মেহেরপুরে গ্রীষ্মের তপ্ত বাতাসে জনজীবনে এখন বিপর্যস্ত অবস্থা। এর মধ্যে খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে ঘন ঘন লোডশেডিং। দিনে রোদে কাজ করা দুষ্কর হয়ে পড়েছে, বিদ্যুতের অভাবে বাসিন্দাদের কাটছে ঘুমহীন রাত। সব মিলিয়ে সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়েছেন জেলার বাসিন্দারা।
তাপমাত্রা ও তাপপ্রবাহের অবস্থা
চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, আজ শনিবার মেহেরপুর ও এর পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর ওপর দিয়ে মাঝারি থেকে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। কয়েক দিন ধরে দিনের তাপমাত্রা ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে ওঠানামা করছে।
এ অবস্থায় জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন না। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন শ্রমজীবী মানুষ। রিকশাচালক, ভ্যানচালক ও দিনমজুরেরা তপ্ত রোদে বেশিক্ষণ কাজ করতে পারছেন না। এর প্রভাব পড়ছে তাঁদের দৈনন্দিন আয়ে।
লোডশেডিংয়ের তীব্রতা
এমন অবস্থার মধ্যে মেহেরপুরের শহর ও গ্রামাঞ্চলে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিংয়ের মাত্রা। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। বিশেষ করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন এলাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ।
গাংনী পৌর শহরের একাধিক বাসিন্দা প্রথম আলোকে বলেন, ভ্যাপসা গরমে দিন-রাত চলছে লোডশেডিং। বাড়িতে বয়স্ক স্বজন ও শিশুদের নিয়ে তাঁরা বিপাকে পড়েছেন।
ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগ
মেহেরপুর বড় বাজারের বস্ত্র ব্যবসায়ী আমান আগারওয়াল বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে দোকান একেবারে ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ গেলে যে জেনারেটর চালু করব, এরও উপায় নেই। ডিজেল নিতেও দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়।
কৃষকদের সমস্যা
আজ সকালে ইঞ্জিনচালিত পাম্প ব্যবহার করে ধানের জমিতে সেচ দিচ্ছিলেন সদর উপজেলার কুলবাড়িয়া এলাকার কৃষক সেলিম মিয়া। হঠাৎ পাম্পটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জমিসংলগ্ন পাকা সড়কে একটি শিমুলগাছের নিচে বসে ছিলেন। তিনি জানান, ডিজেল ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। এখন ডিজেল পাওয়া যাবে না। শহরের ফিলিং স্টেশনে ভোরে গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হবে।
একই স্থানে বসে ছিলেন সোবহান মিয়া। তিনি বিএডিসির সেচপাম্পমালিক। তিনি বলেন, সারা রাত ধরে জেগে থাকতে হচ্ছে। একবার বিদ্যুৎ গেলে চার–পাঁচ ঘণ্টায় আসে না। এলাকার কয়েক শ বিঘা জমির সেচ এই পাম্প থেকে চলে। রাতের বেলায় বিদ্যুৎ থাকলেও সেচ দেওয়া যায়। এভাবে কি আর চাষ করা যাবে?
শিক্ষার্থীদের ক্ষতি
অস্বাভাবিক লোডশেডিংয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে জানিয়ে গাংনী উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল হামিদ বলেন, এখন এসএসসি পরীক্ষা চলছে। পরীক্ষার্থীরা পড়াশোনা করবে কী করে? রাত-দিন বিদ্যুৎ যাওয়া–আসা করছে। এ সময়ে অন্তত বিদ্যুৎ থাকা দরকার।
স্বাস্থ্য পরিস্থিতি
অসহনীয় গরমে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালসহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ডায়রিয়া, জ্বর ও পানিশূন্যতায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। রোগীর স্বজনেরা জানান, ওয়ার্ডের ভেতরে গরমে টেকা দায় হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্যান বন্ধ থাকছে, ফলে অসুস্থ রোগীরা আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়ছেন। জ্বালানিসংকটের কারণে অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতালের নিজস্ব জেনারেটরও সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
জেনারেল হাসপাতালের বহির্বিভাগের দায়িত্বরত কর্মকর্তা ইয়াসিন আলী বলেন, প্রতিদিন বহির্বিভাগেই চিকিৎসা নিচ্ছেন ৭০০ রোগী, আর ভর্তি আছেন ৪৫০ জন রোগী। যাঁদের বেশির ভাগই আসছেন ডায়রিয়া, সর্দি–কাশি, অ্যাজমাসহ অন্যান্য রোগ নিয়ে।
বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে হাসপাতালে ভর্তি রোগী পৌর শহরের আলিফ হোসেন বলেন, ভ্যাপসা গরমে ডায়রিয়া হয়েছে। হাসপাতালে রোগীদের চাপে কোনো জায়গা অবশিষ্ট নেই। এই কারণে সিঁড়িতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। তার ওপর বিদ্যুৎ যায়–আসে।
বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
মেহেরপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ব্যবস্থাপক স্বদেশ কুমার ঘোষ বলেন, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম থাকায় লোডশেডিং হচ্ছে। তবে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট আশ্বাস দিতে পারেননি তিনি।



