কেক ভাগাভাগির জটিল গণিত: ন্যায্য বণ্টনের সহজ ও জাদুকরী সমাধান
কেক ভাগাভাগির জটিল গণিত: ন্যায্য বণ্টনের সমাধান

কেক ভাগাভাগির জটিলতা: গণিতের মজাদার সমাধান

দুই বন্ধু যখন একটি কেক ভাগাভাগি করে খেতে চায়, তখন সমস্যা দেখা দেয় বড় ও ছোট ভাগ নিয়ে। কিন্তু এর সমাধান অত্যন্ত সহজ: একজন কেক কাটবে, অন্যজন বেছে নেবে। এই পদ্ধতি যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। তবে ভাগিদারের সংখ্যা বাড়লে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। মানুষ যত বাড়ে, কেক ভাগের অঙ্ক তত বেশি প্যাঁচালো হতে থাকে। কিন্তু হতাশ হওয়ার কিছু নেই, কারণ এই কঠিন সমস্যার সমাধানের জন্য রয়েছে জাদুকরী উপায়।

মুভিং নাইফ: জাদুর ছুরির কাহিনী

আমাদের হাতে আছে একটি বিশেষ ছুরি, যার নাম মুভিং নাইফ। এটি শুধু কেক কাটে না, ভাগাভাগির সব ঝামেলাও মুহূর্তে মিটিয়ে দেয়। একটি গল্প দিয়ে বিষয়টি বোঝা যাক। ট্রেনের রেস্তোরাঁ কামরায় দুজন লোক খেতে বসেছে। একজন হৃষ্টপুষ্ট, অন্যজন ছোটখাটো। দুজনেই ওয়েটারকে মাছ অর্ডার দিল। খাবার এলে দেখা গেল, প্লেটে দুটো মাছ আছে—একটা বড়, অন্যটা ছোট। বড়সড় লোকটা আগে সুযোগ পেয়ে বড় মাছটা নিজের প্লেটে তুলে নিল। ছোটখাটো লোকটা এতে চটে গিয়ে বললেন, ‘এটা খুব অভদ্রতা হলো!’ বড় লোকটা বিরক্ত হয়ে জবাব দিল, ‘কেন? আপনাকে যদি আগে বেছে নিতে বলা হতো, আপনি কী করতেন?’ ছোট লোকটা ভাবনা দিয়ে বলল, ‘আমি ভদ্রতা বজায় রেখে ছোট মাছটাই নিতাম।’ বড় লোকটা হেসে উত্তর দিল, ‘তাহলে সমস্যা কী? আপনি তো সেটাই পেলেন!’ এই পুরোনো কৌতুক একটি গভীর সত্য প্রকাশ করে: পরিস্থিতি ভেদে প্রত্যেকের কাছে জিনিসের মূল্য ভিন্ন হয়, এবং কিছু মানুষকে খুশি করা সত্যিই কঠিন কাজ।

গণিতবিদদের লড়াই: ন্যায্য ভাগের সন্ধানে

গত ৫০ বছর ধরে গণিতবিদেরা ন্যায্য ভাগ নিয়ে নিরলস গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের উদাহরণের প্রধান বস্তু হলো কেক। জ্যাক রবার্টসন এবং উইলিয়াম ওয়েব কেক কাটিং অ্যালগরিদম: বি ফেয়ার ইফ ইউ ক্যান নামে একটি চমৎকার বইও লিখেছেন। প্রশ্ন হলো, সবাইকে খুশি রেখে একটি কেক কীভাবে ভাগ করা যায়? দুজনের মধ্যে ভাগ করা সবচেয়ে সহজ, যেখানে ন্যায্যতা মানে প্রত্যেকে মনে করে সে অন্তত অর্ধেকের বেশি বা সমান পেয়েছে। মজার বিষয় হলো, যদি দুজনের পছন্দ আলাদা হয়, যেমন একজন কেকের চেরি পছন্দ করে এবং অন্যজন ক্রিম, তবে ভাগ করা আরও সহজ হয়ে যায়। সমস্যা বাঁধে যখন দুজনেই একই জিনিস চায়।

প্রাচীন সমাধান থেকে আধুনিক পদ্ধতি

এই সমস্যার সমাধান মানুষ ২,৮০০ বছর আগেই বের করেছে: ‘একজন কাটবে, অন্যজন বেছে নেবে’। যদি কাটা ব্যক্তি চালাকি করে এক টুকরো ছোট ও এক টুকরো বড় করে, তবে বেছে নেওয়া ব্যক্তি বড়টাই নেবে, ফলে কাটা ব্যক্তি ঠকবে। তাই সে নিজের স্বার্থেই কেকটি সমানভাবে কাটবে। কিন্তু তিন জনের জন্য পরিস্থিতি জটিল হয়। ধরুন, সোহানা, সোনিয়া ও তানিয়া প্রত্যেকে কেকের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ পেতে চায়। একটি ভুল পদ্ধতি হলো: সোহানা কেকটি দুই ভাগ করে, সোনিয়া বাকি অংশ ভাগ করে, এবং তানিয়া প্রথমে পছন্দ করে। কিন্তু এতে সোহানা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যদি তার কাটা অংশ ছোট হয়। তাই এই পদ্ধতি ন্যায্য নয়।

ছাঁটাই পদ্ধতি ও মুভিং নাইফের যাদু

১৯৪৪ সালে হুগো স্টেইনহাউস পোল্যান্ডের একটি ক্যাফেতে বসে ছাঁটাই পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। এতে প্রথমে একজন কেক থেকে একটি টুকরো কাটে যা তার মতে এক-তৃতীয়াংশের সমান। অন্যরা চাইলে এটি নিতে পারে, না চাইলে বাদ দিতে পারে। যদি কেউ নেয়, তবে বাকি অংশ আগের পদ্ধতিতে ভাগ করা হয়। লজিক হলো, অসন্তুষ্ট ব্যক্তি আসলে আগের ধাপে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ১৯৬১ সালে লিওনার্ড ডুবিনস এবং এডউইন স্প্যানিয়ার মুভিং নাইফ পদ্ধতি প্রস্তাব করেন। এতে একটি ছুরি কেকের একপাশ থেকে অন্যপাশে ধীরে ধীরে চলে, এবং যখন কারও মনে হয় টুকরোটি ন্যায্য হয়েছে, সে ‘থামো’ বলে। প্রথমে থামানো ব্যক্তি সেই টুকরো পায়, এবং বাকি অংশ একইভাবে ভাগ করা হয়। এই পদ্ধতিতে লোভ কমে, কারণ বেশি অপেক্ষা করলে অন্য কেউ আগে থামিয়ে দিতে পারে।

জটিলতা ও বাস্তব প্রয়োগ

মানুষের সংখ্যা বাড়লে কেক কাটার জটিলতা বৃদ্ধি পায়। n জন মানুষের জন্য (n-1) বার ছুরি চালানো হয়, যা সর্বনিম্ন সংখ্যা। তবে আরও জটিল পদ্ধতিতে কাটার সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়তে পারে। এই গণিত শুধু কেক খাওয়ার জন্য নয়; ইতিহাসে জার্মানি ভাগাভাগির সময় বার্লিনকে আলাদা করে বাকি দেশ ভাগ করা হয়েছিল, যা কেক কাটার অ্যালগরিদমের মতো। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সমস্যা বা জেরুজালেম ভাগাভাগিতেও এই ন্যায্য বণ্টন পদ্ধতি প্রয়োগ করা যেত, কিন্তু রাজনীতিতে মানুষের পছন্দ সময়ের সঙ্গে বদলে যায়, তাই এটি কঠিন। তবুও বন্ধুর জন্মদিনে বা নিজের উদযাপনে এই নিয়মে কেক কাটলে সবাই সমানভাগ পাবে এবং আপনার বুদ্ধির প্রশংসা করবে। সূত্র: ইয়ান স্টুয়ার্টের হাউ টু কাট আ কেক অবলম্বনে।