ঈদুল আজহায় ঐতিহ্যের জয়: অনলাইনের চেয়ে হাটেই বেশি আস্থা ক্রেতাদের
ঈদুল আজহায় হাটেই বেশি আস্থা ক্রেতাদের, অনলাইনে আগ্রহ কম

চলতি মাসেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা। এই উৎসবকে সামনে রেখে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শুরু হয়েছে কোরবানির পশুর হাট। কিছুদিনের মধ্যেই আরও বাড়বে এই হাটের সংখ্যা। বাড়বে ক্রেতাদের ভিড়ও। তবে প্রযুক্তির এই সময়ে সরাসরি হাটে গিয়ে কোরবানির পশু কেনার পাশাপাশি শুরু হয়েছে অনলাইনে পশু কেনাবেচার নানা উদ্যোগ। যার মাধ্যমে গ্রাহকরা কোনও ঝক্কি ছাড়াই নিজেদের কোরবানির পশু কিনতে পারবেন কিংবা জবাই করা পশুর মাংস পেয়ে যাবেন নিজ বাড়িতেই।

তবে প্রযুক্তির সময়ের এই সুবিধা নিতে অনীহা রয়েছে অনেক ক্রেতাদের মধ্যে। তারা বেশি স্বস্তি খুঁজছেন সরাসরি হাটে গিয়ে গরু দেখে-বুঝে কেনার মধ্যে। গরুর স্বাস্থ্য, আকার, ওজন, দাঁতসহ বিভিন্ন অবস্থা নিজ চোখে যাচাই করে তারপর সিদ্ধান্ত নিতে চান তারা। পাশাপাশি দরদাম করে কেনার সুযোগ এবং বিক্রেতার সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুবিধাও ক্রেতাদের হাটমুখী রাখছে।

হাটে গিয়ে কোরবানির পশু কেনাতেই আগ্রহ বেশি

ক্রেতাদের কোরবানির পশু কেনা-বেচার ক্ষেত্রে অনলাইনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রচার-প্রচারণা থাকলেও ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি নিজে দেখে-শুনে কেনার মধ্যেই। মানুষের আস্থা ও আগ্রহ এখনও ঐতিহ্যগত হাটের প্রতিই রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে হাটে গিয়ে পশু বাছাই, দরদাম করা এবং সরাসরি দেখে কেনার অভিজ্ঞতাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন ক্রেতারা। তারা জানান এতে করে ঈদের আনন্দ, আমেজ যেমন থাকে তেমনি নিজের সন্তুষ্টিও থাকে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন মো. কবির হোসেন। তিনি বলেন, আমি নিয়মিতই দেখি ফেসবুকে আসে বিভিন্ন কোম্পানি অনলাইনে গরু-খাসি বিক্রি করছে। আবার তারা কোরবানি দিয়ে বাসায় পৌঁছে দেবে এটাও দেখি। কিন্তু এটা আমার পছন্দ না। অনলাইনে কিনলে ঈদের যে আমেজ সেটাই আমি পাই না। নিজে দেখে-শুনে দামাদামি করে কেনারও একটা ব্যাপার আছে। আর অনলাইনে এসব কেনাকাটা এখনও আমাদের দেশে সেভাবে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে পারেনি আমার মনে হয়।

নাজমুল হোসেন নামের আরেক ক্রেতা বলেন, অনলাইনে কিনলেতো কেনাই যায়। যদিও বিশ্বাসের জায়গায় প্রশ্ন থেকে যায়। এটা ছাড়াও বাচ্চাদের নিয়ে হাটে গিয়ে কেনার যে ব্যাপারটা থাকে, ওরা যে আনন্দটা পায় সেটাতো অনলাইনে কিনলে আর থাকছে না। এমনিতেই আমাদের বিভিন্ন ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে, এখন অনলাইনের পাল্লায় পরে যদি এই আনন্দটাও হারিয়ে ফেলি তাহলেতো হবে না।

আরেক ক্রেতা মাহফুজুর রহমান বলেন, আমার মতে কোরবানি নিজের চোখের সামনেই হওয়া উচিত। মানে আমরাতো এই কালচারে অভ্যস্ত। অনলাইনে আমাকে কী দেখাচ্ছে আর কী দিচ্ছে সেটা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়। যদি কখনো ভালো কোনো কোম্পানি বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারে আমার তখন ভেবে দেখবো কী করা যায়। তারপরও মনে ঈদের আমেজের জন্য হাটে গিয়ে নিজেরা দেখে কেনাই ভালো। আবার এটা হতে পারে যে আমি গিয়ে পছন্দ করে রাখলাম, যেহেতু ঢাকা শহরে রাখার জায়গার একটা সমস্যা, পরে ঈদের আগের দিন নিয়ে আসলাম। এটা করা যেতে পারে।

মহসিন রেজা উৎসব বলেন, আমি দেখেছি আমার দাদা টাকা দিলে আমার বাবা-চাচারা গিয়ে গরু কিনে আনতো। আর এখন বাবা টাকা দিলে আমরা ভাইয়েরা হাটে গিয়ে কিনে নিয়ে আসি। এটার আনন্দ কি অনলাইনে পাওয়া সম্ভব? আর আমাদের ব্যবসায়ীদের যে অবস্থা নিজে দেখে কিনলেই খারাপ জিনিস নিয়ে আসি, আর অনলাইনে কিনলে কি হবে সেটা কীভাবে বুঝবো। আর এখনও দেশে হয়তো এক পার্সেন্ট মানুষও অনলাইনে কিনে কোরবানি দেয় না মনে হয়। এছাড়া আমি আমাদের ঐতিহ্য, আমি যেটা দেখে বড় হয়েছি সেটাই করতে চাই।

অনলাইনে কোরবানির সুবিধা কী, যা বলছেন বিক্রেতারা

যুগের পর যুগ ধরেই ঈদুল আজহা বা কোরবানি ঈদে বিভিন্ন হাটে গিয়ে কোরবানির পশু কিনে থাকেন কোরবানি দিতে ইচ্ছুক ক্রেতারা। তবে কালের পরিবর্তনে প্রযুক্তির হাওয়া লেগেছে পশুর হাটেও। এখন কোরবানির পশু কেনা-বেচা হয় অনলাইনে। ঘরে বসেই ক্রেতারা কিনতে পারেন কোরবানির পশু। এছাড়া কোরবানির পশু জবাই করে, মাংস কেটে বাসায় পৌঁছে দেয়ার মতো সেবাও দিয়ে থাকেন এসব ব্যবসায়ীরা। দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোগক্তারা এই সেবা দিচ্ছে গ্রাহকদের। এই ব্যবসায়ীরা বলছেন শহরের কর্মব্যস্ত মানুষদের নির্ঝঞ্ঝাট কোরবানি দিতেই এই সেবা দিচ্ছেন তারা।

এই বিষয়ে অনলাইনে কোরবানি দেয়ার প্রতিষ্ঠান সবুজ উদ্যোগের মার্কেটিং এন্ড সেলস বিভাগের সিনিয়র ম্যানেজার জিয়ারুল পাটোয়ারি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমাদের খুব বড় কোনও প্রতিষ্ঠান নয়, বরং ছোট পরিসরে পরিচালিত একটি সেবা। তিনি বলেন, আমরা কিন্তু মাংস বিক্রি করি না; বরং কোরবানির পুরো ব্যবস্থাপনাকে একটি সার্ভিস হিসেবে প্রদান করে থাকি। বিশেষ করে যেসব পরিবারে পুরো প্রক্রিয়া সামলানোর মতো পর্যাপ্ত লোকজন থাকে না তাদের জন্য আমরা এই সেবা দিয়ে থাকি। তবে কেবল রাজধানীতেই তারা এই সেবা দিয়ে থাকেন বলেও জানান তিনি।

অনলাইনে কোরবানির পুরো প্রক্রিয়াটি কীভাবে পরিচালিত হয়—এ বিষয়ে জিয়ারুল পাটোয়ারি জানান, ঈদের প্রায় এক মাস আগে থেকেই তারা বুকিং কার্যক্রম শুরু করেন। দেশি গরু লালন-পালন করেন এমন খামারিদের সঙ্গে আগে থেকেই তাদের চুক্তি থাকে। গরুর লাইভ ওয়েট সাধারণত ২৬০ থেকে ৩০০ কেজির মধ্যে রাখা হয়। এরপর কাস্টমারদের কাছে গরুর তথ্য ও সম্ভাব্য খরচ জানানো হয়। গরু আনার পর কয়েকদিন পরিচর্যা করা হয়, তারপর শরীয়ত অনুযায়ী জবাই, প্রসেসিং ও ডেলিভারি সম্পন্ন করা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যেই সার্ভিস চার্জ অন্তর্ভুক্ত থাকে।

তিনি বলেন, শুরুতে প্রতিটি ভাগের জন্য ৭,০০০ বুকিং মানি নেওয়া হয়। চূড়ান্ত খরচ গরুর লাইভ ওয়েটের ওপর নির্ভর করে নির্ধারণ করা হয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে গরুর ওজন অনুমানের চেয়ে ১০–২০ কেজি বেশি হয়ে গেলে ভাগপ্রতি অতিরিক্ত ৫০০ থেকে ১,০০০ পর্যন্ত লাগতে পারে। তবে এ বিষয়টি আগে থেকেই কাস্টমারদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। আবার অনেক সময় গরুর ওজন কম হলে অতিরিক্ত নেওয়া টাকা ফেরতও দেওয়া হয়।

অনলাইনে কোরবানি নিয়ে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাত বছর ধরে আমরা এই সেবা দিয়ে আসছি। গত বছর আমরা প্রায় ৩০–৩৪টি গরু কোরবানি করেছিলাম। এই বছরে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৭–২৮টি বুকিং হয়েছে।

মাংস কতক্ষণে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেয়া হয় জানতে চাইলে তিনি জানান, ঈদের প্রথম দিনই ডেলিভারি সম্পন্ন করা হয়। দুইটি স্লট থাকে—একটি দুপুর ২টার মধ্যে এবং অন্যটি বিকাল ৫টার মধ্যে। এর মধ্যেই আমরা পৌঁছে দিতে পারি।

কারো সঙ্গে অংশীদার হয়ে পশু কেনা যায় কিনা, নাকি একাই নিতে হবে সম্পূর্ণ এবং অংশীদার হলে কীভাবে ভাগ করা হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, দুই সিস্টেমই আছে। কেউ এক ভাগ বা দুই ভাগে নিতে পারে। আবার যদি পুরো গরুটা নিতে চায় তাহলে সে সাত ভাগে নিতে পারবে, মানে পুরো গরুটা। অংশীদার হয়ে কোরবানি দিলে সাত ভাগে সমানভাবে সব অংশ ভাগ করা হয়। মাংস, কলিজা, ভুঁড়ি, মাথা ও পা—সবকিছুই ভাগের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকে। ফলে প্রত্যেক অংশগ্রহণকারী সব ধরনের অংশই পান।

ক্রেতার কোনও অভিযোগ বা সমস্যার ক্ষেত্রে কী করা হয় জানতে চাইলে জিয়ারুল বলেন, এখন পর্যন্ত বড় কোনও সমস্যা হয়নি। তবে যদি আমাদের কোনো ভুল হয়, তাহলে টাকা ফেরত দেওয়া বা মাংস দিয়ে সমন্বয় করা হয়।

অনলাইনে কোরবানি দেয়ার আরেক প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল মিটের কেয়ারলাইনের কর্মরত আব্দুল আহাদ জানান, তারা চারটি সার্ভিস দিয়ে থাকেন। হোল কাউ প্রসেস ক্যাটেল, শেয়ার কোরবানি, লাইভ ক্যাটেল এবং গোট সার্ভিস। সাধারণভাবে ঈদের দুই দিন আগে পর্যন্ত অর্ডার নেওয়া হয়। তবে পশু পর্যাপ্ত থাকলে ঈদের দিন বিকাল পর্যন্তও অর্ডার নেওয়া হতে পারে।

তিনি আরও জানান, লাইভ ক্যাটেল (জীবন্ত পশু) অর্ডার করলে সেটা ঈদের চার থেকে দুই দিন আগে পাওয়া যাবে। তবে সেক্ষেত্রে ২৫০ কেজি বা তার বেশি ওজনের গরু অর্ডার করতে হবে। এছাড়া হোল কাউ প্রসেস ক্যাটেল (জবাই ও প্রসেস করা গরু) অর্ডার করলে মাংস ঈদের দ্বিতীয়দিন পৌঁছাবে ক্রেতার বাড়িতে। আর যদি কেউ অংশীদার হয়ে কোরবানি দিতে চায় সেক্ষেত্রে তাদের কোরবানির মাংস পাওয়া শুরু করবে ঈদের চতুর্থ দিন থেকে, সেটা বাসায় পৌঁছে দেবেন না তারা। সংগ্রহ করতে হবে ক্রেতার কাছের বেঙ্গল মিটের শাখা থেকে। অংশীদার হয়ে কোরবানি দিলে মাংস আলাদা আলাদা প্যাকেজিং করে দেওয়া হলেও ভুঁড়ি সরবরাহ করা হয় না বলেও জানান তিনি।

আব্দুল আহাদ বলেন, আমাদের কোরবানি সেবার চাহিদা প্রতি বছর বাড়ছে এবং গত বছরের তুলনায় এ বছর সাড়া আরও বেশি।

মাংস নিয়ে কোনও অভিযোগ বা সমস্যা হলে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোরবানির ক্ষেত্রে কোনো রিফান্ড সুবিধা নেই। তবে গ্রাহক অভিযোগ করলে সেটি সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানো হয় এবং দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করা হয়।

তিনি আরও বলেন, গত ১২ বছর ধরে কোরবানি ক্যাম্পেইন পরিচালনা করছে বেঙ্গল মিট। এবং প্রতিবছর এর জনপ্রিয়তা ও গ্রাহকসংখ্যা বাড়ছে। তিনি জানান, পুরো কোরবানির প্রক্রিয়া ইসলামিক শরিয়াহ অনুযায়ী সম্পন্ন হয় এবং স্থানীয় জামাতের পাশাপাশি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে পশু কোরবানি করা হয়। এছাড়া পশু জবাইয়ের আগে ও পরে ভেটেরিনারি চিকিৎসকের মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয় এবং মাংসের গুণগত মান যাচাইয়ের পর গ্রাহকের কাছে সরবরাহ করা হয়।