মৌলভীবাজারে বিরল চাঁদিয়াল পাখির সন্ধান: পাখি বিশেষজ্ঞদের অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ
মৌলভীবাজারে বিরল চাঁদিয়াল পাখির সন্ধান

মৌলভীবাজারের আদমপুর বিটে বিরল চাঁদিয়াল পাখির সন্ধান

গত ২৬ জানুয়ারি, সিলেটের কানাইঘাটের বড় হাওরে বিরল পাতিসারসের ছবি তুলে সন্ধ্যায় শহরে ফিরে আসার পর, একটি বিশেষ দল শ্রীমঙ্গলের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। দুই বছর পর শ্রীমঙ্গলে পৌঁছে, সকালে নাশতা সেরে আদমপুর ও কুরমা পক্ষী অভয়াশ্রমে পাখি পর্যবেক্ষণের জন্য অটোরিকশা ভাড়া করা হয়।

অভিযানের শুরু ও প্রথম পর্যবেক্ষণ

আদমপুর বিটে সকাল ৯টার দিকে পৌঁছানোর পর, প্রায় ২ ঘণ্টা ২০ মিনিট ধরে বনের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ৩০ প্রজাতির বেশি পাখি, প্রাণী ও প্রজাপতির ছবি তোলা হয়। এরপর, টার্গেট করা তিন-চারটি পাখি দেখার সম্ভাব্য স্থান ছড়ার মুখে যাওয়া হয়। একসময় এই এলাকায় বামন মাছরাঙা বাসা বানাত বলে জানা যায়।

সরু ছড়া ধরে সামনের দিকে এগোনোর সময়, ঘন জঙ্গলের মধ্যে প্রায় ১৫ মিনিট হাঁটার পর একটি স্থানে থামা হয়। সঙ্গী বিশিষ্ট পক্ষিবিদ আবদুল মজিদ শাহ শাকিল বাইনোকুলার দিয়ে একটি বিশাল গাছের সবুজ পত্রগুচ্ছের ভেতরে লুকিয়ে থাকা একটি নতুন সবুজ পাখি শনাক্ত করেন। দ্রুত ক্যামেরা তাক করে পাখিটির ছবি তোলা হয়, যদিও এই পাখি দেখার গল্প আরেক দিনের জন্য সংরক্ষিত থাকে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চাঁদিয়াল পাখির আবিষ্কার ও ছবি তোলার চ্যালেঞ্জ

আরও দু–তিনটি পাখির ছবি তোলার পর, অল্প একটু সামনে এগোলে মনে হয় আরেকটি নতুন পাখি বা লাইফার দেখা যাবে। প্রায় এক যুগ ধরে এই পাখিটির খোঁজ চলছিল। শাকিল মুঠোফোনে পাখিটির ডাক ছাড়লে, মিনিট দুয়েকের মধ্যেই পাখিটি সাড়া দেয়। কিন্তু ঘন ডালপালা ও পাতার আড়ালে থাকায় সহজে ফোকাস করা সম্ভব হচ্ছিল না।

নতুন পাখি দেখার উত্তেজনায় হাত কাঁপা শুরু হলে, ঘড়ির কাঁটায় ১২টা ১২ মিনিট ৩৮ সেকেন্ডে প্রথম ছবিটি তোলা হয়। এরপর দুটি ছররা ক্লিকে ২৭টি ছবি তোলা হয়, কিন্তু একটি ছবিও মনমতো হয়নি। তবে ২৯তম ছবি থেকে ভালো ছবি ওঠা শুরু হয়। মিনিট দুয়েক পরে আরেকটি পাখি এসে হাজির হলে, ৬ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডে মোট ১২৯টি ছবি তোলা হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চাঁদিয়াল পাখির পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য

এত কষ্ট করে পাওয়া নতুন পাখিটি বাংলাদেশের বিরল আবাসিক শাখাচারি (প্যাসারিন) পাখি চাঁদিয়াল। এই পাখির কোনো প্রচলিত বাংলা নাম নেই, অনেকে ইংরেজি নামের অনুবাদে চাঁদিবুক মোটাঠুঁটি বলেন। চাঁদিয়াল নামটি পশ্চিমবঙ্গ থেকে এসেছে। ইংরেজি নাম সিলভার-ব্রেস্টেড ব্রডবিল, গোত্র ইউরিল্যামিডি, বৈজ্ঞানিক নাম Serilophus lunatus।

চাঁদিয়াল ছোট আকারের পাখি, প্রাপ্তবয়স্ক পাখি লম্বায় মাত্র ১৯ সেন্টিমিটার এবং ওজনে ৩৫ গ্রাম। গাঁট্টাগোট্টা পাখিটির মাথা বড়, ঠোঁট চওড়া, ঘাড় মোটা এবং লেজ ও ডানা খাটো। মাথার চাঁদি ধূসরাভ, চোখের ওপর চওড়া ও দীর্ঘ কালো ভ্রুরেখা দেখা যায়। পিঠের উপরিভাগ কালচে ধূসরাভ, কোমরের দিকে যা ক্রমে কমলাটে বাদামি হয়ে যায়।

দেহের নিচটা রুপালি-ধূসরাভ, ডানা কালো যার আগা সাদা এবং ডানায় নীলচে ছোপ থাকে। লেজ মোটামুটি কালো, ঠোঁট নীলাভ-সাদা। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে প্রায় একই রকম হলেও স্ত্রীর গলা ও বুকের মাঝখানে অলংকারের মতো রুপালি কণ্ঠী থাকে। উভয়ের চোখ বাদামি, অক্ষিবলয় হলুদ, পা ও পায়ের পাতা হলদে সবুজ। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি দেখতে বড়গুলোর মতো হলেও ঠোঁট কালচে হয়।

আবাস, আচরণ ও প্রজনন

চাঁদিয়াল পাখি সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ বনের বাসিন্দা। দিবাচর ও বৃক্ষচারী পাখিগুলো সচরাচর একাকী, জোড়ায় বা ছোট দলে বিচরণ করে। ঝুলন্ত লতাপাতা ও গাছের পত্রগুচ্ছে খাবার খোঁজে, পোকামাকড় ও শামুক তাদের প্রিয় খাবার। ভোর ও গোধূলিতে বেশি সক্রিয় থাকে, গাছের ডালে খাড়াভাবে বসে ও মাঝেমধ্যে লেজ নাড়ায়।

উচ্চ স্বরে ‘কি-উউ...’, ‘চির-র-র-র...’ বা ‘কিটিকিটিকি...’ শব্দে ডাকে। মার্চ থেকে জুন প্রজননকাল, এ সময় মাটি থেকে ১-৩ মিটার উচ্চতায় ঝুলন্ত সরু ডালে ডিম্বাকার থলের মতো বাসা বানায়। স্ত্রী চার-পাঁচটি সাদা বা পাটকিলে ডিম পাড়ে, স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে তা দেয়। ডিম ফোটে ১৫-১৮ দিনে, ছানা লালন–পালন উভয়েই মিলেমিশে করে এবং আয়ুষ্কাল কমবেশি ছয় বছর।

আ ন ম আমিনুর রহমান, পাখি, বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ এবং অধ্যাপক, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়