পর্যটন নগরী সিলেটের উন্নয়নে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার একটি মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। বিভাগীয় নগরী সিলেটকে বন্যামুক্ত রাখতে সুরমা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত ছড়া-নালায় স্লুইস গেট ও নদীর দুই তীরের ১৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ এ পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য। এ ছাড়া, নদীর দুই তীরের সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য নির্মিত হবে ওয়াকওয়ে। শনিবার (২ মে) সিলেট সফরে এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রীর সিলেট সফরের কর্মসূচি
পাশাপাশি বাসিয়া নদী খনন প্রকল্পের উদ্বোধন ও নগরীর জিন্দাবাজারে সিলেট ওভারসিজ সেন্টারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন তিনি। এ ছাড়া ১২-১৪ বছরের শিশু-কিশোরদের ক্রীড়া প্রতিভা অন্বেষণে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও বিএনপির দলীয় সভায় অংশ নেবেন। সবমিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করতে প্রস্তুত সিলেট।
সুরমা নদীকেন্দ্রিক উন্নয়ন প্রকল্প
সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) প্রশাসক কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, সিলেট নগরকে ‘গ্রিন অ্যান্ড ক্লিন সিটি’ হিসেবে গড়ে তুলতে সুরমা নদীকেন্দ্রিক একটি বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে সিসিক। নদীর দুই তীরজুড়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকা সংরক্ষণ ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় নদীর দুই তীরে শক্তিশালী বন্যা প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি নাগরিকদের জন্য ওয়াকওয়ে নির্মাণ, নদী তীর সৌন্দর্য বর্ধন, স্লুইট গেট স্থাপনসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।
তিনি বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন নগরবাসী আধুনিক ও নান্দনিক নদী তীর পাবে, অন্যদিকে জলাবদ্ধতা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে সুরমা নদীকে ঘিরে পরিকল্পিত উন্নয়নে নগরের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হবে।
এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নগরীর চেহারা পাল্টে যাবে জানিয়ে তিনি বলেন, পিছিয়ে পড়া সিলেটকে উন্নয়নের মূলধারায় আনতে চাই। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী আমাদের প্রতি অত্যন্ত সদয়। তার উদ্যোগে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীতকরণ, রেলওয়ের ডাবল লাইনসহ একাধিক বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে, যা সিলেটের সার্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ওভারসিজ সেন্টারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন
আগের কর্মসূচিসমূহ অপরিবর্তিত রেখে সফরসূচিতে কেবল শনিবার বেলা ১১টা ৩৫ মিনিটে বাংলাদেশ ওভারসিজ সেন্টার, সিলেটের ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রটোকল অফিসার-১ উজ্জ্বল হোসেন স্বাক্ষরিত সফরসূচিতে বলা হয়, শনিবার সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবেন। সকাল সাড়ে ১০টায় তিনি হযরত শাহজালাল (রহ.) এর মাজার জিয়ারত করবেন। বেলা ১১টায় নগরের চাঁদনীঘাট এলাকায় সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্পের উদ্বোধন ও সুধী সমাবেশে যোগ দেবেন। দুপুর ১২টায় সদর উপজেলার কান্দিগাঁওয়ে জিয়াউর রহমানের স্মৃতি বিজড়িত বাসিয়া খাল (বাসিয়া নদী) খনন কাজের উদ্বোধন করবেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে প্রথম এই খাল উদ্বোধন করেছিলেন। বিকাল ৩টায় সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে দেশে নতুন করে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬’ প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করবেন তিনি। বিকাল ৫টায় সিলেট জেলা শিল্পকলা অ্যাকাডেমিতে দলীয় সভায় অংশগ্রহণ শেষে সন্ধ্যা ৭টার ফ্লাইটে বিমানযোগে ঢাকার উদ্দেশে সিলেট ত্যাগ করবেন।
সফরকালে রাস্তা বন্ধ হবে না
প্রধানমন্ত্রীর সফরের সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সিলেটের জেলা প্রশাসক বলেন, প্রধানমন্ত্রী এখানে আসছেন, মূলত খেলাধুলা উদ্বোধন করার জন্য। এটা আমাদের জন্য অনেক পাওয়া, একটা বড় পাওয়া। আর দ্বিতীয়ত হচ্ছে, পাশেই বাসিয়া নদী এবং মরা নদী যেটা আছে, সেই নদীতে আমাদের শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এখানে খনন করেছিলেন, সেই নদীটা পুনঃখনন হবে। তাছাড়া আমাদের সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে অনেকগুলো প্রজেক্ট আছে, সেটিও উদ্বোধন করবেন। সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য রাখবেন। একইসঙ্গে প্রবাসীদের জন্য একটি ওভারসিজ সেন্টার, প্রবাসী কল্যাণ ভবনে সেটির উদ্বোধন করবেন। এই প্রোগ্রামগুলো এখানে আছে।
তিনি বলেন, আমরা আমাদের সবগুলোতে ভেন্যুতে যে প্রস্তুতি দরকার, মোটামুটি প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। আমাদের জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে আমরা বরণ করে নেবো।
নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি বলেন, সফরকালীন নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী খুব সাধারণ মানুষের মতো চলেন, সাধারণ মানুষের হয়ে চলেন। প্রধানমন্ত্রী যেভাবে ডিজায়ার করেছেন, আমরা সেভাবেই সফরসূচি চূড়ান্ত করেছি। সফরকালে কোনোভাবেই জনসাধারণের যেন কোনও কষ্ট যেন না হয়, অতিরিক্ত কোনও ধরনের মেজারমেন্ট যেন না হয়। প্রধানমন্ত্রী যখন আসবেন তখন রাস্তা বন্ধ হবে না, কোনও কিছু হবে না। জাস্ট সাধারণ মানুষ যেভাবে চলে, ঠিক সেভাবেই চলবে।
নগরজুড়ে উৎসব
নির্বাচনের পর প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর সিলেট সফরকে ঘিরে পুরো নগরজুড়ে এক ধরনের উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস বিষয়ক ব্যানার ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে নগরী। এই সফরকে সামনে রেখে প্রশাসন, সিটি করপোরেশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দফায় দফায় বৈঠক করছে। বেশ কয়েকটি প্রস্তুতিমূলক সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সিলেট নগরীর প্রধান সড়ক, গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও স্থাপনাগুলো নতুন করে সাজানো হয়েছে। রাস্তা মেরামত, সড়কের পাশে গাছপালা ছাঁটাই, সরকারি ভবনের সৌন্দর্যবর্ধনও করেছে। তবে সিলেট সিটি করপোরেশন অপ্রয়োজনীয় ব্যানার-ফেস্টুন এরই মধ্যে অপসারণ করেছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছাড়াও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মাঠে কাজ করছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট, নজরদারি এবং প্রটোকল অনুযায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সফরের সময়সূচি অনুযায়ী প্রতিটি স্থান আগেভাগেই প্রস্তুত রাখা হচ্ছে এবং যেকোনও পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে শুধু প্রশাসনিক নয়, জনমানুষের মাঝেও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। নগরের বিভিন্ন স্থানে স্বাগত ব্যানার, আলোকসজ্জা এবং দলীয় কর্মসূচির কারণে এক ধরনের উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে বৃহস্পতিবার বিকালে নগরীতে স্বাগত মিছিল বের করা হয়। বিএনপি ছাড়াও অঙ্গ সংগঠনের পক্ষ থেকেও গত দুই দিন ধরে বের করা হচ্ছে স্বাগত মিছিল।
কলেজশিক্ষক অধ্যাপক ফরিদ আহমদ বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী প্রথম সিলেট সফরে আসছেন এটা আমাদের জন্য আনন্দের সংবাদ। বিএনপি নেতাকর্মীদের পাশাপাশি পেশাজীবীরাও প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে উন্মুখ। প্রধানমন্ত্রীর সফরের মধ্য দিয়ে সিলেটের উন্নয়নে নবদিগন্তের সূচনা হবে।
কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা
প্রধানমন্ত্রীর সিলেট সফর নিয়ে বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) বিকালে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) কমিশনার আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ভিভিআইপি প্রটোকল টিমের সদস্য ছাড়াও নিরাপত্তা নিশ্চিতে ডিবি, সিটিএসবিসহ পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে ভিভিআইপি নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে অনুমোদিত কর্তৃপক্ষ ব্যতীত নির্ধারিত রুট, অবস্থানস্থল ও ভেন্যুর ৫০০ মিটার পরিধি ও দুই কিলোমিটার উচ্চতায় ড্রোন বা উড্ডয়নযান ওড়ানো নিষিদ্ধ করেছে এসএমপি।



