বিশ্বকাপের লক্ষ্যে নেইমারের ফিটনেস যুদ্ধ, সান্তোস ক্লাবের বিশেষ উদ্যোগ
ব্রাজিলের তারকা ফুটবলার নেইমার ও ২০২৬ বিশ্বকাপের মাঝে এখন মাত্র ৬৬ দিনের ব্যবধান। বিশ্বকাপ স্কোয়াডে সুযোগ পেতে নেইমারকে যা করার, তা দ্রুত করতে হবে। এই লক্ষ্যে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে তাঁর নিজ ক্লাব সান্তোস। ক্লাবটি আগামী ১১ জুন শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপের আগে নেইমারকে প্রায় সব ম্যাচে মাঠে দেখতে চায়।
কোচ আনচেলত্তির শর্ত ও সান্তোসের প্রস্তুতি
ব্রাজিল দলের কোচ কার্লো আনচেলত্তি স্পষ্ট শর্ত বেঁধে দিয়েছেন, বিশ্বকাপের স্কোয়াডে সুযোগ পেতে নেইমারকে পূর্ণ ফিট হতে হবে। এই লক্ষ্য পূরণে নেইমারকে মাঠে ফেরানোর জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সান্তোস। সামনের ম্যাচগুলোয় নেইমার যেন শতভাগ ফিট থেকে খেলতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে তাঁর শারীরিক ফিটনেস নিয়ে কাজ করছে ক্লাবের বিশেষজ্ঞ দল।
সান্তোস কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা, ২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিল দলকে শক্তিশালী করতে অধিনায়ক নেইমারকে দলে ডাকবেন আনচেলত্তি। আগামী ২৫ মে ব্রাজিলের গ্রানজা কোমারিতে শুরু হবে জাতীয় দলের বিশ্বকাপ প্রস্তুতি ক্যাম্প। তার আগে ১৮ মে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্কোয়াড ঘোষণা করবেন আনচেলত্তি।
ম্যাচের চাপ ও বিশেষ চিকিৎসা
জাতীয় দলের প্রস্তুতি ক্যাম্প শুরুর আগে ব্রাজিলিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ, কোপা দো ব্রাজিল ও কোপা সুদামেরিকানা মিলিয়ে মোট ১৪টি ম্যাচ খেলবে সান্তোস। ক্লাব এই ১৪টি ম্যাচের মধ্যে অন্তত ১৩টিতে নেইমারকে মাঠে রাখতে চায়। কারণ, আনচেলত্তির মতে, ফিট হয়ে উঠতে নেইমারকে নিয়মিত খেলতে হবে। যদিও আগামী বুধবার ইকুয়েডরে দেপোর্তিভো কুয়েঙ্কার বিপক্ষে সুদামেরিকানার উদ্বোধনী ম্যাচে বিশ্রাম দেওয়া হবে নেইমারকে।
টানা ম্যাচ খেলার ধকল সইতে ৩৪ বছর বয়সী নেইমারের শরীরকে আগে তৈরি করতে হবে। সে জন্য নেইমার এবং সান্তোস কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে। সুদামেরিকানার ম্যাচ সামনে রেখে সান্তোসের কোচ কুকা জানিয়েছেন, গত সপ্তাহে বেশ কিছু অনুশীলন সেশনে থাকতে পারেননি নেইমার। শরীরের পেশি ও কোষের পুনর্গঠন দ্রুততর করতে ‘পিআরপি’ (প্লাটিলেট-রিচ প্লাজমা) পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে তাঁর শরীরে। এ প্রক্রিয়ায় রোগীর নিজের রক্ত ব্যবহার করেই দ্রুত সেরে ওঠার চিকিৎসা দেওয়া হয়।
অনুশীলন ও চ্যালেঞ্জ
মাঠের বাইরে থাকলেও ফিটনেস পুনরুদ্ধারে ছাড় দিচ্ছেন না নেইমার। তিনি দিনে দুই বেলা কঠোর অনুশীলন করছেন। সান্তোস কোচের ভাষ্যমতে, বাকি ম্যাচগুলোয় যেন দলের সেরা তারকাকে পূর্ণ শক্তিতে পাওয়া যায়, সে জন্যই দুই বেলা অনুশীলনের এই বিশেষ তোড়জোড়।
সান্তোসের কোচ কুকা বলেন, ‘বছরের মাঝামাঝি বিরতির আগে বাকি ১৩ ম্যাচ যেন সে পুরো উদ্যমে খেলতে পারে, সে জন্যই (সুদামেরিকানায় প্রথম ম্যাচে বিশ্রাম) শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। আমরা এই সময়টুকু তাঁর জন্যই রেখেছিলাম। কোচিং স্টাফের পাশাপাশি ফিজিওলজি ও মেডিক্যাল বিভাগ সমন্বিতভাবে এ প্রক্রিয়ায় কাজ করেছে।’
প্রতিটি ম্যাচে নেইমারকে খেলানোর পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা কতটা সফল হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। বিশেষ করে ব্রাজিলিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে পালমেইরাসের বিপক্ষে ম্যাচের মতো কিছু সুনির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জ সামনে রয়েছে। কারণ, পালমেইরাসের ঘরের মাঠ আলিয়াঞ্জ পারকুয়ের কৃত্রিম ঘাসের মাঠ, সেখানে খেলা নেইমারের জন্য বাড়তি ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
অস্ত্রোপচার ও পুনর্বাসন
কোপা সুদামেরিকানায় কুয়েঙ্কার বিপক্ষে মাঠে নামার আগে নেইমারের বর্তমান শারীরিক অবস্থার বিষয়ে জানিয়েছেন সান্তোস কোচ কুকা। তিনি জানান, সর্বশেষ ফিফা আন্তর্জাতিক বিরতিতে নেইমারের হাঁটুতে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। কুকা বলেন, ‘সে অনুশীলনে ছিল না। অস্ত্রোপচারের পর কয়েক দিন চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে থেকে পুনর্বাসনপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছে। এটি পুরোপুরি চিকিৎসাসংক্রান্ত বিষয় ছিল।’
ব্রাজিলে সর্বশেষ মৌসুম শেষ হওয়ার পরও চিকিৎসকদের পরামর্শে নেইমার তাঁর হাঁটুতে অস্ত্রোপচার করিয়েছিলেন। এর মাত্র কয়েক মাস পর তিনি আবারও অস্ত্রোপচার করালেন। হাঁটুর ক্ষতিগ্রস্ত জয়েন্টে টিস্যু বা কলা শক্তিশালী করতে এবার ‘প্লাটিলেট-রিচ প্লাজমা’ (পিআরপি) নামের এক বিশেষ পুনর্গঠনমূলক চিকিৎসা নেন নেইমার।
নেইমার এই চিকিৎসার জন্য এমন এক সময়কে বেছে নেন, যখন তিনি জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার আশায় ছিলেন। কিন্তু ফ্রান্স ও ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে আনচেলত্তির স্কোয়াডে ডাক পাননি নেইমার। ব্রাজিলের হয়ে নেইমার সর্বশেষ খেলেছেন ২০২৩ সালের অক্টোবরে। বিশ্বকাপ বাছাইয়ে উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে হাঁটুতে মারাত্মক চোট পান। এরপর ক্রমাগত চোট এবং ফিটনেস সমস্যায় আর জাতীয় দলে ফেরা হয়নি তাঁর। ক্লাব ফুটবলেও নিয়মিত খেলতে পারেননি।
কুকা নিশ্চিত করেছেন, সেরে ওঠার নির্ধারিত সময়সীমা বজায় রাখা এবং পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে একটি ‘মিনি প্রি-সিজন’ সম্পন্ন করতে এবারের আন্তর্জাতিক বিরতিকে কাজে লাগিয়েছেন নেইমার। এ কারণে কোপা সুদামেরিকানার উদ্বোধনী ম্যাচে তাঁকে ছাড়াই মাঠে নামবে সান্তোস। কুকা জানান, নেইমারের আগামী দিনের অনুশীলন হবে মূলত গতি, শক্তি ও স্ট্যামিনা বাড়ানোর।



