বসন্ত উৎসবে মুখর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, নতুন স্থানে প্রাণের স্পন্দন
বসন্ত উৎসবে মুখর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, নতুন স্থানে প্রাণের স্পন্দন

বসন্ত উৎসবে মুখর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, নতুন স্থানে প্রাণের স্পন্দন

ঋতুরাজ বসন্তকে বরণ করতে জাতীয় বসন্ত উৎসব উদ্যাপন পরিষদ ‘বসন্ত উৎসব’ আয়োজন করেছে। আজ শনিবার সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ভেতরের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। শিমুল ও পলাশের রঙে লাল বসন্তের প্রথম সকাল মুখর হয়ে উঠেছিল গানের সুর আর নৃত্যের ছন্দে। আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রাঙ্গণ ঋতুরাজের আগমনী দিনে বিপুল প্রাণের উচ্ছ্বাসে স্পন্দিত হয়েছিল আজ শনিবার সকাল থেকে। ‘এসো মিলি প্রাণের উৎসবে’ আহ্বান নিয়ে ৩৮তম বারের মতো বসন্ত উৎসবের আয়োজন করেছিল জাতীয় বসন্ত উদ্যাপন পরিষদ।

উৎসবের সূচনা ও পরিবেশনা

সকাল আটটায় বেঙ্গল পরম্পরা সংগীতালয়ের শিক্ষার্থীদের সমবেত যন্ত্র ও কণ্ঠসংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় উৎসবের কার্যক্রম। এরপর দেশের বিশিষ্ট শিল্পীদের একক সংগীত, আবৃত্তির সঙ্গে ছিল দলীয় সংগীত আর নৃত্যের একের পর এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা। দর্শকেরাও অংশ নিয়েছিলেন বসন্তের ঐতিহ্যবাহী সজ্জায়। অংশগ্রহণকারী শিল্পীরা, বিশেষত নাচের শিল্পীরা এসেছিলেন বর্ণাঢ্য সাজে। নারীদের পরনে ছিল বাসন্তী রঙের ছাপা শাড়ি, খোঁপা বা মাথায় ফুলের সজ্জা। পুরুষদের বেশির ভাগই পরেছেন উজ্জ্বল বর্ণের পাঞ্জাবি। রাজধানীতে শীতের প্রভাব কমেছে আরও কিছুদিন আগেই। বসন্তে গরম পোশাকের আবশ্যকতা নেই বলে বাহারি সাজে সেজেগুজে উৎসবকে রঙিন করে তুলেছিলেন আবালবৃদ্ধবনিতারা।

অধিকাংশ গান, আবৃত্তি আর নৃত্য ছিল বসন্ত নিয়ে। বসন্ত ভালোবাসারও ঋতু। তাই ঋতুরাজের আগমনী দিনে ভালোবাসার গানও বাদ পড়েনি পরিবেশনা থেকে। দর্শক–শ্রোতাদেরও অনেকে এসব গানের সঙ্গে গলা মিলিয়েছেন। নাচের মুদ্রায় তাল মিলিয়ে নৃত্য করেছেন কেউ কেউ। জাদুঘরের প্রথম তলার খোলা পরিসরে মঞ্চ করে অনুষ্ঠান। সামনে দর্শকদের জন্য সারি দিয়ে চেয়ার পাতা হয়েছিল। তবে দর্শকসংখ্যা ছিল প্রচুর। অনেকে চারপাশে দাঁড়িয়ে ও সিঁড়ির ওপর থেকে অনুষ্ঠান উপভোগ করেছেন। আবার অনেকে প্রবেশপথের সামনের উন্মুক্ত পরিসরে ঘুরে ঘুরে ছবি তুলেছেন। অনেকে ক্যাফেটেরিয়ার ভেতরে ও সামনের খোলা পরিসরে বসে চা পানের পাশাপাশি সঙ্গীদের সঙ্গে আলাপে–আড্ডায় মেতেছেন। সবটা মিলিয়ে দারুণ এক আনন্দঘন আয়োজন সম্পন্ন হলো বসন্ত উৎসবের এই নতুন স্থানে।

উৎসবের ইতিহাস ও নতুন স্থান

বসন্ত উৎসব শুরু হয়েছিল ১৪০১ বঙ্গাব্দ মোতাবেক ১৯৯২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায়। এর পর থেকে বরাবর সেখানেই দিনভর উৎসব হয়েছে। জুলাই বিপ্লবের পর পরিবেশ পাল্টে যায়। বকুলতলায় উৎসব করার আর অনুমতি মেলেনি। বকুলতলায় আশ্রয় হারিয়ে ‘অনিকেত’ আয়োজকেরা এরপর বিভিন্ন স্থানে উৎসব আয়োজনের জন্য চেষ্টা করেছেন। অনুমতি পাননি। অবশেষে তাঁরা শরণাপন্ন হয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের কাছে। বসন্তকথনে এই কথাগুলোই তুলে ধরলেন আয়োজকেরা।

জাতীয় বসন্ত উৎসব উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মানজার চৌধুরী বলেন, ‘এবারই প্রথম চারুকলার বকুলতলার বাইরে উৎসবটির আয়োজন করতে হলো। বকুলতলাতেই উৎসব করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু সেখানে অনুমতি পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে পরিস্থিতি কেমন হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। সে কারণে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এসেছি। মুক্তিযুদ্ধ হলো বাংলাদেশের শিকড়। আর বসন্ত উৎসবের মতো ঋতুভিত্তিক উৎসগুলো আমাদের সংস্কৃতির শিকড়। শিকড়ের টানেই আমরা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্মারক এই প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছি। তবে আগামী বছর থেকে আমরা আবার চারুকলার বকুলতলাতেই উৎসব করতে আগ্রহী। সংস্কৃতিচর্চার মুক্ত পরিবেশ বজায় থাকবে—এটা আমাদের প্রত্যাশা।’

আয়োজকদের প্রতিক্রিয়া

বসন্তকথনে উদ্যাপন পরিষদের সহসভাপতি কাজল দেবনাথ বলেন, ‘আমরা মনে করি, আজ এই উৎসবের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতি অঙ্গনে একটি বন্ধ দরজা খুলে গেল।’ আগামী দিনগুলোতে পরিবেশ আরও উন্মুক্ত হবে বলে তিনি আশা ব্যক্ত করেন। সভাপতির বক্তব্যে বসন্ত উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি স্থপতি সফিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বেশ কিছুদিন থেকেই মব আতঙ্ক নিয়ে জনমনে একটি ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। আমাদের আশঙ্কা ছিল তিন দশকের বেশি সময় ধরে চলে আসা এই ঋতুভিত্তিক সাংস্কৃতিক উৎসবটি করতে পারব কি না। কারা ক্ষমতায় আসবে, তারা দেশে সংস্কৃতিচর্চার পরিবেশ রুদ্ধ করে দেবে কি না, এ নিয়েও উদ্বেগ ছিল। তবু আমাদের প্রস্তুতি ছিল। এই পরিস্থিতিতে উৎসবটি করতে পেরেছি। আর তেমন কোনো প্রচার না করা সত্ত্বেও যে বিপুলসংখ্যক মানুষ এখানে অংশ নিয়েছেন, সে জন্য আমরা আনন্দিত।’ সফিউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, ভবিষ্যতে সরকার দেশে সংস্কৃতিচর্চার জন্য, সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ও পরিবেশ নিরাপদ রাখতে কার্যকর ভূমিকা নেবেন, এটা জনসাধারণের প্রত্যাশা।

শিল্পী ও পরিবেশনা

অনুষ্ঠানের একক কণ্ঠের পরিবেশনার মধ্যে শিল্পী বিজন চন্দ্র মিস্ত্রি গেয়েছেন ‘ফুল ফাগুনের এল মৌসুম’; তানজিলা তমা গেয়েছেন ‘আহা আজি এ বসন্তে’; অনিমা রায়ের নেতৃত্বে তাঁর দলের শিল্পীরা পরিবেশন করেন ‘ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে বনে বনে’। বিমান চন্দ্র বিশ্বাস গেয়েছেন ‘বসন্ত বাতাসে সই গো’; শ্রাবণী গুহ রায় গেয়েছেন, ‘আমি মেলা থেকে তালপাতার এক বাঁশি’; ‘মধু মালতি ডাকে আয়’ গেয়েছেন সুস্মিতা সূচি, মারুফ হোসেন গেয়েছেন ‘বকুল ফুল বকুল ফুল’; রীতা রানী সাহা গেয়েছেন ‘বন্ধু বিনা পরান বাঁচে না’।

সম্মেলক গানের মধ্যে সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠীর পরিবেশনা ছিল ‘আজ জীবন খুঁজে পাবি ছুটে ছুটে আয়া’; বহ্নিশিখার পরিবেশনা ‘ফুটিল ফুল ফুটিল চৈতি রাতের শেষে’। নায়লা তারান্নুম আবৃত্তি করেছেন কবি আসাদ চৌধুরীর কবিতা ‘ফাল্গুন এলো’। ‘কুহু কুহু ডাক দিলা কোকিলে’ গানের সঙ্গে অনীক বসুর পরিচালনায় নৃত্য পরিবেশন করেছেন স্পন্দের শিল্পীরা। কত্থক নৃত্য সম্প্রদায়ের শিল্পীরা কত্থক নৃত্য পরিবেশন করেন সাজু আহমেদের পরিচালনায়।

উৎসব চলেছে দুপুর অবধি। একক সংগীত পরিবেশনায় আরও অংশ নিয়েছেন বিশিষ্ট শিল্পী ফাহিম হোসেন চৌধুরী, মহাদেব সাহা, আবিদা রহমান, ফেরদৌসী কাকলি, সেমন্তী মঞ্জুরি, অবিনাশ বাউল, সঞ্চিতা রাখী প্রমুখ। আবৃত্তি করেছেন বেলায়েত হোসেন। ছিল ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর পরিবেশনাও। সম্মেলক গান করেছে রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, বুলবুল ললিতকলা একাডেমি, সুরবিহার, পঞ্চভাস্কর, সুরতীর্থ।

নৃত্যে অংশ নিয়েছে অনেকগুলো সংগঠন। তাদের মধ্যে ছিল—গৌড়ীয় নৃত্য একাডেমি, নবচেতনা, গারো কালচারাল একাডেমি, নৃত্যর, তুরঙ্গমী, অংশী, ভাবনা, দিব্য, নন্দিনী নৃত্যালয়, নর্তনম, জাগো আর্ট সেন্টার, নৃত্যলোক, নৃত্যাক্ষ, ধৃতি নর্তনালয়, বাংলাদেশ একাডেমি অব পারফর্মিং আর্ট, সাধনা, স্বপ্ন বিকাশ কলা কেন্দ্র, ফিকা চাকমা, মম কালচারাল সেন্টার, নৃত্যালোকসহ অনেকে। সঞ্চালনা করেন নায়লা তারাননুম চৌধুরী ও আহসান দিপু।

স্পনসর ও সমাপ্তি

বসন্ত উৎসবের স্পনসর ছিল ইস্পাহানি গ্রুপ। শ্রোতা–দর্শকদের জন্য চা পরিবেশন করেছে তারা। ইস্পাহানি গ্রুপের উপমহাব্যবস্থাপক এইচ এম ফজলে রাব্বি বলেন, বসন্ত উৎসবের শুরু থেকেই তাঁরা এর সঙ্গে যুক্ত আছেন। ঋতুভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক এই উৎসব বাংলাদেশের একটি প্রাণের উৎসব। এর সঙ্গে আছে ভালোবাসা দিবস। সব মিলিয়ে ইস্পাহানি গ্রুপ ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক আয়োজনে যুক্ত থাকতে পেরে আনন্দিত।