ডলার কিনে রিজার্ভ শক্তিশালী করছে বাংলাদেশ ব্যাংক
ডলার কিনে রিজার্ভ শক্তিশালী করছে বাংলাদেশ ব্যাংক

দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে টানা চারদিন ধরে বাজার থেকে ডলার কিনছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একইসঙ্গে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্বস্তির আভাস মিলছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ডলারের সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় বাজারে অতিরিক্ত চাপ কমেছে এবং সেই সুযোগে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার সংগ্রহ করে রিজার্ভ শক্তিশালী করার কৌশল নিয়েছে।

টানা চারদিন ডলার ক্রয়

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (১১ মে) একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা কাট-অফ দরে ৪ কোটি ৫০ লাখ (৪৫ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর ফলে মে মাসে মোট ডলার কেনার পরিমাণ দাঁড়ায় ১২ কোটি ৫০ লাখ (১২৫ মিলিয়ন) ডলার এবং চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট ক্রয় বেড়ে হয় ৫ হাজার ৭৯৮ কোটি ৫০ লাখ (৫,৭৯৮.৫০ মিলিয়ন) ডলার।

পরদিন মঙ্গলবার (১২ মে) একই দরে আরও ২ কোটি (২০ মিলিয়ন) ডলার কেনা হয়। এতে মে মাসে মোট ক্রয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ কোটি ৫০ লাখ (১৪৫ মিলিয়ন) ডলার এবং অর্থবছরে মোট ক্রয় হয় ৫ হাজার ৮১৮ কোটি ৫০ লাখ (৫,৮১৮.৫০ মিলিয়ন) ডলার।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বুধবার (১৩ মে) দুইটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে আরও ২ কোটি ৫০ লাখ (২৫ মিলিয়ন) ডলার কেনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে মে মাসে মোট ডলার ক্রয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ কোটি (১৭০ মিলিয়ন) ডলার এবং অর্থবছরে মোট ক্রয় দাঁড়ায় ৫ হাজার ৮৪৩ কোটি ৫০ লাখ (৫,৮৪৩.৫০ মিলিয়ন) ডলার।

সবশেষ বৃহস্পতিবার (১৪ মে) পাঁচটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে আরও ৪ কোটি (৪০ মিলিয়ন) ডলার কেনা হয়েছে। ফলে মে মাসের প্রথম দুই সপ্তাহেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মোট ডলার ক্রয় দাঁড়িয়েছে ২১ কোটি (২১০ মিলিয়ন) ডলার। আর চলতি অর্থবছরে মোট ডলার ক্রয়ের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৫ হাজার ৮৮৩ কোটি ৫০ লাখ (৫,৮৮৩.৫০ মিলিয়ন) ডলার।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এর আগে ৫ মে তিনটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৫ কোটি (৫০ মিলিয়ন) ডলার কেনে বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন মে মাসের প্রথম পাঁচ দিনে মোট ডলার ক্রয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৮ কোটি (৮০ মিলিয়ন) ডলার।

অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলছেন, ডলারের বাজারে অতিরিক্ত অস্থিরতা ঠেকাতে এবং টাকার বিনিময় হারকে নিয়ন্ত্রিত রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই ক্রয় কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গত দুই বছরে ডলারের সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বিপুল পরিমাণ ডলার বাজারে বিক্রি করতে হয়েছিল। তবে এখন পরিস্থিতি কিছুটা উল্টো। রফতানি আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় বাজারে ডলারের সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবারও বাজার থেকে ডলার তুলে রিজার্ভ পুনর্গঠনের সুযোগ পাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে অতিরিক্ত ডলার থাকলে টাকার মান দ্রুত বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা রফতানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বাজার থেকে ডলার কিনে একদিকে যেমন বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা হচ্ছে, অপরদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও শক্তিশালী করা হচ্ছে।

রেমিট্যান্সে বড় প্রবৃদ্ধি

এদিকে প্রবাসী আয়েও বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৩ মে একদিনেই দেশে এসেছে ১৩ কোটি ৮০ লাখ (১৩৮ মিলিয়ন) ডলারের রেমিট্যান্স। চলতি মে মাসের প্রথম ১৩ দিনে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ১৭৪ কোটি ৩০ লাখ (১.৭৪৩ বিলিয়ন) ডলার। গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ১২৬ কোটি ৭০ লাখ (১.২৬৭ বিলিয়ন) ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মে মাসের প্রথম ১৩ দিনে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ।

অপরদিকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১৩ মে পর্যন্ত মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩১ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ২৫ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে অর্থবছরের এই সময়ে রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৪ শতাংশ।

ব্যাংকাররা বলছেন, বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে সরকারের প্রণোদনা, হুন্ডি নিয়ন্ত্রণে নজরদারি বৃদ্ধি এবং ডলারের বাজারে স্থিতিশীলতা— এই তিন কারণে প্রবাসী আয় বাড়ছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন শ্রমবাজারে নতুন কর্মসংস্থানও রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।

রিজার্ভ বৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১২ মে পর্যন্ত দেশের মোট বা গ্রস রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুযায়ী রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৯ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার।

অর্থনীতিবিদদের মতে, রিজার্ভ বাড়ার এই ধারা অব্যাহত থাকলে আমদানি ব্যয় মেটানো, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় সরকারের সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে। একইসঙ্গে বৈদেশিক লেনদেনে আস্থা বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর কাছেও বাংলাদেশের অবস্থান ইতিবাচক বার্তা দেবে।

তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, শুধু রেমিট্যান্স ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার ক্রয়ের ওপর নির্ভর করলেই হবে না। দীর্ঘমেয়াদে রফতানি বহুমুখীকরণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে না পারলে ডলারের বাজারে স্থিতিশীলতা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। তবুও বর্তমান পরিস্থিতিতে রেমিট্যান্স, রিজার্ভ এবং ডলার ক্রয়ের ধারাবাহিকতা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।