ইসলামে মিতব্যয়িতা: ইবাদত ও সুখী জীবনের চাবিকাঠি
ইসলামে মিতব্যয়িতা: ইবাদত ও সুখী জীবনের চাবিকাঠি

ইসলামি জীবনদর্শনে মিতব্যয়িতা শুধু একটি অভ্যাস নয়, বরং এটি ইবাদতের অংশ এবং সুখী জীবনের অন্যতম চাবিকাঠি। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিতব্যয়ী হয়, সে কখনো অভাবগ্রস্ত হয় না।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৪২৬৯; আল-মুজামুল কবির, তাবারানি, হাদিস: ১০১১৮) এই সংক্ষিপ্ত অথচ সারগর্ভ হাদিসটি মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের এক শাশ্বত সত্যকে উন্মোচন করে।

মিতব্যয়িতার অর্থ ও সংজ্ঞা

মিতব্যয়িতা বোঝাতে হাদিসে ‘ইকতিসাদ’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার মানে কৃপণতা নয়, আবার অপচয়ও নয়। এর প্রকৃত অর্থ হলো ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। ইসলামের দৃষ্টিতে মিতব্যয়িতার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে ইমাম গাজালি (র.) বলেন, “ব্যয় করার ক্ষেত্রে নম্রতা ও পরিমিতিবোধ অবলম্বন এবং অদূরদর্শিতা বর্জন করাই হলো মিতব্যয়িতা।” (ইমাম গাজালি, ইহয়াউ উলুমিদ্দিন, ৩/২৪১-২৪২, দারুল মারিফাহ, বৈরুত) আল্লামা মুনাভি (র.)-এর মতে, মিতব্যয়িতার অর্থ হলো আল্লাহর অবাধ্যতার কাজে ব্যয় না করা এবং পরিবারের হক আদায়ের ক্ষেত্রে কৃপণতা না করা। (আল-মুনাভি, ফাইজুল কাদির, ৫/৪৫৪-৪৫৫, মাকতাবাতু নিাজার মোস্তফা আল-বাজ, মিসর)

অপচয় ও কৃপণতার মাঝামাঝি অবস্থান

একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো সে ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখবে। আল্লাহ–তাআলা পবিত্র কোরআনে এই ভারসাম্যের চিত্র তুলে ধরেছেন এভাবে, ‘তুমি তোমার হাত তোমার ঘাড়ের সঙ্গে শিকলবদ্ধ করে রেখো না (কৃপণতা করো না) এবং তা একেবারে প্রসারিতও করে দিয়ো না (অপচয় করো না); তেমন করলে তুমি তিরস্কৃত ও নিঃস্ব হয়ে বসে থাকবে।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ২৯) এই আয়াতে আল্লাহ–তাআলা কার্পণ্যকে গলার সঙ্গে হাত বেঁধে রাখার সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা মানুষকে সংকীর্ণমনা করে তোলে। আবার হাতকে পুরোপুরি প্রসারিত করা অর্থাৎ সামর্থ্যের বাইরে ব্যয় করাকে চূড়ান্ত নিঃস্ব হওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আল্লামা শাওকানি (রহ.) বলেন, অপচয়কারী ব্যক্তি তার সম্পদের অপব্যবহারের কারণে শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ ও সম্পদহীন হয়ে পড়ে। (আল-শাওকানি, ফাতহুল কাদির, ৩/৩১৮, দারুল কলম, দামেস্ক)

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইবাদত ও মিতব্যয়িতা

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের (ইবাদুর রহমান) পরিচয় দিতে গিয়ে অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে মিতব্যয়িতার কথা বলেছেন, ‘এবং তারা যখন ব্যয় করে, তখন অপচয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না; বরং তাদের পন্থা এই দুইয়ের মাঝামাঝি সমতাপ্রদ হয়।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৬৭) হাসান বসরি (রহ.) বলতেন, আল্লাহর পথে ব্যয় করার মধ্যে কোনো অপচয় নেই। আর ইয়াস ইবনে মুয়াবিয়া (রহ.)-এর মতে, “আল্লাহর নির্দেশের বাইরে বা নাফরমানির কাজে যা ব্যয় করা হয়, তা–ই অপচয়।” (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ৩/৪৩৩, দারু তাইবা, মদিনা, ১৯৯৯)

জীবনযাপনে প্রজ্ঞা ও মিতব্যয়িতা

পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবনে মিতব্যয়িতা বজায় রাখা একজন ব্যক্তির প্রজ্ঞার পরিচয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, “জীবনযাপনে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা মানুষের বুদ্ধিমত্তার পরিচয়।” (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২২০৩৮; মাজমাউজ জাওয়াইদ, হাদিস: ৬৩০৮) অনেকে মনে করেন, দান-সদকা করলেই সম্পদ কমে যাবে। মুজাহিদ (রহ.) এই ধারণার ব্যাখ্যায় বলেন, কারো রিজিক যদি কম নির্ধারিত থাকে আর সে যদি অপরিকল্পিতভাবে বড়লোকদের মতো ব্যয় করে, তবে সে আমৃত্যু অভাবগ্রস্ত থাকবে। তাই পবিত্র কোরআনের ‘তোমরা যা ব্যয় করো আল্লাহ তার প্রতিদান দেবেন’—এই আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা করে বেহিসাবি খরচ করা উচিত নয়। (আল-মুনাভি, ফাইজুল কাদির, ৪/৫৬, মাকতাবাতু নিাজার মোস্তফা আল-বাজ, মিসর)

অভাবমুক্ত জীবনের নিশ্চয়তা

হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, মিতব্যয়িতা মানুষকে অন্যের মুখাপেক্ষী হওয়া থেকে রক্ষা করে। যখন কেউ অল্পে তুষ্ট থাকে এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্যয় করে, তখন আল্লাহ তার বরকতের দুয়ার খুলে দেন। আল্লাহ–তাআলা তাকওয়া ও তাওয়াক্কুলের সুফল সম্পর্কে বলেছেন, ‘আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য কোনো পথ বের করে দেন। এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।’ (সুরা তালাক, আয়াত: ২-৩)

বর্তমান ভোগবাদী সমাজে মিতব্যয়িতার শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। মিতব্যয়িতা কেবল টাকা জমানো নয়, বরং এটি জীবনের শৃঙ্খলা। যে পরিবার বা রাষ্ট্র ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে, কোনো মন্দ পরিস্থিতিই তাদের সহজে কাবু করতে পারে না। মিতব্যয়িতার মাধ্যমেই অর্জিত হয় প্রকৃত আত্মনির্ভরশীলতা ও মানসিক শান্তি।