মাগুরার ঐতিহাসিক ভাতভিটা ঢিবির সংস্কার ও সংরক্ষণ কাজ শুরু
ভাতভিটা ঢিবির সংস্কার কাজ শুরু, প্রাচীন ইতিহাস উন্মোচন

মাগুরার ভাতভিটা ঢিবিতে সংস্কার ও সংরক্ষণ কাজ শুরু

মাগুরা সদর উপজেলার টিলা গ্রামে অবস্থিত ঐতিহাসিক প্রত্নস্থল ভাতভিটা ঢিবি সংস্কার ও সংরক্ষণের কাজ শুরু হয়েছে। স্থানীয় জনশ্রুতি ও লোককথার আড়ালে প্রায় দুই হাজার বছরের পুরোনো ইতিহাস লুকিয়ে থাকা এই স্থাপনা উন্মোচন ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।

প্রাচীন ইতিহাসের নিদর্শন

প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, মাগুরার ভাতভিটা ঢিবি উত্তরবঙ্গের মহাস্থানগড় কিংবা নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বর প্রত্নস্থলের সমসাময়িক। এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আদি ঐতিহাসিক যুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।

স্থানীয়ভাবে ভাতভিটা নিয়ে একটি লোককথা প্রচলিত রয়েছে। জনশ্রুতি অনুযায়ী, অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী এক দরবেশ রাতে এখানে এসে মসজিদ নির্মাণ শুরু করেছিলেন, কিন্তু ভোর হয়ে যাওয়ায় কাজ অসমাপ্ত রেখে চলে যান। পরে এলাকাবাসী সেখানে অসমাপ্ত স্থাপনা, রান্না করা ভাত ও ভাতের ফ্যান দেখতে পায়। সেই থেকেই জায়গাটির নাম হয় ভাতভিটা এবং পাশের জলাবদ্ধ স্থানের নাম হয় ফ্যানঘালী

প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের ফল

প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। ২০০২-০৩ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খননে এখানে সমতল ভূমি থেকে প্রায় আট ফুট উঁচু একটি স্থাপত্যিক কাঠামোর ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়। খননের সময় নর্দান ব্ল্যাক পলিশড ওয়্যার, রুলেটেড ওয়্যার ও ব্ল্যাক অ্যান্ড রেড ওয়্যারসহ বিভিন্ন প্রত্নবস্তু উদ্ধার হয়। গবেষকদের ধারণা, এই স্থাপনা খ্রিষ্টীয় প্রথম বা দ্বিতীয় শতাব্দীর।

খুলনা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাবেক সহকারী পরিচালক গোলাম ফেরদৌস বলেন, ভাতভিটা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন প্রত্নস্থল। এখানে পাওয়া নর্দান ব্ল্যাক পলিশড ওয়্যার প্রাচীন নগরসভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। মহাস্থানগড়ের বাইরে বাংলাদেশে প্রথম এ ধরনের মৃৎপাত্র ভাতভিটাতেই পাওয়া গেছে।

স্থাপত্যিক কাঠামো ও সংরক্ষণ পরিকল্পনা

২০০৩ সালের খননে পাওয়া স্থাপত্যিক কাঠামোটিতে একটি অলিন্দ বা বারান্দাসহ চারটি কক্ষের ধ্বংসাবশেষ শনাক্ত করা হয়। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এটি হয়তো পথচারী বা ধর্মীয় অনুসারীদের থাকার জন্য সরাইখানা বা ক্যারাভানস ছিল। আবার কেউ কেউ মনে করেন, চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং বর্ণিত সমতট অঞ্চলের ৪০টি বৌদ্ধ সংঘারামের কোনো একটি হতে পারে এটি। তবে এটি মুসলিম আগমনের পূর্ববর্তী সময়ের স্থাপনা বলে ধারণা করা হয়।

খনন শেষে ২০০৩ সালে প্রত্নস্থলটি মাটি দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছিল। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পুনরায় স্থাপনাটি উন্মোচন করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাসখানেক আগে এখানে সংস্কার ও সংরক্ষণের কাজ শুরু হয়েছে। প্রথমে মাটি সরিয়ে স্থাপত্যিক কাঠামো বের করা হবে, পরে মূল বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে সংরক্ষণ করা হবে।

বর্তমান কাজের অগ্রগতি

গতকাল সোমবার সরেজমিন দেখা যায়, ভাতভিটা ঢিবিতে শ্রমিকেরা সংস্কারকাজ করছেন। খুলনা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী জাকারিয়া বলেন, স্থাপনাটির আদি বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে সংরক্ষণ করা হবে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংস্কার ও সংরক্ষণের জন্য ১৬ লাখ ২০ হাজার টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। খুলনার মেসার্স অনিক এন্টারপ্রাইজ ১২০ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করবে।

খুলনা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক (রুটিন দায়িত্ব) মহিদুল ইসলাম বলেন, ভাতভিটা প্রত্নস্থলটি দেশের ইতিহাস গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি উল্লেখযোগ্য প্রত্নতাত্ত্বিক ও পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। তবে আশপাশের জমি ব্যক্তিমালিকানাধীন হওয়ায় খননকাজে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।