২০০৩ সালের একটা ঘটনা বেশ মনে পড়ে। তখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি। সামাজিক বিজ্ঞান ক্লাসে ম্যাডাম আমাদের প্রশ্নের উত্তর লিখতে দিলেন। সবার উত্তরপত্র দেখার পর ম্যাডাম আমার লেখার খুব প্রশংসা করেন। তখন ক্লাস ক্যাপ্টেন এসে জিজ্ঞাসা করে, ‘এই নাহিদ, তুমি কোন গাইড থেকে লিখেছ? আমার গাইডে তো এভাবে লেখা নেই।’ তখন আমি বেশ গর্ব করেই বলেছিলাম, ‘কোনো গাইড থেকে নয়, এটি আমার আম্মা নোট করে দিয়েছেন।’
আম্মার হাত ধরে শিক্ষাজীবনের শুরু
এভাবে আম্মার পরিচর্যায় আমি পড়াশোনায় ভালো করতে শুরু করি। চতুর্থ শ্রেণিতে রোল নম্বর হয় ২। হাতের লেখায় পরিবর্তন আসে। স্কুলে ভালো ছাত্রদের একজন হয়ে শিক্ষকের প্রশংসা অর্জন করি।
আম্মা বইয়ের লাইন পড়তেন, আর আমি শুনে শুনে মুখস্থ করে ফেলতাম। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে যখন বৃত্তি পাই, সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিলেন আম্মা। সবাইকে এই কথা গর্ব করে বলতেন।
শৈশবের ডানপিটে স্মৃতি
ছোটবেলায় ডানপিটে ছিলাম। বাবা যখন শাসন করতেন, তখন সবার আগে ঢাল হয়ে আমায় আড়াল করে তিনি দাঁড়াতেন। আবার অন্যায় করলে শাসনও করতেন। একবার দুপুরে ঘুমাব না বলে আমি আর আমার ছোট বোন সিদ্ধান্ত নিই। উদ্দেশ্য সারা দুপুর ও বিকেল খেলা করে কাটাব। কিন্তু আম্মার এককথা, বিকেলে খেলতে যেতে পারব। এদিকে আমরাও নাছোড়বান্দা। আমাদের দুজনকে ঘরে তালা লাগিয়ে দিলেন। বেশ কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করে আমার মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি এল। তখন মাটির মেঝে ছিল। চারপাশে টিন দিয়ে ঘেরা। ছোট বোন জেরিনকে বললাম, একটা কিছু আনতে, যা দিয়ে মাটি খোঁড়া যাবে। নিয়ে আসার পর শুরু হয় মাটি খোঁড়ার অভিযান। আমি টিনের নিচে মাটি কাটি, আর জেরিন সেগুলো সরিয়ে রাখে। এভাবে একসময় দুজনের বের হওয়ার মতো রাস্তা তৈরি হতেই এক দৌড়ে খেলার মাঠে। সেদিন সন্ধায় ফিরে আসার পর কী ঘটেছিল, তা আর না–ই বলি।
আমার অনুপ্রেরণা আমার আম্মা
আম্মা সব কাজে আমার সাহায্যকারী। জগতের সেরা অনুপ্রেরণার কথাগুলো তাঁর কাছেই পাই। তিনি উদ্যমী, পরিশ্রমী, বিচক্ষণ। আমি চাই আম্মার মতো হতে। বইয়ের পাতায় যোদ্ধাদের গল্প শুনেছি, টিভি-মুভিতে দেখেছি, কিন্তু বাস্তব জীবনে আমার কাছে আসল যোদ্ধা হলেন আম্মা। বউ হয়ে আমাদের বাড়িতে আসার পর থেকে তাঁকে নানা বাস্তবতা ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তিনি কখনো দমে যাননি, চেষ্টা করে গিয়েছেন। তাঁর আপ্রাণ চেষ্টার ফলেই আমাদের ছোট্ট ঘরটা আজ বড় একটি ঘরে পরিণত হয়েছে।
সর্বশেষ আম্মাকে খুশি করতে পেরেছিলাম ২০১২ সালে। তখন আমি সেমিস্টার পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করি। এখন আম্মা আগের মতো তেমন হাসেন না, সংসারের নানা ধরনের জটিলতায় তাঁর হাসিটা মলিন হয়ে যাচ্ছে। আমার একটি স্বপ্ন, আম্মার মুখে আবারও সেই হাসিটা ফিরিয়ে দেওয়া।
আম্মাকে মুখ ফুটে কখনো বলতে পারিনি ভালোবাসি, হয়তো কখনো পারবও না। তবে আমি যোগ্য হব। আম্মার স্বপ্ন পূরণ করে তাঁর মুখে চিরচেনা সেই হাসিটা ফিরিয়ে আনব। ভালোবাসি আম্মা।



