নাদিয়া হোসেন: খাবারে আনন্দ ও পেশায় বৈষম্যের গল্প
২০১৫ সালে 'দ্য গ্রেট ব্রিটিশ বেক অফ' রিয়েলিটি শো-এর ফাইনালে বিজয়ী হন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক নাদিয়া হোসেন। এই জয় তাঁকে শুধু একজন বেকার নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক আইকনে পরিণত করে। তবে তাঁর যাত্রাপথ মসৃণ ছিল না; পেশাগত বৈষম্য ও আত্মপরিচয়ের সংকটের মধ্য দিয়ে তাঁকে এগিয়ে যেতে হয়েছে।
খাবারে আনন্দের পুনরুদ্ধার
নাদিয়া হোসেনের নতুন বই 'নাদিয়াস কুইক কমর্ফোটস' বর্তমান খাদ্য প্রবণতার বিপরীতে দাঁড়িয়েছে। আজকাল ওজন কমানোর জন্য আমিষকেন্দ্রিক ডায়েট, ইনজেকশন ও চিনি-বিরোধী ধারা জনপ্রিয় হলেও, এই বইয়ে সোনালি সিরাপ দেওয়া ডাম্পলিংস, তেলে ডোবানো মচমচে ভাজা খাবার, চিজ বল ও ডিপ-ফ্রায়েড ক্যানেলোনির মতো রেসিপি রয়েছে। নাদিয়া বিশ্বাস করেন, খাবার কেবল স্বাস্থ্য বা সংখ্যার হিসাব নয়, বরং আনন্দ, স্বাদ ও আরামের বিষয়।
তিনি বলেন, 'আমি যদি শুধু ডিপ ফ্রাই নিয়েই একটা পুরো বই লিখতে পারতাম, নিশ্চয়ই লিখতাম!' তাঁর মতে, ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ; তাই বইয়ে মজাদার ভাজা খাবারের পাশাপাশি হালকা উদ্ভিদভিত্তিক ডাল ও নুডলসও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। নাদিয়ার সন্তানরা এই সব রেসিপি অসম্ভব পছন্দ করে, যা তাঁর পরিবারের প্রতি ভালোবাসার প্রতিফলন।
পেশাগত সংগ্রাম ও বৈষম্য
টিভি ও প্রকাশনা ইন্ডাস্ট্রিতে নাদিয়া হোসেনকে প্রায়শই একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলা হয়েছে, যেখানে তিনি নিজের মতো করে প্রকাশ করতে পারেননি। একজন মুসলিম নারী হিসেবে তিনি যথেষ্ট সমর্থন পাননি এবং নিজের পূর্ণ সম্ভাবনা দেখানোর সুযোগ সীমিত ছিল। ২০২৫ সালে প্রকাশিত তাঁর বই 'রুজা: আ জার্নি থ্রু ইসলামিক কুজিন ইন্সপায়ার্ড বাই রামাদান অ্যান্ড ঈদ' এর পর তিনি লক্ষ করেন, কাজ ও ব্র্যান্ড সহযোগিতা কমে গেছে।
ইনস্টাগ্রামে একটি ভিডিও পোস্ট করে নাদিয়া জানান, বিবিসি তাঁর নতুন কুকিং শো বানানোর পরিকল্পনা করছে না। তিনি গ্যাসলাইটিং ও বৈষম্যের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন, যেখানে তাঁকে প্রায়শই 'অকৃতজ্ঞ' বা 'ঝামেলাপূর্ণ' বলা হয়েছে। নাদিয়া বলেন, একই কাজ করলেও তিনি শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় কম পারিশ্রমিক পেয়েছেন, এবং গায়ের রং নিয়েও তাঁকে নেতিবাচক মন্তব্যের সম্মুখীন হতে হয়েছে।
জীবনযাত্রা ও পরিবর্তন
নাদিয়া হোসেন পরিবারের প্রথম নারী হিসেবে ডিগ্রি অর্জন করেন এবং 'বেক অফ' শো-এ অংশ নেওয়ার পর তাঁর জীবন বদলে যায়। তিনি প্রকাশ্যে বর্ণবাদ, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ও শৈশবে যৌন নির্যাতনের মতো কঠিন অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেছেন। নাদিয়া মনে করেন, সমাজে নীরবতা লজ্জা ও পারিবারিক সম্মানের কারণে তৈরি হয়, এবং তিনি এই বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলে পরিবর্তন আনতে চান।
বর্তমানে ৪১ বছর বয়সী নাদিয়ার সন্তানরা বড় হয়ে উঠছে, এবং তিনি তাদের সামনে সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার উদাহরণ তৈরি করতে চান। ভবিষ্যতে তিনি আরও টিভি শো করতে চান, যেখানে খাবারই মূল কেন্দ্রে থাকবে, এবং শিশুদের জন্য বই লিখতে চান। নাদিয়া বলেন, 'আমি এমন একটা জায়গা তৈরি করতে চাই, যেখানে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করব। থাকব নিজের শর্তে, নিজের মতো করে।'
নাদিয়া হোসেনের গল্প শুধু একজন শেফের সাফল্যের নয়, বরং বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই ও আত্মপরিচয় রক্ষার এক অনুপ্রেরণাদায়ক কাহিনী।



