মন খারাপে ভুল ট্রেনে চেপে নওয়াপাড়া স্টেশনে অপূর্বের একাকী যাত্রার গল্প
২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। অসুস্থ শরীর নিয়ে জ্বর, সর্দি আর মাথাব্যথা সহ্য করে অপূর্ব এবারের যাত্রা শুরু করলেন। সাধারণত তিনি বাসে যাতায়াত করেন, কিন্তু মন খারাপের কারণে মোংলা থেকে খুলনা যাওয়ার জন্য ট্রেন বেছে নিলেন। এই যাত্রায় তার সঙ্গী ছিল শুধুই একাকীত্ব। বাসা থেকে বেলা ১১টা ৩০ মিনিটে বের হয়ে বাসে করে মোংলা রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছালেন। সেখানে অনেক যাত্রীকে ট্রেনের অপেক্ষায় বসে থাকতে দেখলেন। কেউ কথা বলছেন, কেউ প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষা করছেন, আর অপূর্ব বসে রয়েছেন মন খারাপ নিয়ে, ভাবছেন এই যাত্রাটা কেমন হবে।
ভাবনার মাঝেই দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটে ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল। অপূর্বসহ সব যাত্রী টিকিট নিয়ে ট্রেনে উঠে বসলেন। বেলা একটায় ট্রেন স্টেশন ছাড়ল। পাঁচ দিন ধরে প্রচণ্ড মন খারাপ নিয়ে তিনি খুলনার দিকে যাত্রা করছিলেন। ট্রেনের জানালার পাশে বসে তিনি কবিতার বীজ বুনছিলেন আর গভীর চিন্তায় মগ্ন ছিলেন। হঠাৎ তার ফোনে কল এল প্রেমিকা ইরার কাছ থেকে। ইরা একজন বুদ্ধিমতী কিন্তু রাগী মেয়ে, যার সঙ্গে অপূর্বের জীবন জড়িয়ে আছে ভালোবাসা আর ঝগড়ায়।
ঝগড়ার মাঝে ভুল স্টেশনে নামার মুহূর্ত
ফোনে কথা বলার সময়ই পাঁচ দিনের ঝগড়ার সমাধান খুঁজছিলেন তারা দুজন। অপূর্ব ইরাকে বুঝিয়ে চলছিলেন, আর ইরা চেষ্টা করছিলেন মিটমাট করতে। কিন্তু দুজনই হেরে যেতে চাইছিলেন না, কারণ সবাই যেন ফাস্ট হওয়ার ব্রেন নিয়েই জন্মেছে। কথা বলতে বলতে ট্রেন একের পর এক স্টেশন পার করছিল। অপূর্ব এতটাই মগ্ন ছিলেন যে, তিনি তার গন্তব্য খুলনা ছাড়িয়ে যশোরের নওয়াপাড়া স্টেশনে চলে এলেন। তখনই হঠাৎ তার মনে পড়ল, তিনি তো খুলনায় নামবেন! কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।
নওয়াপাড়া স্টেশনে নেমে পড়ার পর তার মন ভরে গেল নাটকীয়তায়। রোমান্টিক গল্পের মতো অনুভূতি জাগল, কিন্তু সঙ্গে ছিল একাকীত্বের যন্ত্রণা। কেউ পাশে নেই, শুধুই আপন মনে বকবক করতে করতে তিনি স্টেশনের ফুটওভার ব্রিজে বসে পড়লেন। ইরা তখনও ফোনে তার সঙ্গে কথা বলছিলেন। অপূর্ব তাকে বললেন, "দেখছো ইরা, আমার ভাবনার সঙ্গে বাস্তবতার কতটা মিল। আমি যেমনটা তোমার সঙ্গে অনেক আগেই এই গল্প করেছি, ঠিক তেমনি আজকে আমার সঙ্গে সেটাই ঘটে গেল।"
সম্পর্কে ফাটল ও একাকী প্রত্যাবর্তন
অপূর্ব ইরাকে বোঝাতে চেষ্টা করলেন যে, তিনি ভুল ট্রেনে উঠে ভুল স্টেশনে নেমেছেন। কিন্তু ইরা তা বুঝলেন না, বরং মনে করলেন তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে দূরে সরে যাচ্ছেন। ইরা বললেন, "তুমি আমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে চলে গেছো। ভালো হয়েছে। ওখান থেকে বাস ধরে চলে আসো খুলনায়।" কিন্তু অপূর্ব জেদ ধরে বললেন, তিনি ট্রেনের অপেক্ষায় থেকে ফিরে যাবেন।
ইরা তার জেদ দেখে রাগ করে বললেন, "তুমি এত জেদি কেন। বললাম না, চলে আসো।" কথা বলার মাঝেই স্টেশনের মাইকে ঘোষণা করা হলো, আধা ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনটি খুলনার উদ্দেশে নওয়াপাড়া স্টেশনে আসবে। অপূর্ব দীর্ঘশ্বাস নিলেন, কারণ তিনি যে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন, তা পেয়ে গেছেন। তিনি টিকিট কেটে অপেক্ষা করতে লাগলেন।
কিন্তু ইরা তখন বললেন, "তুমি আমাকে ভুল ট্রেন উঠে পড়া ভুল জায়গায় নেমে পড়ার সঙ্গে মেলালে। আর কথা নেই। আমাদের আর কথা হবে না।" এই বলে কল কেটে দিলেন। অপূর্ব একাকী মনে ট্রেন আসার অপেক্ষায় বসে রইলেন। ট্রেন এল, তিনি টিকিট কেটে আবারও যাত্রা শুরু করলেন খুলনার দিকে। এভাবেই শেষ হলো তার সারা দিনের যাত্রার গল্প, যা লেখক মৃত্যুঞ্জয় রায় অপূর্বের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হিসেবে নাগরিক সংবাদে বর্ণনা করেছেন।
