প্রকৃতির নির্দেশনায় বর্ষবিদায়: নিম্নবর্গের কৃত্য ও কর্পোরেট কর্তৃত্বের সংঘাত
প্রকৃতির নির্দেশনায় বর্ষবিদায়: কৃত্য ও কর্তৃত্বের সংঘাত

প্রকৃতির সুরে গড়ে ওঠা ঋতুভিত্তিক কৃত্য ও আয়োজন

আমাদের সমাজে প্রায় সবকিছুই জবরদস্তি ও কর্তৃত্বের মাধ্যমে চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা লক্ষণীয়। আমরা পাহাড়কে খণ্ডিত করে চিনামাটির বাসন বানাই কিংবা দামের অভাবে প্রবীণ বটগাছ কেটে ফেলি। ষাটের দশকের সবুজ বিপ্লবের নামে বিষনির্ভর কৃষিপদ্ধতি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে শস্য ফসলের বৈচিত্র্য হারিয়ে গেছে। দিনে দিনে ষড়ঋতুর পঞ্জিকা বিলুপ্ত হচ্ছে, অথচ আমাদের গ্রামীণ কৃত্য, পার্বণ, উৎসব ও যাপিতজীবন ঋতুচক্রের বোঝাপড়ার মধ্য দিয়েই বিকশিত হয়েছে।

বাঙালি অঞ্চলের নবান্ন ও অন্যান্য উৎসব

বাঙালি অঞ্চলে নবান্ন হেমন্তের উৎসব, যা জোর করে আউশ বা বোরো মৌসুমে আয়োজন করা যায় না। কার্তিক-অগ্রহায়ণে ধান কাটার পর নতুন ধান সামাজিকভাবে গ্রহণের কৃত্য হিসেবে নবান্ন গড়ে উঠেছে। এর সঙ্গে শালি বা শাইল ধানের যোগ রয়েছে। পৌষের কৃত্য পুষরা বা সাংরাইন, ভাদ্রে ভাদু, ফাল্গুনে ঘাটাবান্ধা বর্ত কিংবা বসন্ত নিবারণী শীতলা পরব পালিত হয়।

বৈশাখের আয়োজন নিয়ে আলাপে বহুজন কর্তৃত্ববাদী ইতিহাসকে টেনে আনেন, যা গ্রামীণ নিম্নবর্গের যাপিতজীবনের আখ্যানকে অস্পষ্ট করে দেয়। এই আখ্যান প্রকৃতি, প্রাণ ও কৃষি উৎপাদনব্যবস্থার ভেতর থেকে গড়ে উঠেছে। বর্ষবিদায়ের সন্ধিক্ষণের নিম্নবর্গীয় আয়োজনের ঐতিহাসিকতা চাপা পড়ে যায় অধিপতি বয়ানের নিচে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নিম্নবর্গের আয়োজনের বৈচিত্র্য ও গুরুত্ব

নিম্নবর্গের আয়োজন ও পরবের উপর জারি রাখা জুলুম, কর্তৃত্ব ও বর্ণবাদকে প্রশ্ন করা জরুরি। এসব আয়োজনের বিজ্ঞান ও সামাজিক জরুরত স্বীকৃতি না পেলে নতুন প্রজন্ম ভুল বার্তা নিয়ে বড় হয়। বহিরাগত চাপ বা কর্তৃত্ব কীভাবে বর্ষবিদায় ও বরণের আয়োজনকে বিপদাপন্ন করতে পারে, তা বোঝার জন্য একটি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি ও হাওরাঞ্চলের চইত পরবের উদাহরণ প্রাসঙ্গিক।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রতিটি ঋতুর মুকুলের ভাষা বোঝায় দায়। বাংলা মাসের শেষ দিন সংক্রান্তি নামে পালিত হয়, যা নিম্নবর্গের ঐতিহাসিকতায় গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতির নির্দেশনাকে মান্য করে মানুষের সমাজ নানা কৃত্য ও পরব রচনা করে। সাঁওতাল সমাজে ফাল্গুন মাসে বাহা পরব আয়োজিত হয়, যেখানে নতুন ফুলের ব্যবহারের অনুমতি নেওয়া হয়। রবিদাসদের হাজরা কৃত্যে বর্ষবিদায় পালিত হয়, যেখানে আম-ছাতুয়া খাওয়া হয়। চাকমাদের বিজু উৎসব ভাতজরা ফুল ছাড়া জমে না, আর সাংগ্রাইং উৎসবে নাগেশ্বর ফুল সংগ্রহ করা হয়।

বাঙালি সমাজে চৈত্রসংক্রান্তিতে তিতাশাক খাওয়া এবং নিম পাতা ও কাঁচা হরুদ গায়ে মাখার রীতি প্রচলিত। বৈশাখের প্রথম দিন মিষ্টি ও ভালো খাবার রান্না হয় এবং গ্রামীণ মেলার আয়োজন করা হয়। এখন প্রশ্ন হলো, তিতাশাক, ভাতজরা ফুল বা কাঁচা আম ছাড়া বর্ষবিদায় ও বরণের কৃত্য কোনো ঐতিহাসিক বার্তা দেয় কিনা। শ্রাবণ বা কার্তিক মাসে এসব আয়োজন এই ভূগোলে সম্ভব নয়, কারণ এখানে প্রকৃতির সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।

কর্পোরেট কর্তৃত্ব ও নিম্নবর্গের লড়াই

দেশজুড়ে নিম্নবর্গের ঋতুভিত্তিক কৃত্য-উৎসব বদলে যাচ্ছে এবং চুরমার হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে নয়াউদারবাদী বাহাদুরি, কর্পোরেট বাজার ও উন্নয়নের কর্তৃত্ব বিদ্যমান। প্রতিদিন কৃত্য-পার্বণ-উৎসবের সঙ্গে জড়িত প্রাণ, প্রকৃতি ও প্রতিবেশের ব্যঞ্জনা খুন হচ্ছে। বর্ষবিদায় ও বরণের আয়োজনে বদল ঘটলেও মানুষ নিয়ম ধরে রাখার জন্য লড়াই করছে, কারণ নিম্নবর্গের জীবনদর্শন প্রকৃতি ও সংস্কৃতির যৌথতাকে মান্য করে।

মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি ও হাওরের চইত পরব

হাওরাঞ্চলে চৈত্র সংক্রান্তির দিন ‘বেগুন পাতার বর্ত’ বা ‘চইত পরব’ আয়োজিত হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জনগণের সম্মতি ছাড়াই একটি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি করে, যা গ্রামীণ কৃত্য, পার্বণ ও কৃষির উপর নয়াউদারবাদী কর্তৃত্ব চাপিয়ে দিচ্ছে। এই চুক্তিতে ইউপিওভি কনভেনশন স্বাক্ষরের শর্ত রয়েছে, যা প্রাণবৈচিত্র্য ও কৃষকের অধিকারকে ঝুঁকিতে ফেলবে।

ইউপিওভি কনভেনশন অনুযায়ী উদ্ভিদ প্রজননবিদেরা নতুন জাতের উপর ২০-২৫ বছরের একচেটিয়া বাণিজ্যিক অধিকার পাবে, যার ফলে কৃষকরা স্থানীয় বীজ সংরক্ষণ ও বিনিময়ের অধিকার হারাবে। হাওরের চইত পরবে বেগুন পাতার বর্ত আয়োজিত হয়, এবং দেশি বেগুনের বৈচিত্র্য ইউপিওভি কনভেনশন বাস্তবায়িত হলে হুমকির মুখে পড়বে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিটিবেগুনের অনুমোদন দিয়েছে, যা মনস্যান্টো কোম্পানির পেটেন্টকৃত বিটি জিন ব্যবহার করে তৈরি।

বিটিবেগুন গবেষণা ও তার প্রভাব

বেগুনের ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকা মারার জন্য দেশি বেগুন জাতের ভেতর বিটি জিন ঢুকিয়ে বিটিবেগুন তৈরি করা হয়েছে। মার্কিন দাতাসংস্থা ইউএসএইডের সহায়তায় ২০০৫ সালে এই প্রকল্প চালু হয়। পরিবেশ মন্ত্রণালয় শর্তসহ বিটিবেগুনের ছাড়পত্র দিলেও জনগণের প্রশ্ন দাবিয়ে রাখা হয়েছে। চইত পরবে বেগুন পাতার বর্ত আয়োজনের মাধ্যমে হাওরাঞ্চল একটি বছরকে বিদায় জানায় এবং প্রকৃতির সংকেতগুলোকে আগলে নতুন বছরকে আহ্বান জানায়।

দেশি বেগুনের বৈচিত্র্য ও মুক্তির আহ্বান

বাংলাদেশ বেগুনের আদি জন্মভূমি, যেখানে শিংনাথ, খটখটিয়া, লম্বা, গোল, কালা, লতা, সাদা, লাল, ঝুমকি, ডিম, তিতা, বারোমাইস্যা, কামরাঙ্গা, তাল, টুপরি, কুলি, টোপা, আউশা, হিংলা, ঘিকাঞ্চন, আমঝুপি, কাঁটা সহ নানা নামের বেগুন রয়েছে। আদিবাসী অঞ্চলে বারেং মেকব্রেও, কামরাঙ্গা বারেং, খুমকা, বারেং দচি, বারেং মিগন এরকম জুমবেগুন পাওয়া যায়। নানা জাতের বেগুন মানে নানা সমাজ, আচার ও কৃত্য।

প্রাণপ্রকৃতি ও মানুষের জীবনসংস্কৃতির বৈচিত্র্যের কারণে বর্ষবিদায় ও বরণের আয়োজন দেশব্যাপি বৈচিত্র্যময়। কিন্তু এই বৈচিত্র্যের আহাজারি, ক্ষত ও লড়াইয়ের গল্প উপেক্ষিত। রাষ্ট্রের উচিত নিম্নবর্গের ঋতুভিত্তিক আয়োজনগুলোকে সুরক্ষিত রাখা, অন্যায় বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করা এবং ইউপিওভির মতো কনভেনশন স্বাক্ষর থেকে বিরত থাকা। দেশি বেগুনের জাত ও এর সঙ্গে গড়ে ওঠা সামাজিক কৃত্যগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রকৃতি ও সংস্কৃতির যুগলসন্ধিতে মানুষই জীবন্ত রাখবে চইতপরব, বিজু, বিষু, সাংগ্রাই, বৈসুকের মতো জনআয়োজন।