানাতে বাড়ি বিক্রি করেছেন, ধারকর্জ করে হোটেল ব্যবসা শুরু করেছেন, এমনকি জেলও খাটতে হয়েছে তাঁকে। আত্মীয়স্বজনেরা তাঁকে ‘পাগল’ বলে উপহাস করলেও, তিনি স্বপ্ন ছাড়েননি। মুকুলও সেই আস্থার প্রতিদান দিতে শুরু করেন।

লক্ষ্মৌর সন্ধান

লক্ষ্মৌ কীভাবে মুকুলকে পেল? কোচ জাস্টিন ল্যাঙ্গার দলের ডেটা বিশ্লেষক শ্রীনিবাসকে ধন্যবাদ দিয়েছেন। রাজস্থানের হয়ে ঘরোয়া ক্রিকেটে তখনো নিয়মিত না হলেও, মুকুলের পেশিশক্তি ও কবজির জোর নজর কাড়ে। গত ডিসেম্বরে আইপিএল নিলামে ২ কোটি ৬০ লাখ রুপিতে তাঁকে কিনে নেয় লক্ষ্মৌ।

ল্যাঙ্গার বলেন, ‘কয়েক মাস আগে এক প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে আমরা ওকে প্রথমবার দেখি। আমাদের ডেটা অ্যানালিস্ট বলেছিল, এই ছেলেটাকে আমাদের নিতেই হবে। আমরা তাকে নিয়েছি এবং ভাগ্য ভালো যে তাকে পেয়েছি।’

ধোনির প্রেরণা

মুকুলের প্রেরণায় আছেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমি হেলিকপ্টার শট অনুশীলন করেছি। ধোনি যেভাবে ম্যাচ শেষ করতেন, সেটা আমার ভালো লাগত। তিনি ইয়র্কার বলেও ছক্কা মারতে পারেন।’ গতকাল কলকাতার বিপক্ষে ২৪ বলে ৫৪ রান দরকারের সময় মুকুল ২২ বলে ৫৩ রান তুলেছেন, যা ধোনির মতো সামর্থ্যেরই ইঙ্গিত দেয়।

মুকুল ব্যাখ্যা করেন, ‘প্রাকৃতিকভাবেই আমার শরীর শক্তিশালী। আমি প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০টি ছক্কা মারার অনুশীলন করি। গত পাঁচ-ছয় মাস কঠোর পরিশ্রম করেছি, যার সুফল এখন পাচ্ছি।’ ল্যাঙ্গারের অবদানও তিনি স্বীকার করেন, যিনি প্রতিদিন তাঁকে আলাদা সময় দিয়েছেন।

ল্যাঙ্গার মুকুলের ক্ষুধার প্রশংসা করে বলেন, ‘ওর বয়স অনেক কম। চোখেমুখে ক্ষুধাটা আছে।’ সত্যজিতের ‘জাতিস্মর’ মুকুলের মতোই এই ক্রিকেটারও এখন রান ও ছক্কার খোঁজে অদম্য। সময়ই বলবে, তিনি ক্রিকেট ইতিহাসে অমরত্ব পাবেন কিনা।