পাঁচ এনবিএফআই অবসায়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত সিদ্ধান্ত
পাঁচ দুর্বল এনবিএফআই অবসায়নের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের

দেশের আর্থিক খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম, দুর্নীতি ও দুর্বল তদারকির বড় এক পরিণতির দিকে এগোচ্ছে পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ বছর ধরে আমানতকারীদের অর্থ আটকে থাকা, খেলাপি ঋণের লাগামহীন বিস্তার এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যত অচল হয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে অবশেষে পাঁচটি দুর্বল নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে (এনবিএফআই) অবসায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী জুলাই থেকে এই প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংশ্লিষ্ট সূত্র।

এক যুগান্তকারী নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপ

এ সিদ্ধান্তকে দেশের আর্থিক খাতের ইতিহাসে অন্যতম বড় নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একইসঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে— অবসায়ন হলে আমানতকারীদের ভাগ্যে কী ঘটবে, কত টাকা ফেরত পাবেন তারা, আর কেনই বা এত বড় সংকটে পড়লো দেশের এনবিএফআই খাত?

যেসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হচ্ছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অবসায়নের আওতায় আসছে পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এগুলো হলো— ফাস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, অ্যাভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং। এর আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মোট ৯টি দুর্বল এনবিএফআইকে অবসায়নের তালিকায় রেখেছিল। পরে শুনানি শেষে প্রাইম ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স এবং বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানিকে (বিআইএফসি) কিছু সময় দেওয়া হয় আর্থিক অবস্থার উন্নতির জন্য। ফলে সর্বশেষ তালিকায় পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্তভাবে অবসায়নের পথে নেওয়া হচ্ছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কেন ধসে পড়লো প্রতিষ্ঠানগুলো

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বছরের পর বছর অনিয়ম, দুর্বল পরিচালনা পর্ষদ, রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি এবং নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতার কারণেই এসব প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের মুখে পড়ে। বিশেষ করে বেপরোয়া ঋণ বিতরণ, একই গ্রুপকে অতিরিক্ত ঋণ দেওয়া, খেলাপি ঋণ আড়াল করা, ভুয়া ও কাগুজে প্রতিষ্ঠানকে অর্থায়ন, দুর্বল অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পরিচালনা পর্ষদের অনিয়ম ও অর্থ পাচার

এসব কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর মূলধন ঘাটতি ক্রমেই বেড়েছে। একপর্যায়ে তারা আমানত ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক খাতের মতো এনবিএফআই খাতেও দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও করপোরেট প্রভাবশালীদের দখলদারত্ব ছিল। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান কার্যত ‘লুটপাটের কেন্দ্রে’ পরিণত হয়। কিন্তু সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় সংকট আরও গভীর হয়েছে।

আমানতকারীরা কী পাবেন

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—আমানতকারীদের অর্থ ফেরত কীভাবে দেওয়া হবে? বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরুর আগে একটি বিশেষ পরিশোধ কাঠামো ঘোষণা করা হবে। প্রাথমিকভাবে যে পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে, তাতে— ব্যক্তিগত আমানতকারীদের সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত মূলধন পুরোপুরি ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করা হবে, কোনও ধরনের সুদ দেওয়া হবে না, ১০ লাখ টাকার বেশি আমানত থাকলে প্রাপ্য অর্থ অনুপাতে পরিশোধ করা হবে। অর্থ ফেরতের পরিমাণ নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি ও তহবিল প্রাপ্যতার ওপর। বড় আমানতকারীদের জন্য আলাদা কাঠামো তৈরির কথাও ভাবছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কাগজে-কলমে পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে সব আমানতকারী পুরো অর্থ ফেরত পাবেন কিনা, তা এখনও অনিশ্চিত। কারণ বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের সম্পদের বড় অংশই অনাদায়ী ঋণে আটকে আছে।

অর্থ কোথা থেকে আসবে

বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আমানতকারীদের টাকা পরিশোধে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সহায়তা চাওয়া হতে পারে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ বিক্রি, ঋণ পুনরুদ্ধার এবং আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কিছু অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে আর্থিক খাত বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের সহায়তা ছাড়া বিপুল পরিমাণ আমানত ফেরত দেওয়া কঠিন হবে। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগ সম্পদই কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

কেন বিক্ষোভ করছেন আমানতকারীরা

গত কয়েক বছরে দুর্বল এনবিএফআইগুলোর আমানতকারীরা ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন করে আসছেন। বহু গ্রাহক অভিযোগ করেছেন, সাত বছর ধরেও তারা নিজেদের জমানো অর্থ তুলতে পারেননি। গত ৭ মে ছয়টি দুর্বল এনবিএফআইয়ের ১২ হাজারের বেশি আমানতকারীর একটি জোট বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে স্মারকলিপি দেয়। সেখানে তারা দ্রুত টাকা ফেরতের দাবি জানান। আমানতকারীদের অভিযোগ— চিকিৎসার খরচ চালাতে পারছেন না। ক্যানসার, কিডনি ও হৃদরোগের রোগীরা বিপদে পড়েছেন। অনেকে ব্যবসা হারিয়েছেন। পরিবার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। মানসিক চাপ ও সামাজিক সংকটে পড়েছেন। স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়, অনেক আমানতকারী টাকা ফেরত না পেয়েই মারা গেছেন।

নতুন আইনের আওতায় অবসায়ন

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমবারের মতো “ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ ২০২৫” এর আওতায় দুর্বল ব্যাংক ও এনবিএফআই পুনর্গঠন বা অবসায়নের পথ তৈরি করে। গত বছরের নভেম্বরে এই অধ্যাদেশের আওতায় অবসায়ন প্রক্রিয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়। এটি দেশের আর্থিক খাতে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান মোকাবিলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ আইনি কাঠামো। এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজন হলে— প্রতিষ্ঠান একীভূত করতে পারবে, সম্পদ বিক্রি করতে পারবে, পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করতে পারবে, অবসায়ন বা পুনর্গঠন করতে পারবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে এবার বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

কতটা গভীর সংকট

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আলোচনায় থাকা ৯টি দুর্বল এনবিএফআইয়ে মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তি আমানতকারীদের আমানত ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা, ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের আমানত ১১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা।

অপরদিকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের ৩৫টি এনবিএফআইয়ের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৪০৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা— যা মোট ঋণের ৩৭ দশমিক ১১ শতাংশ। এক বছর আগে এই হার ছিল ৩৫ দশমিক ৫২ শতাংশ। অর্থাৎ সংকট আরও বেড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কোনও আর্থিক খাতে খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি হলে সেটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয়। সেখানে এনবিএফআই খাতে প্রায় ৪০ শতাংশ ঋণ খেলাপি হয়ে পড়া পুরো খাতের ভয়াবহ দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সামনে কী চ্যালেঞ্জ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু পাঁচটি প্রতিষ্ঠান অবসায়ন করলেই সংকট শেষ হবে না। পুরো এনবিএফআই খাতকে পুনর্গঠন করতে হলে প্রয়োজন— কঠোর তদারকি, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিচালনা, খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, সুশাসন নিশ্চিত করা, আমানত সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা এবং দ্রুত বিচার ও সম্পদ পুনরুদ্ধার। অন্যথায় ভবিষ্যতে আরও আর্থিক প্রতিষ্ঠান একই পরিণতির মুখে পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, পাঁচটি এনবিএফআই অবসায়নের সিদ্ধান্ত দেশের আর্থিক খাতে এক যুগান্তকারী কিন্তু কঠিন বাস্তবতার প্রতিফলন। এতে একদিকে যেমন দীর্ঘদিনের অনিয়মের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রকের কঠোর অবস্থান প্রকাশ পেয়েছে, অপরদিকে তেমনই হাজারো আমানতকারীর অনিশ্চয়তা ও ভোগান্তির চিত্রও সামনে এসেছে। এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা— কেন্দ্রীয় ব্যাংক কত দ্রুত ও কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে এই অবসায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে।