প্রজন্মের পর প্রজন্ম আসে। তবু মায়ের অনুভূতি বদলায় না। মা যেন ভালোবাসার এক অনন্ত নদী। সন্তানের প্রতি মায়ের মমতা-ভালোবাসা চিরন্তন। আজ যে মেয়ে, একসময় সে নিজেই মা হয়। তার মেয়েও একসময় একই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়। অর্থাৎ নারীদের মৃত্যু হয়, কিন্তু মায়েদের মৃত্যু নেই।
মা দিবসের তাৎপর্য
এদিকে, আজ রোববার সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে ‘মা দিবস’। প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার এই বিশেষ দিন পৃথিবীর সব মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। মায়ের চিরন্তন রূপকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম কীভাবে ধারণ করে, সেই গল্পই উঠে এসেছে এক পরিবারের তিন প্রজন্মের মায়ের গল্পে।
গুলশান আনোয়ারা হকের গল্প
গুলশান আনোয়ারা হক ষাটের দশকে মা হয়েছিলেন। তখন কোল জুড়ে এসেছিল সন্তান রুমী নাসরিন শিবলী। কয়েক দশক পর সেই মেয়েটিই এখন মা হয়ে গেছেন। সেই মায়ের সন্তান নওশীন শিবলী কলিন্সও মা হয়েছেন। মা হয়ে ওঠার এই পরম্পরা কেমন, জানতে চাইলে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন আনোয়ারা হক। তিনি ৫৩ বছর ধরে ঢাকা লেডিস ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
ইত্তেফাককে তিনি বলেন, ‘আমার জন্ম ১৯৩৬ সালে সিলেটের হাওয়া পাড়া নামে বর্ধিষ্ণু গ্রামে। কিশোরী বয়সেই আমাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়েছে। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার সময় আমি ১৬ বছর বয়সে মা হয়েছি। তখন মা হওয়ার অনুভূতি কেমন ঠিক বুঝতে পারিনি। তবে ধীরে ধীরে ওদের লালনপালন করতে গিয়ে মাতৃত্বের অনুরণন টের পেয়েছি। সেই অনুভূতি ঠিক ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। আমার সন্তানদের পড়ালেখার পাশাপাশি নাচ, গান থেকে শুরু করে সবই শিখিয়েছি। মনের মতো করে মানুষ করেছি। অনুপ্রেরণা দিয়েছেন আমার স্বামী ভাষাসৈনিক আব্দুল হক।’
তিনি বলেন, ‘আমার প্রথম সন্তান দুরাফসান হক চৌধুরী ফ্যান্সী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও মাস্টার্স। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে ১৯৮৩ সালে যোগ দেয় এবং ঢাকা কোর্টে ম্যাজিস্ট্রেট ছিল। বাংলাদেশের প্রথম নারী উপজেলা নির্বাহী অফিসারও (ইউএনও) ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের উইলিয়ামস কলেজ থেকে ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক্সে মাস্টার্স করার পর দীর্ঘদিন ইউএনডিপিতে কর্মরত ছিল। আমার দ্বিতীয় সন্তান নাসরিন শিবলী ১৯৭৯ সাল থেকে আমেরিকা প্রবাসী। বোস্টনের স্টোনহিল কলেজ থেকে সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার থেকে এমএ পাশ করে সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে পরবর্তীকালে ব্রিজওয়াটার কলেজে শিক্ষকতা করেছে দীর্ঘদিন। বর্তমানে বোস্টনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে জড়িত। প্রায়শই বিষয়ভিত্তিক অনুষ্ঠানের আয়োজন ও পরিচালনা করে থাকে। সে একজন সংগীতশিল্পীও। তার স্বামী ড. আব্দুল্লাহ শিবলী একজন অর্থনীতিবিদ, লেখক ও গবেষক। আর ছেলে এহতেশামুল হক সানী মুম্বাইয়ের আই আই টি থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে কানাডার মন্ট্রিয়লে ইম্পেরিয়াল ট্যোবাকো কোম্পানিতে কর্মরত।’
মায়ের স্মৃতিচারণ
মায়ের স্মৃতিচারণ করে গুলশান আনোয়ারা হক বলেন, ‘আমার মা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মা। আমাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে রাখতেন। আমি তার চোখের মণি ছিলাম। যখন যা আব্দার করেছি, মা অপূর্ণ রাখেননি। আমাদের পরিবার ছিল বেশ সংস্কৃতিমনা এবং আমার মা সামিরা বেগম এবং বাবা মো. শফিউল্লাহ ছিলেন বেশ উদারপন্থি। সেই সময়ে আমাকে গানের স্কুলে ভর্তি করেছিলেন।’
নাসরিন শিবলীর অনুভূতি
আনোয়ারা হকের দ্বিতীয় মেয়ে নাসরিন শিবলী দূর প্রবাসে থাকলেও মায়ের সঙ্গে প্রতিদিন ফোনে কথা বলেন। মা গুলশান আনোয়ারা হক সম্পর্কে তার অনুভূতি কেমন ইত্তেফাকের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার মা আমার মহাবিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু। যদিও আমি তার থেকে ১২ হাজার মাইল দূরে থাকি, তবু তিনি আমার খুব কাছের। আমি প্রতিদিন তার সঙ্গে কথা বলি; তিনি আমার বন্ধু, দার্শনিক এবং পথপ্রদর্শক।’
নওশীন শিবলী কলিন্সের বক্তব্য
নাসরিন শিবলীর কন্যা নওশীন শিবলী কলিন্স একজন আইনজীবী। টাফ্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ল পাশ করে নিউ ইয়র্কের একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। বর্তমানে বোস্টনে কর্মরত আছেন। তিনি দুই কন্যার জননী। অর্থাৎ গুলশান আনোয়ারা হকের তৃতীয় প্রজন্ম। নিজের মেয়ে সম্পর্কে নাসরিন শিবলী বলেন, ‘আমার মেয়ে আমার কাছে এক স্বর্গীয় উপহার। সে নিজে এখন দুই কন্যার মা, কিন্তু আমার কাছে সে আজও আমার সেই ছোট্ট সোনামণি। আমি তাকে প্রতিদিন দেখি এবং একজন মা হিসেবে তাকে সমর্থন করার আপ্রাণ চেষ্টা করি। সে আমার অনুভূতির মর্যাদা দেয় এবং আমাকে সমানভাবে ভালোবাসে।’
নওশীন শিবলী কলিন্স তার মা নাসরিন শিবলী এবং নানী গুলশান আনোয়ারা হক সম্পর্কে অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমার বুবু আমার হৃদয়ের খুব কাছের। ব্যস্ততার কারণে যদিও আমি তাকে প্রতিদিন দেখি না কিংবা তার সঙ্গে কথা বলি না, তবু আমি তার খুব কাছাকাছি অনুভব করি। আর আমার মা-ই আমার আইডল। আমার অনুভবের উঠোন জুড়ে থাকে মা!’



