প্রাণিজগতে মানবমস্তিষ্ক উৎকর্ষের শিখরে অবস্থান করছে। তবে অনেক প্রাণীই বুদ্ধির চমৎকার প্রয়োগ ঘটায়। দিন দিন প্রাণীর বুদ্ধি সম্পর্কে নতুন নতুন তথ্য জানছেন বিজ্ঞানীরা। বর্তমানে একটি-দুটি নয়, বুদ্ধিমান প্রাণীর সংখ্যা কয়েক ডজন।
ডলফিন: আত্মসচেতন ও শিখনপটু
মানুষের পরই সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী কোনটি, তার সুনির্দিষ্ট কোনো নাম নেই। তবে ডলফিন, হাতি, শিম্পাঞ্জি, কাক বা পিঁপড়াদের বুদ্ধির ব্যাপারে কারও দ্বিমত নেই। প্রথমেই আসা যাক ডলফিনের কথায়। দেহের আকারের তুলনায় এদের মস্তিষ্ক বেশ বড়। এরা আত্মসচেতন প্রাণী। আয়নায় নিজেকে দেখে চিনতে পারে। তুখোড় ছাত্রের মতো শিখতে ও অনুকরণ করতে পারে প্রাণীটি। মাটি দিয়ে শিকার ধরার ফাঁদ পাততে পারে এরা। কোরাল থেকে বাঁচতে স্পঞ্জ ব্যবহার করে। খাবারের অনুসন্ধান করতে পরিবেশকে নিজের মতো করে সাজিয়েও নিতে পারে।
কাক: পরিকল্পনায় দক্ষ
দেখতে সুশ্রী না হলেও কাজেকর্মে চতুর আরেক প্রাণী কাক। বিশেষ করে পরিকল্পনা সাজাতে এরা দারুণ দক্ষ। হাঁটতে শেখা বাচ্চাদের চেয়েও ভালো পরিকল্পনাবিদ এরা। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বক্সের ভেতরে খাবার তালাবদ্ধ করে অনেকগুলো চাবি দিলে কাক সঠিক চাবি দিয়ে তালা খুলতে পারে। ওই পরীক্ষায় ৯০ ভাগ ক্ষেত্রেই তারা তালা খুলতে পেরেছে। না পারলেও অপেক্ষা করেছে ১৭ ঘণ্টা পর্যন্ত।
শিম্পাঞ্জি: সমস্যা সমাধানে পারদর্শী
শিম্পাঞ্জির বুদ্ধির কথা কে না জানে! এদের বুদ্ধি নিয়ে অগণিত গবেষণা হয়েছে। ডলফিনের মতো এরাও আয়নায় নিজেকে চিনতে পারে। এমনকি ভিডিওতেও নিজেকে দেখে নিজের পরিচয় বুঝতে পারে। মানবশিশুরও এই কাজটিতে অভ্যস্ত হতে সময় লাগে চার বছর। সাংকেতিক ভাষা বুঝতে পারে প্রাণীটি। দ্বিমত থাকলেও কেউ কেউ বলেন, এরা শব্দও চিনতে পারে। শব্দের বিভিন্ন সুরের মাধ্যমে এরা নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের যোগাযোগ করে। পাথরখণ্ড, গাছের ডালসহ বিভিন্ন যন্ত্র এরা নানা কাজে ব্যবহার করে। সব মিলিয়ে শিম্পাঞ্জির বড় একটি দক্ষতা হলো প্রবলেম সলভিং বা সমস্যার সুনির্দিষ্ট সমাধান করা। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো অন্যের আচরণ থেকে শেখা। ব্যক্তিগত কাজেই শুধু নয়, সামাজিক আচরণেও এই বুদ্ধি কাজে লাগে। এ ধরনের দক্ষতার নাম সোশ্যাল ইন্টেলিজেন্স বা সামাজিক বুদ্ধিমত্তা।
পিঁপড়া: নকশা চিনতে ও গুনতে পারে
আরেক বিচক্ষণ প্রাণী পিঁপড়া। এরা শুধু পরিশ্রমই করে না, কাজে লাগায় নিজের মস্তিষ্কও। সূর্যের অবস্থান, বস্তুর ঘ্রাণ, বায়ুর দিক—কোনো কিছুই এদের চোখ এড়ায় না। শুধু তা-ই নয়! এরা নকশা চিনতে পারে। গুনতে পারে পায়ের পদক্ষেপ। অনেকে তো এদের সবচেয়ে অকৃত্রিম কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেম বলেন। একা একা কাজ করলেও সবাই মিলে নেটওয়ার্ক বা কাজের জাল তৈরি করে এরা। বড় দূরত্ব অবলীলায় পার হওয়া, শিকারির চোখে ধুলো দেওয়া কিংবা বাচ্চাদের যত্ন নেওয়া—কী নেই এদের মধ্যে! এরা সম্প্রদায়ের জন্য শহর নির্মাণ করে, অন্য প্রাণী চাষ করে, এমনকি ফসল ফলায়। সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে এবং কাজের সুবিধার্থে নিজেদের মধ্যে স্তরবিন্যাস মেনে চলে এরা। একক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি পরামর্শের মাধ্যমেও এরা সিদ্ধান্তে পৌঁছায়।
নেকড়ে: যোগাযোগ ও পরিকল্পনায় পটু
সম্প্রদায়গত জীবনে অভ্যস্ত আরেক প্রাণী নেকড়ে। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা যায়, নেকড়ে যন্ত্র ব্যবহার করতেও সিদ্ধহস্ত। পানিতে রাখা ফাঁদ থেকে রশি টেনে টেনে কাঁকড়া বের করে এনেছে একটি নারী নেকড়ে। এ থেকে বোঝা যায়, নেকড়েরা প্রবলেম সলভিংয়ে পটু। এ ছাড়া এরা মানুষ ও নিজেদের প্রজাতি থেকেও শিখতে পারে। আগে মনে করা হতো, নেকড়ে কোনো বুদ্ধি খরচ করে না; শুধু বেঁচে থাকার তাগিদই তাকে খাবারের পেছনে তাড়িয়ে বেড়ায়। কিন্তু এখন প্রাণিবিদেরা জানেন, এরা পরিকল্পনা সাজানো ও যোগাযোগরক্ষায় অত্যন্ত পারদর্শী। এরা ধাঁধা সমাধান করতে পারে। যোগাযোগের জন্য এরা নির্ভর করে অনেকগুলো আলাদা শব্দের ওপর। সমাধান মনে রাখতে পারে এবং অন্য প্রাণীকে দেখে শিখতে পারে। দলবদ্ধভাবে কাজ করে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে এরা দারুণ সচেতন।
লেখক: প্রভাষক, পরিসংখ্যান বিভাগ, ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজ। সূত্র: সেন্টিয়েন্ট মিডিয়া ডটকম, আর্থ রেঞ্জার্স ডটকম, ব্রিটানিকা।



