লিফটে ১৩ তলার বোতাম নেই কেন? কুসংস্কার নাকি বাস্তবতার খেলা?
লিফটে ১৩ তলার বোতাম নেই কেন? রহস্যের উন্মোচন

লিফটে ১৩ তলার বোতাম নেই কেন? কুসংস্কার নাকি বাস্তবতার খেলা?

আপনি কি কখনও লক্ষ্য করেছেন, বহুতল ভবনের লিফটে ১২ তলার পর সরাসরি ১৪ তলার বোতাম জ্বলজ্বল করে? মাঝখানের ১৩ সংখ্যাটি যেন গায়েব হয়ে গেছে! এটি কি কোনো গোপন কুঠুরি, নাকি ধনকুবেরদের দখলকৃত এলাকা? আসলে, এর পেছনে লুকিয়ে আছে মানুষের আদিম ভয়, আধুনিক ব্যবসার কৌশল এবং কিছুটা রিয়েল এস্টেট আইনের কারসাজি। স্থপতিরা বলেন, দালান নির্মাণের সময় মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝা অত্যন্ত জরুরি, কারণ ভবন কেবল ইট-পাথরের নয়, এটি মানুষের আবেগ ও বিশ্বাসের সঙ্গেও জড়িত।

ভয়ের নাম ট্রিসকাইডেকাফোবিয়া

অনেক মানুষ ১৩ সংখ্যাটিকে যমের মতো ভয় পায়, যা ট্রিসকাইডেকাফোবিয়া নামে পরিচিত। এই ভয় এতটাই প্রবল যে মানুষ হোটেলে ১৩ নম্বর রুম এড়িয়ে চলে, লটারিতে ১৩ নম্বর টিকিট কেনে না এবং দাওয়াতে ১৩ জন অতিথি হলে তা অশুভ বলে মনে করে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে স্কাইস্ক্র্যাপার তৈরির সময়, দালানের মালিকরা বুঝতে পেরেছিলেন যে কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভাড়াটিয়ারা ১৩ তলায় থাকতে বা কাজ করতে অনিচ্ছুক হতে পারেন। তাই, ঝুঁকি এড়াতে তারা লিফটের বোতাম থেকে ১৩ সংখ্যাটি সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ওটিস এলিভেটর কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, আজও বিশ্বের বেশিরভাগ দালানের লিফটে ১৩শ তলার বোতাম অনুপস্থিত থাকে।

ইতিহাসে এই লুকোচুরির সূত্রপাত

গুজব আছে যে শিকাগোতে তৈরি প্রথম স্কাইস্ক্র্যাপার থেকেই এই প্রথা শুরু হয়, যদিও এর শক্ত প্রমাণ নেই। নিউইয়র্কের এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের মতো পুরোনো ভবনগুলিতে ১৩ তলা বিদ্যমান, যা প্রমাণ করে যে প্রাথমিকভাবে স্থপতিরা এতটা সচেতন ছিলেন না। তবে ১৯৩০-এর দশকে মানুষের মধ্যে কুসংস্কার বৃদ্ধি পাওয়ায়, নকশা থেকে ১৩ সংখ্যাটি বাদ দেওয়া সাধারণ রীতি হয়ে ওঠে। তবে সব ক্ষেত্রেই যে কুসংস্কার দায়ী তা নয়; অনেক বহুতল ভবনে ১০-১২ তলা পরপর মেকানিক্যাল ফ্লোর থাকে, যেখানে এসি বা পানির পাম্পের মতো বড় মেশিন স্থাপন করা হয়, এবং ১৩শ তলাটি কখনও কখনও সেই উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়।

১৩ সংখ্যাটির প্রতি এই ভয়ের উৎস

এই ভয়ের শিকড় প্রাচীন ইতিহাস ও পুরাণে নিহিত। লাস্ট সাপারে যিশুর শেষ ভোজে ১৩তম অতিথি ছিলেন জুডাস, যিনি বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন, যা থেকে ১৩ সংখ্যাটি অশুভ হিসেবে চিহ্নিত হয়। নর্স মিথলজিতেও, ১২ দেবতার ভোজে ১৩তম অতিথি লোকির উপস্থিতি দেবরাজ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিল। সংখ্যাতত্ত্বেও ১২ একটি নিখুঁত সংখ্যা হিসেবে বিবেচিত হয়, যেমন ১২ মাসে বছর, ১২ রাশি, এবং ১৩ এসে সেই সামঞ্জস্য নষ্ট করে। এই বিশ্বাস সংস্কৃতিতে এতটাই গভীরভাবে প্রোথিত যে হোটেল, এয়ারলাইনস এবং অফিস ভবনগুলোয় ১৩ এড়িয়ে চলা একটি সাধারণ অনুশীলন।

আধুনিক যুগে এই প্রথার অবস্থান

বর্তমান সময়েও, স্মার্ট লিফট ও বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও, ডেভেলপাররা ১৩ সংখ্যাটি এড়িয়ে চলতে পছন্দ করেন, বিশেষ করে লাস ভেগাসের মতো স্থানে যেখানে ভাগ্যে বিশ্বাসী মানুষের সংখ্যা বেশি। তবে, বাংলাদেশে এই কুসংস্কার এখনও ততটা শক্তিশালী নয় বলে মনে করা হয়। স্থপতি গ্লেন নোয়াকের মতে, ১৩ তলা আসলে বিদ্যমান, কিন্তু লেবেল পরিবর্তন করে মানুষের মানসিক শান্তি দেওয়া হয়। এটি অনেকটা শিশুকে ওষুধ খাওয়ানোর জন্য জুসের ছলনার মতো, যেখানে যুক্তির চেয়ে বিশ্বাস ও স্বস্তি প্রধান ভূমিকা পালন করে।

সুতরাং, ভবিষ্যতে লিফটে উঠে ১৪ তলায় নামলে মনে রাখবেন, আপনি আসলে সেই রহস্যময় ১৩ তলাতেই দাঁড়িয়ে আছেন! এই লুকোচুরি কেবল একটি মার্কেটিং কৌশল নয়, বরং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক চাহিদা পূরণের একটি সুচিন্তিত পদক্ষেপ।