শহর ঠান্ডায় গাছের ভূমিকা অর্ধেক তাপ কমায়, তবে যথেষ্ট নয়
শহর ঠান্ডায় গাছের ভূমিকা অর্ধেক তাপ কমায়

বর্তমানে বিশ্বের অর্ধেকের বেশি মানুষ শহরে বাস করে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ৬৮ শতাংশে পৌঁছাবে। শহর এলাকায় চারদিকে শুধু রাস্তাঘাট, ইট ও কংক্রিটের দালান, যা সূর্যের তাপ শুষে নেয় এবং পরে তা ধীরে ধীরে ছাড়তে থাকে। এ কারণে গ্রামের তুলনায় শহরে সাধারণত ১ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি গরম থাকে। কোনো কোনো শহরে এই তাপমাত্রা ৭ ডিগ্রি পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। যখন তাপ শহরের বাতাস ছেড়ে বেরিয়ে যেতে না পেরে আটকে যায়, তখন একে বলে ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ বা তাপীয় দ্বীপ।

গরমের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও গাছের সমাধান

অতিরিক্ত এই গরম আমাদের শরীরের জন্য বেশ বিপজ্জনক। বিশেষ করে গরমপ্রধান দেশগুলোয় পানিশূন্যতা বা হিটস্ট্রোকের মতো স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দেয়। তাপমাত্রা খুব বেশি বেড়ে গেলে মানুষের মৃত্যুরও কারণ হতে পারে। তবে এ সমস্যার একটি সহজ সমাধান হলো শহরের গাছপালা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রশাসন এখন শহরকে ঠান্ডা রাখতে প্রচুর গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিচ্ছে।

গাছের কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই গাছগুলো আসলে কতটা কার্যকর? গাছ না থাকলে শহরগুলো আরও কতটা গরম হতো? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে বিশ্বের প্রায় ৯ হাজার শহরের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যেখানে প্রায় ৩৬০ কোটি মানুষের বসবাস। গবেষণায় দেখা গেছে, শহরগুলোয় যে অতিরিক্ত তাপ বাড়ছে, গাছপালা সেই তাপের পরিমাণ প্রায় অর্ধেক কমিয়ে দিতে পারে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গাছ কীভাবে শহর ঠান্ডা করে

শহরকে শীতল রাখতে কেন গাছের ওপর এত জোর দিচ্ছেন বিজ্ঞানীরা? কারণ, গাছ আসলে প্রকৃতির তৈরি একেকটি এয়ার কন্ডিশনার। গাছ ছায়া দিয়ে রাস্তাঘাট ও দালানকোঠাকে সরাসরি গরম হওয়া থেকে বাঁচায়। শুধু তা–ই নয়, গাছ প্রস্বেদন নামক একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় নিজের পাতা থেকে জলীয় বাষ্প বাতাসে ছেড়ে দেয়। এই বাষ্প চারপাশের বাতাসকে অনেকটা ঠান্ডা করে ফেলে, যা গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমেও তাপমাত্রার বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি করতে পারে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গবেষণার ফলাফল

যদি শহর থেকে সব গাছ কেটে ফেলা হয়, তবে তাপমাত্রা কতটা বেড়ে যাবে? এটি খুঁজে বের করতে বিশ্বের প্রায় ৯ হাজার শহরের তাপমাত্রা ও গাছপালার পরিমাণের বিশাল এক ডেটাবেজ বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকেরা। এরপর একটি পরিবেশের কৃত্রিম পরিস্থিতি কল্পনা করে সেটিকে বর্তমান অবস্থার সঙ্গে তুলনা করা হয়। এতে দেখা গেছে, গাছপালা আসলে শহরগুলোকে কতটা বড় বিপদ থেকে রক্ষা করছে।

গবেষণায় স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া মাটির তাপমাত্রার চেয়ে বায়ুর তাপমাত্রার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কারণ, সূর্যের আলোয় রাস্তা বা ছাদ যতটা গরম হয়, বাতাস ততটা হয় না। তাই মাটির তাপমাত্রা মাপলে গাছ কতটুকু ঠান্ডা দিচ্ছে, সে সম্পর্কে ভুল বা অতিরঞ্জিত ধারণা পাওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু বায়ুর তাপমাত্রা মাপলে মানুষ আসলে কতটা গরম অনুভব করছে, তার সঠিক পরিমাপ পাওয়া যায়।

গাছের আসল ক্ষমতা

শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গাছের ভূমিকা আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, শহরগুলোয় যে বাড়তি গরম তৈরি হয়, গাছপালা একা সেই তাপের প্রায় অর্ধেক কমিয়ে দিতে পারে। সাধারণত শহরের তাপমাত্রা গ্রামের চেয়ে ১ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকে। কিন্তু গাছপালা থাকলে সেই বাড়তি তাপমাত্রা প্রায় ০ দশমিক ৫ থেকে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব। বিশ্বের প্রায় ২০ কোটি মানুষের জন্য গাছপালা স্থানীয় বায়ুর তাপমাত্রা অন্তত ০ দশমিক ৫ ডিগ্রি কমিয়ে দেয়, যা প্রচণ্ড গরমের সময় শরীরকে স্বস্তি দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

অবশ্য সব জায়গায় এই ঠান্ডার পরিমাণ এক নয়। আমেরিকার ফিনিক্সের মতো শুষ্ক ও প্রচণ্ড গরম শহরগুলোয় গাছের উপস্থিতির কারণে তাপমাত্রার পার্থক্য খুব স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। আবার পর্তুগালের লিসবন বা সুইডেনের গোথেনবার্গের মতো নাতিশীতোষ্ণ শহরগুলোয়ও গাছ যথেষ্ট ঠান্ডা দেয়, তবে সেখানে শহরজুড়ে তাপমাত্রার এই পরিবর্তন প্রায় সমান থাকে।

শুধু গাছ লাগানোই কি সমাধান?

শহরের অসহ্য গরম থেকে বাঁচতে আমরা প্রথমেই গাছ লাগানোর কথা ভাবি। কারণ, গাছ সস্তা, দেখতে সুন্দর এবং এটি আমাদের মানসিক প্রশান্তি ও নির্মল বাতাস দেয়। তীব্র রোদে গাছের ছায়ার নিচে দাঁড়ালে যে প্রশান্তি পাওয়া যায়, তা অতুলনীয়। এ কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার শহর ঠান্ডা রাখতে গাছের ওপর এত বেশি নির্ভর করছে।

কিন্তু গবেষণা বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যে হারে তাপমাত্রা বাড়ছে, তা সামলাতে শুধু গাছই যথেষ্ট নয়। ধারণা করা হচ্ছে, এই শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে পৃথিবী যে পরিমাণ উত্তপ্ত হবে, বর্তমানের শহুরে গাছপালা তার মাত্র ১০ শতাংশ তাপ কমাতে পারবে। আমরা যদি ব্যাপকভাবে গাছ লাগাই, তবে এই হার বেড়ে হয়তো ২০ শতাংশ হবে। অর্থাৎ গাছ অনেক বড় ভূমিকা রাখলেও বাকি ৮০ শতাংশ তাপ কমানোর জন্য অন্য কিছু ভাবতেই হবে।

আর কী করা যেতে পারে

ভবিষ্যতের উত্তপ্ত শহরগুলোকে বাসযোগ্য রাখতে হলে গাছকে একটি বড় পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। কেবল গাছ লাগিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। নগরের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হবে। বিল্ডিংয়ে এমন রং বা উপাদান ব্যবহার করা, যা সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে ফিরিয়ে দেয়। ভবনের নকশা এমনভাবে করা, যাতে বাতাস সহজে যাতায়াত করতে পারে এবং বিল্ডিংয়ে ছাদবাগান তৈরি করা।

নতুন গাছ লাগানোর সময় সেই এলাকাগুলোয় গুরুত্ব দিতে হবে যেখানে গাছ একদমই নেই। কারণ, সেখানেই গাছ সবচেয়ে বেশি সুফল দেবে। তবে মনে রাখতে হবে, এসবই কেবল সাময়িক সমাধান। পৃথিবীর মূল তাপমাত্রা কমাতে হলে ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানোর কোনো বিকল্প নেই।

সূত্র: দ্য কনভার্সেশন, ইয়াহু এনভায়রনমেন্ট