সুনামগঞ্জের শিমুলবাগানে বসন্ত উৎসব: সংগীত-নৃত্যে মুখরিত প্রকৃতির কোলে
সুনামগঞ্জের শিমুলবাগানে বসন্ত উৎসবের রঙিন আয়োজন

সুনামগঞ্জের শিমুলবাগানে বসন্ত উৎসব: প্রকৃতির মাঝে সাংস্কৃতিক মিলন

আজ শনিবার, পয়লা ফাল্গুনে বসন্তকালের সূচনায়, সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার শিমুলবাগানে দিনব্যাপী বসন্ত উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই উৎসবে সংগীতের তালে তালে নৃত্য পরিবেশন করেছেন একদল শিল্পী, যা দর্শকদের মুগ্ধতা ছড়িয়েছে। শিমুলগাছের ফুলে ফুলে লাল হয়ে থাকা বাগান এবং ঝরা ফুলে লাল হয়ে থাকা সবুজ ঘাসের জমিন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য উপহার দিয়েছে।

উৎসবের সূচনা ও আয়োজন

বেলা ১১টায় সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া উৎসবের উদ্বোধন করেন। বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের ‘বসন্ত বাতাসে সই গো...’ গানের মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হয়। জেলা সংস্কৃতি কর্মকর্তা আহমেদ মঞ্জুরুল হক চৌধুরী জানান, এবার উৎসবে সুনামগঞ্জের প্রায় ২০০ শিল্পী অংশ নিয়েছেন। সংগীত, নৃত্য, কবিতা, আদিবাসী ও পাহাড়ি নৃত্য, বাউল গানসহ লোক–ঐতিহ্যের সব আয়োজন জমে উঠেছে।

শিমুলবাগানের অবস্থান ও গুরুত্ব

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা নদীর পশ্চিম পাড়ে মানিগাঁও এলাকায় এই শিমুলবাগানের অবস্থান। যাদুকাটা নদীর তীর ঘেঁষে থাকা এই বাগান এখন অনেকের কাছে প্রিয় পর্যটনকেন্দ্র। এখানে এলে একই সঙ্গে হাওর, নদী, পাহাড়ের দেখা মেলে। জেলা শিল্পকলা একাডেমি ২০২৩ সাল থেকে সুনামগঞ্জের চোখজুড়ানো এই শিমুলবাগানে বসন্ত উৎসবের আয়োজন করে আসছে।

বাগানের ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্য

স্থানীয় বাসিন্দা, কবি ও আলোকচিত্রী অমিয় হাসান জানান, ২০০১ সালে এই বাগান গড়ে তোলেন এলাকার বৃক্ষপ্রেমী ও সমাজকর্মী প্রয়াত জয়নাল আবেদীন। তাঁর উত্তরসূরিরা এই বাগানের নাম দিয়েছেন ‘জয়নাল শিমুল বাগান’। ৩০ একর জায়গাজুড়ে এই বাগানে রয়েছে প্রায় তিন হাজার গাছ, যা দেশের সবচেয়ে বড় শিমুলবাগান হিসেবে পরিচিত। ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই ফুল ফুটতে থাকে এবং মাসজুড়েই গাছে ফুল থাকে, পরে ধীরে ধীরে ঝরে পড়ে।

পর্যটকদের আনন্দ ও সুবিধা

বসন্তবরণে শিমুলবাগান সেজেছে নতুন রূপে। বাগানজুড়ে গাছের ডালে থোকা থোকা ফুল, পাখির কলরব, এবং নদীর কলতান মন উদাস করে দেয়। বিশেষ এই দিন ঘিরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পর্যটকেরা আসেন, বাগানে ঘুরে বেড়ান, ছবি তোলেন, এবং গানে মাতেন। প্রয়াত জয়নাল আবেদীনের ছেলে রাখাব উদ্দিন জানান, পর্যটকদের সুবিধার জন্য বাগানে ক্যানটিন চালু করা হয়েছে, বিশ্রামের ব্যবস্থা আছে, এবং উপজেলা প্রশাসন থেকে একটি গেস্টহাউস করা হয়েছে।

উৎসবের পরিবেশ ও অংশগ্রহণ

তরুণেরা দল বেঁধে শাহ আবদুল করিম, হাছন রাজা, দুর্বিন শাহের গানের সুরে মাতেন। কেউ পরিবার নিয়ে, কারও সঙ্গে প্রিয় মানুষ নিয়ে, বা একা এসে প্রকৃতির মধ্যে নিজেকে খোঁজেন। শিশুরাও আনন্দে দৌড়াদৌড়ি, ঘোড়ায় চড়া, দোলনায় দোল খাওয়া, এবং পাহাড় দেখার মাধ্যমে অংশ নেয়। বসন্তের হাওয়ায় ভালোবাসার গল্পে কাটে অনেকের সকাল-দুপুর, যা এই উৎসবকে আরও স্মরণীয় করে তুলেছে।