শ্রমে ন্যায্যতা নেই, মে দিবসও প্রতিবাদের
শ্রমে ন্যায্যতা নেই, মে দিবসও প্রতিবাদের

শ্রমিকদের বুক সব সময়ই ভার থাকে। দুশ্চিন্তা গ্রাস করে সর্বদা। কখন চাকরি হারাতে হয়, তা নিয়ে সবসময়ই আতঙ্কে থাকেন তারা। এমনও মালিক রয়েছে, যারা কর্মক্ষেত্রে ঊনিশ থেকে কুড়ি হলেই চাকরি থেকে বের করে দেন। বিশেষ করে নিম্ন পর্যায়ের শ্রমিকরা বিন্দুমাত্র প্রতিবাদ করতে পারেন না।

মে দিবসের প্রতিপাদ্য ও কর্মসূচি

আজ মহান মে দিবস, অর্থাৎ আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও দিবসটি বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। ‘সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত; আসবে এবার নব প্রভাত’- এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে রাজধানীসহ সারাদেশে সরকারি-বেসরকারি ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের উদ্যোগে নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। শুক্রবার (১ মে) সকাল থেকেই জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের ব্যানারে সভা, মানববন্ধন ও আলোচনা চলছে।

দিনমজুরদের বক্তব্য

দিনমজুর মনির জানান, সাত সকালে রাজধানীর বারিধারা মেইন সড়কের পাশে কোদাল, টুকরি নিয়ে বসে থাকেন, কেউ যদি ডেকে নিয়ে যান কাজ করাতে। তার সঙ্গে প্রায় অর্ধশতাধিক শ্রমিক প্রতিদিন ওখানে বসেন। আজ যাননি, চলে এসেছেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ন্যায্য মজুরি আদায়ের লক্ষ্যে প্রতিবাদ জানাতে। তিনি বলেন, কখনও দিনমজুরের জন্য ৫০০, কখনও ৭০০ টাকা পাওয়া যায়। আবার কখনও ৪০০, কখনও ৫০০ টাকা মেলে। চুক্তি করে নিলেও মালিক বা তার প্রতিনিধি ১০০-১৫০ টাকা রেখে দেন। এমনটা নিত্যদিনের ঘটনা। ন্যায্য দাম চাইলে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অটোরিকশা চালকের অভিজ্ঞতা

রাজধানীতে অবৈধ অটোরিকশা চালান বিল্লাল হোসেন। শুক্রবার রিকশা নিয়ে বের না হয়ে সবার সঙ্গে যোগ দিতে প্রেস ক্লাবের সামনে এসেছেন। তিনি জানান, রিকশা ভাড়ায় চালান। ঘরে বিয়ের উপযুক্ত দুটি মেয়ে। শান্তিতে রিকশা চালাতে পারেন না। ১০ হাজার টাকা রিকশার মালিকের কাছে অগ্রিম জমা দেওয়া হয়েছে। পুলিশ রিকশা ধরলে জরিমানা দিয়ে ছাড়াতে হয়। জরিমানার অর্ধেক টাকা তার জমা দেওয়া টাকা থেকে কেটে নেওয়া হয়।

নারী শ্রমিকের বৈষম্য

রহিমা বেগম নামের মধ্যবয়সি দিনমজুর বলেন, তিনি রাস্তা মেরামতের কাজ করেন। একজন দিনমজুর শ্রমিক নেতার মাধ্যমে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সড়ক মেরামতের কাজ করেন। তিনিসহ শত শত নারী এমন কাজে সম্পৃক্ত। তিনি বলেন, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত টানা কাজ করে প্রতিদিন পান ৪৫০ টাকা। একই কাজ করে পুরুষ শ্রমিক পাচ্ছেন ৯০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত। অথচ নারী শ্রমিকরা সিগারেট খান না, গল্প করেন না, মোবাইলে কথা বলেন না, অন্যদিকে পুরুষ শ্রমিকরা এসব করেন এবং গল্প করেন। তাদের থেকে বেশি কাজ করেও নারীরা কম মজুরি পাচ্ছেন।

মে দিবসের ইতিহাস

জানা যায়, অবর্ণনীয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দিনে ১৬ ঘণ্টা কাজ করতে করতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল মার্কিন শ্রমিকদের। অসহায় অসংগঠিত শ্রমিকগণ তাদের প্রতি এই অন্যায় জুলুমের প্রতিবাদ জানাতে সংগঠিত হয়েছিল। তাই একতাবদ্ধ হয়ে যেদিন তারা গর্জে উঠল, সেদিন ছিল ১৮৮৬ সালের ১ মে। দিনে ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে তারা ধর্মঘট করে এবং বিশাল মিছিল করে শহরের রাস্তায় নামে। শিকাগো পুলিশের সঙ্গে শ্রমিক সংগঠনের খণ্ডযুদ্ধ বেধে যায়। শ্রমিকের রক্তে রক্তাক্ত হয়ে ওঠে আমেরিকার রাজপথ। কিন্তু শ্রমিকেরা তাদের দাবি থেকে একটুও সরে না এসে বৃহত্তর আন্দোলনের পথে পা বাড়ায়। এ ঘটনা সারা বিশ্বে আলোড়ন ফেলে দেয়। সারা বিশ্বের শ্রমিকগণ সংগঠিত হয়ে এই জঘন্য কাজের সমালোচনা করেন। শ্রমিকের রক্ত-শপথ নিয়ে সারা বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষ সংগঠিত হয়। শ্রমিক সংগঠন বিশ্বে স্বীকৃতি লাভ করে ১৮৮৯ সালের ১ মে। সেই থেকে এই দিনটি আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসাবে পালিত হয়ে আসছে।

বিশেষজ্ঞের মতামত

শ্রমিকের আইনি সুরক্ষা, চাকরির নিরাপত্তা ও ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিতকরণ বিষয়ে সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, আমাদের দেশের বাস্তবতায় শ্রমিক সংগঠনের মধ্যে বিভিন্ন সংগঠন নানাভাবে শ্রমিকদের সংগঠিত করে এই দিন রাজপথে উৎসবের আমেজ নিয়ে আসে। অবশ্য দিবসটিতে উৎসবের আমেজ থাকবে, নাকি নিজস্ব দাবি দাওয়া সামনে রেখে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটবে—তা নির্ভর করে যে সময় দিবসটি পালিত হচ্ছে তার আগের ঘটনাবলী কী অথবা আগামী দিনে কী হতে যাচ্ছে তার ওপর।

বর্তমান প্রেক্ষাপট

এবারের মে দিবস পালিত হচ্ছে কোভিড সংকট, কর্তৃত্ববাদী স্বৈরাচারী সরকারের ভোটবিহীনতা ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আশাহত করার দিনগুলো উত্তরণের পর একটি ভোটের মাধ্যমে গঠিত সরকারের সময়ে। এই সময়ে কলকারখানা বন্ধ হয়েছে, বেকারত্ব বেড়েছে, শ্রমিকের ন্যূনতম জাতীয় মজুরি ঘোষিত হয়নি, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র বাড়ছে না, বরং আগামী দিনে নতুন অর্থনৈতিক সংকটের খবরাখবর সামনে আসছে।

বর্তমান সময়ে বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতিতে শ্রমিক শ্রেণির কাজের পরিধি কমিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিন্নমাত্রায় জায়গা করে নিচ্ছে। এই ভিন্নমাত্রার জায়গা করতে গিয়ে শ্রমিকের জ্ঞান, অভিজ্ঞতাকে ব্যবহার করা হচ্ছে, অথচ বিভিন্ন জায়গায় শ্রমিক ছাঁটাই অব্যাহত থাকছে। অনেক সময় মালিকদের পক্ষ থেকে দেখা যায় নিজের অগ্রগতির জন্য যন্ত্রপাতির পেছনে অজস্র টাকা খরচ করছেন কিন্তু শ্রমিক শ্রেণির জীবন রক্ষা এবং জীবনের মান উন্নয়নে টাকা খরচ করতে রাজি হন না। এ অবস্থা থেকে মালিকদের বের করে আনতে সরকারকে কঠোর অবস্থানে আসতে হবে।