কথায় আছে, ফুটবল গোল বলের খেলা। খেলতে হয় পা দিয়ে কিন্তু ম্যাচ জিততে হয় মাথা কাজে লাগিয়ে। রোনালদো নাজারিও ২০০২ বিশ্বকাপে আক্ষরিক অর্থেই সেটা করে দেখিয়েছিলেন। বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকেই তাঁর দিকে ছিল সব লাইমলাইট। সেই লাইমলাইট কেড়ে নিয়েছিলেন এক অদ্ভুত চুলের ছাঁট দিয়ে। যা শুধু বিশ্বকাপ নয়, পুরো ফুটবল–দুনিয়ার কাছেই হয়ে আছে আইকনিক।
ঘটনার সূত্রপাত
ঘটনার সূত্রপাত ২০০২ জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বকাপে। ফুটবল বিশ্ব তখন বুঁদ হয়ে আছে ব্রাজিলের ‘দ্য ফেনোমেনন’ খ্যাত রোনালদো নাজারিওর জাদুতে। কিন্তু যত ম্যাচ গড়াচ্ছিল, তত বাড়ছিল মিডিয়ার চাপ। কারণ, সদ্য বড় একটা চোট থেকে উঠে এসেছেন রোনালদো। কোয়ার্টার ফাইনালে লাল কার্ড দেখেন রোনালদিনহো, চোট পেয়ে বেরিয়ে আসেন রোনালদো। ফলে মিডিয়ার সব নজর ছিল রোনালদোর দিকে, তাঁর চোটের প্রশ্নে জর্জরিত ছিল পুরো ব্রাজিলিয়ান দল। সবাই প্রশ্ন তুলছিল—রোনালদো কি খেলতে পারবেন? তিনি কি পুরোপুরি ফিট?
চুলের ছাঁটে চোটের কথা ভুলিয়ে দেওয়া
কারণ, চার বছর আগে বিশ্বকাপ ফাইনালে পুরোপুরি ফিট না হয়েই নামতে হয়েছিল তাঁকে। জিনেদিন জিদানের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে ফ্রান্সের কাছে ফাইনাল হারতে হয়েছিল ব্রাজিলকে। ফলে রোনালদোর চোট নিয়ে সবাই ছিলেন চিন্তিত। রোনালদো চেয়েছিলেন মিডিয়ার পুরো নজরটা অন্য কোনো একদিকে সরিয়ে নিতে। আর সেই ‘অন্য কিছু’ ছিল তাঁর বিচিত্র হেয়ারস্টাইল।
রোনালদো ট্রেনিং সেশনে হাজির হলেন এক অদ্ভুত চুলের ছাঁট নিয়ে। মাথা পুরোটা কামিয়ে ফেলেছেন, শুধু সামনের কিছু অংশে রেখে দিয়েছেন চুল। হুট করে দেখলে অনেকেই ভ্যাবাচেকা খেয়ে যাবেন। রোনালদো পরে হাসতে হাসতে স্বীকারও করেছিলেন, ‘সবাই আমার ইনজুরি নিয়ে যেভাবে কথা বলছিল, আমি সেটা বন্ধ করতে চেয়েছিলাম। তাই ইচ্ছে করেই চুলগুলো ওভাবে কাটলাম। পরদিন থেকে সবাই আমার ইনজুরি ভুলে শুধু চুল নিয়ে কথা বলা শুরু করল!’
মিডিয়ার মনোযোগ সরল
তুরস্ক-ব্রাজিল সেমিফাইনালে রোনালদোর চুলের ছাঁট দেখে মিডিয়া বেমালুম ভুলে গেল চোটের কথা। সবার মনে তখন একই প্রশ্ন, রোনালদো কী ভেবে এমন করে চুল কাটলেন? রোনালদোর মিডিয়ার চাপ থেকে মুক্তি পেয়ে সেমিফাইনালে এগিয়ে নিলেন ব্রাজিলকে। একে তো অদ্ভুত চুলের ছাঁট, সেই সঙ্গে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স। রোনালদোর চোটের কথা মিডিয়া থেকে রীতিমতো উবে গেল।
ফাইনালে মহামানব
ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে রোনালদোর পারফরম্যান্স তাঁকে করে তুলল মহামানব। অলিভার কান যেখানে পুরো টুর্নামেন্টের হজম করেছিলেন এক গোল, সেখানে ফাইনালে রোনালদো একাই তাঁর বিপক্ষে করলেন দুই গোল। একটা কানকে নাকানিচুবানি খাইয়ে পাশ কাটিয়ে, আরেকটা কানের হাত থেকে বল ছিনিয়ে নিয়ে। জার্মানিকে ধরাশায়ী করে টুর্নামেন্টে ৮ গোল করে ব্রাজিলকে এনে দিলেন পঞ্চম শিরোপা। আর সেই সঙ্গে অদ্ভুত চুলের ছাঁট হয়ে উঠল আইকনিক।
আজও অমলিন স্মৃতি
এখনো রোনালদোর কথা বলা হলে সবার আগে ভেসে উঠে সেই চুলের ছাঁট। নেইমার একবার স্বীকারও করেছিলেন, ব্রাজিলে এমন কোনো ছেলে নেই যে জীবনে একবার ‘রোনালদো কাট’ দেয়নি। এমনকি বাংলাদেশেও প্রচুর ব্রাজিলভক্ত সেই সময় রোনালদো ছাঁট দিয়েছেন মাথায়। রোনালদোর চুলের ছাঁট শুধু বিশ্বকাপ নয়, হয়ে আছে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় আইকনিক দৃশ্যগুলোর একটি।



