কিশোরী কুসুমের প্রেমের চিঠি ও বেলি ফুলের মালার রহস্য উদঘাটন
একটি সন্ধ্যায়, হ্যারিকেন জ্বালিয়ে মাদুরে গোল হয়ে বসে তিন ভাইবোন পড়াশোনায় ব্যস্ত ছিল। আমি, কুসুম, সবার বড়, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি। ইংরেজি বই খুলতেই ভাঁজ করা একটি কাগজ পড়ল, সঙ্গে একটি লাল গোলাপ। খুলে পড়তে গিয়ে দেখি, সেটি একটি প্রেম নিবেদনের চিঠি। নামহীন লেখক ইনিয়ে-বিনিয়ে লিখেছে, ‘কুসুম, তুমি খুব সুন্দরী, তোমাকে আমার ভালো লাগে, তোমায় ভালোবাসি।’
চট করে আশপাশটা দেখে নিলাম, কেউ আবার দেখে ফেলল কি না। আমাদের পরিবেশ খুব রক্ষণশীল, প্রেমের বিষয়ে বড্ড কড়াকড়ি। মাথায় আর পড়াশোনা ঢুকছে না, শুধু ভাবছি কে লিখতে পারে এই চিঠি? কিশোরী বেলায় বড্ড দস্যি টাইপ ছিলাম, গাছে উঠে ফল পেড়ে খেতাম, বান্ধবীদেরও দিতাম। নাচ-গান, কবিতা আবৃত্তি সবকিছুতেই ছিল সাবলীল অংশগ্রহণ, এমনকি ছেলেদের সঙ্গে খেলাধুলাও করতাম।
সন্দেহের তালিকা ও বন্ধুর সাহায্য
একপাড়ায় একসঙ্গে যাদের সঙ্গে বড় হয়েছি, ভাবছি তাদের কেউ কি এই চিঠি লিখেছে? ইদানীং খেয়াল করছি, ফিরু নামের লম্বা ফরসা, কোঁকড়ানো চুলের ছেলেটি কেমন যেন অন্য রকম করে তাকিয়ে থাকে! আবার সেদিন আলমগীর তো বলেই ফেলল, ‘কুসুম, তুই কিন্তু দিনে দিনে অসাধারণ সুন্দরী হয়ে উঠছিস।’ সে কথা শুনে আমাদের মেয়েদের লিডার বেদানা আচ্ছামতো ধমক দিয়ে সাবধান করেছে।
বেদানা আমাদের থেকে একটু বড়, বিপদ-আপদ সে-ই সামলায়। তার কাছেই ছুটে গেলাম। চিঠিটা পড়ে ওর মুখটা খুব গম্ভীর হয়ে গেল। আমাকে অভয় দিয়ে বলল, ‘চিঠির কথা কাউরে বলিস না। নিশ্চিন্ত থাক, কাল বিকেলেই লেখককে খুঁজে বের করব।’ রাতে কিছুতেই আর ঘুম এল না, পরদিন ভয় আর শঙ্কা নিয়ে স্কুলে যাচ্ছি, রাস্তায় যে পরিচিত ছেলেকেই দেখছি, তাকেই মনে হচ্ছে চিঠির লেখক!
হাতের লেখা মেলানোর কৌশল
প্রতীক্ষিত বিকেলে সব ছেলেমেয়ে মাঠে এল। বেদানার হাতে একটা খাতা ও কলম। সে বলল, ‘আজ আমরা একটা নতুন খেলা খেলব।’ সবাইকে একটি কবিতার দুই লাইন লিখতে বলল, একই কবিতা যারা লিখবে, তারা আউট হয়ে যাবে। প্রথমে ছেলেরা লিখবে, লেখা শেষ হলে বেদানা বলল, ‘আজকের মতো খেলা শেষ, মেয়েরা আগামীকাল খেলবে।’ বুঝতে পারছি, ছেলেদের হাতের লেখার নমুনা সংগ্রহ করাই ছিল এই খেলার মূল উদ্দেশ্য, পরে চিঠির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। কিন্তু ছেলেদের কারও হাতের লেখার সঙ্গেই চিঠির লেখা মিলল না!
বেলি ফুলের মালার নতুন সূত্র
পাড়ায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে, আমি নাচে অংশ নিচ্ছি। মেকআপম্যান সব নৃত্যশিল্পীকে সাজিয়ে দিচ্ছেন, নাচের মেয়েদের চুল চূড়াখোঁপা করে কাগজের সাদা ফুলের মালা পরিয়ে দিলেন। শুধু আমাকে একটি স্পেশাল বেলি ফুলের মালা দিলেন, সেটা নিয়ে অন্য মেয়েরা খুব মন খারাপ করল, কথাও শুনিয়ে দিল। আমার মনে একটা সন্দেহ দানা বেঁধে উঠল, মেকআপম্যানকে একা পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আঙ্কেল, বেলি ফুলের মালা কে দিয়েছে?’ তিনি জানেন না, একটা খামে বেলি ফুলের মালা ভরা ছিল, আর তাতে লেখা ছিল, ‘এই মালাটা কুসুমের খোঁপায় পরানোর জন্য।’
রহস্যের সমাধান ও প্রেমের শুরু
একদিন এক প্রতিবেশীর বাসায় আমাকে দিয়ে তরকারি পাঠিয়েছেন দাদিমা। সেই বাসার মেয়ে আবার আমার ফুফুর বান্ধবী, ছেলেটি ছোট চাচার বন্ধু, নিত্য বাসায় আসা-যাওয়া। হঠাৎ খেয়াল করলাম, ছেলেটি বেলি ফুলের মালা গাঁথছে, পাশে বেশ কয়েকটি লাল গোলাপ। আমি গিয়ে বললাম, ‘বাহ, আপনি তো সুন্দর মালা গাঁথেন।’ ছেলেটি চোখ তুলে তাকাচ্ছে না। ‘শুনুন, বেলি ফুলের মালার মধ্যে একটা লাল গোলাপ দিন, আরও সুন্দর লাগবে!’ যথারীতি সন্ধ্যায় নৃত্য অনুষ্ঠানে বেলি ফুলের মালার মধ্যে একটা লাল গোলাপ! এভাবেই প্রেমের সেই শুরু হলো, রহস্য উদঘাটিত হয়ে গেল।
