ধানের শীষে ভোট দেওয়ায় স্ত্রীকে তালাকের অভিযোগ, স্বামী অস্বীকার করছেন
ধানের শীষে ভোট দেওয়ায় স্ত্রীকে তালাকের অভিযোগ

ধানের শীষে ভোট দেওয়ায় স্ত্রীকে তালাকের অভিযোগ, ফেনীতে চাঞ্চল্য

ফেনীর পরশুরাম উপজেলার চিথলিয়া ইউনিয়নের পাগলিরকুল গ্রামে ধানের শীষে ভোট দেওয়ায় এক গৃহবধূকে তালাক দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। রুনা আক্তার মুন্নি (৩২) নামের ওই নারী দাবি করেছেন, ভোট দেওয়ার কারণে স্বামী নুর মোহাম্মদ সুমন তাকে তালাক দিয়েছেন। তবে সুমন এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, পারিবারিক মনোমালিন্যের কারণেই এফিডেভিটের মাধ্যমে স্ত্রীকে তালাক দেওয়া হয়েছে।

ঘটনার বিবরণ

রুনা আক্তার জানান, ভোটের আগের দিন রাতে স্বামী তাকে জিজ্ঞেস করেন তিনি কোথায় ভোট দেবেন। রুনা উত্তর দেন, ছোটবেলা থেকে তার বাবা ধানের শীষে ভোট দিতেন, তাই তিনিও ধানের শীষেই ভোট দেবেন। এরপর সুমন তাকে ভোটকেন্দ্রে যেতে নিষেধ করেন এবং বাড়ি থেকে চলে যান। রুনা রাজষপুর আলী আজ্জম উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে ধানের শীষে ভোট দিয়ে আসেন।

রাতে বাড়ি ফিরে সুমন দাবি করেন, তিনি দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়েছেন এবং সেখানে দাঁড়িপাল্লা পাশ করেছে। রুনা ধানের শীষে ভোট দেওয়ার কথা বলার পর সুমন আর কোনো কথা বলেননি। পরের দিন ভোরে সুমন রুনা ও তাদের বড় ছেলেকে মারধর করে, বাড়ি থেকে জমির কাগজপত্র ও দলিল নিয়ে চলে যান। এখন পর্যন্ত তিনি ঘরে ফেরেননি এবং প্রতিবেশীদের জানিয়েছেন, আদালত থেকে রুনাকে তালাক দিয়েছেন।

স্বামীর বক্তব্য

নুর মোহাম্মদ সুমনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, পারিবারিক মনোমালিন্যের কারণে রুনার সঙ্গে ঘরসংসার করতে না পেরে তাকে তালাক দিয়েছেন। ধানের শীষে ভোট দেওয়ায় তালাক দেওয়ার বিষয়টি তিনি সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করেন। সুমন আরও দাবি করেন, রুনা ভোটারই হননি, তাই তিনি ভোট দিতে পারবেন না। তিনি বলেন, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ফেনী নোটারি পাবলিক কার্যালয়ে এফিডেভিটের মাধ্যমে তালাকনামা রেজিস্ট্রি করে ডাকযোগে রুনার কাছে পাঠিয়েছেন।

পারিবারিক পটভূমি

জানা গেছে, রুনা আক্তার ভোটার হয়েছেন। ২০১৪ সালের ৭ নভেম্বর চিথলিয়া ইউনিয়নের নোয়াপুর গ্রামের নুর আহমেদের মেয়ে রুনা আক্তার মুন্নিকে বিয়ে করেন একই ইউনিয়নের পাগলীরকুল গ্রামের জসীম উদ্দিনের ছেলে নুর মোহাম্মদ সুমন। তাদের ঘরে মোবারক হোসেন মুরাদ (১০) ও মোহাম্মদ মোস্তাকিম হোসেন (৩) নামে দুই ছেলেসন্তান রয়েছে। রাজষপুর বাজারে ভাই ভাই স্টোর নামে সুমনের একটি দোকান আছে।

এফিডেভিট ও আইনগত দিক

এফিডেভিটের প্রাপ্ত কপিতে দেখা যায়, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ফেনীর নোটারি পাবলিক কার্যালয়ের আইনজীবী রবিউল হক রবির স্বাক্ষরে সুমনের তালাকনামা সংক্রান্ত এফিডেভিট ইস্যু করা হয়েছে। তাকে শনাক্তকারী ছিলেন জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী মীর মোশারফ হোসেন মানিক। তালাকনামায় রুনার বিরুদ্ধে সংসার জীবন পালনে অক্ষমতা, পরিবারের সদস্যদের সাথে খারাপ আচরণ ও অমান্য করার মতো অভিযোগ তুলে ধরেন সুমন।

প্রতিবেশী ও স্থানীয় প্রতিক্রিয়া

সুমনের প্রতিবেশী কাউসার আলম বলেন, সুমন বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার পর রুনা বিষয়টি তার কাছে জানান। কাউসার আলম প্রশ্ন তোলেন, রুনার দুটি ছোট ছেলেকে কে দেখবে? এটি ভাবা উচিত ছিল। অন্য প্রতিবেশী কৃষক আবদুল কাদের বলেন, গত রোববার সুমন তাকে ফোন করে জানান, আদালত থেকে তালাকনামা পাঠিয়েছেন এবং রুনাকে বাড়ি থেকে চলে যেতে বলবেন।

ঘটনাটি জানাজানি হলে চিথলিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মুন্সী নজরুল ইসলাম জাহাঙ্গীর, সাধারণ সম্পাদক মাস্টার শেখ আহমদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ইব্রাহিমসহ দলীয় নেতাকর্মীরা সুমনের বাড়িতে উপস্থিত হন। উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবদুল হালিম মানিক বলেন, ধানের শীষে ভোট দেওয়ার অপরাধে সুমন স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে দেন, এ ধরনের নিন্দনীয় ঘটনা সামাজিক অবক্ষয়ের কারণ হবে।

সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) বিকালে বিষয়টি প্রকাশ পেলে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। স্থানীয়রা এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।