দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত জাতীয় চিড়িয়াখানায় আনা হচ্ছে চারটি চিতা বাঘ। আগামী জুন মাসের প্রথম ভাগে এগুলি পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এই চারটি চিতা বাঘের মধ্যে দুটি পুরুষ এবং দুটি স্ত্রী। সরকার এই উদ্যোগে ব্যয় করছে ১ কোটি ৯ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
চিতা বাঘ কেনার প্রক্রিয়া
রফিকুল ইসলাম জানান, চারটি চিতা বাঘ কেনার জন্য ইতিমধ্যে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এই বন্য প্রাণী চারটি সরবরাহের দায়িত্ব পেয়েছে বাংলাদেশের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ফ্যালকন ট্রেডার্স। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে বিমানযোগে এগুলি আনা হবে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, ১০ জুনের আগে তারা চিতা বাঘ চারটি হস্তান্তর করতে সক্ষম হবে।
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বের প্রতিটি দেশে বন্য প্রাণী আমদানি ও রপ্তানির জন্য নির্ধারিত কর্তৃপক্ষ রয়েছে। বন্য প্রাণী আমদানি বা রপ্তানি করতে হলে সেই কর্তৃপক্ষের অনুমতি প্রয়োজন। বাংলাদেশে এই কর্তৃপক্ষ হলো প্রধান বন সংরক্ষক। চারটি চিতা বাঘ আনার জন্য ১৮ মে অনুমতি দিয়েছেন প্রধান বন সংরক্ষক। বাংলাদেশ সরকারের অনুমতি পাওয়ার পর এখন দক্ষিণ আফ্রিকা সরকারের কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমতি চেয়েছে সেই দেশের রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান।
চিতা বাঘের গুরুত্ব
পরিচালক রফিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, বাংলাদেশের পাহাড়ি এলাকায় চিতা বাঘ পাওয়া যায়, তবে এই প্রাণী বর্তমানে বিলুপ্তির পথে। জাতীয় চিড়িয়াখানায় বর্তমানে কোনো চিতা বাঘ নেই। এই চারটি চিতা বাঘ আনা হচ্ছে যাতে বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে তাদের সংরক্ষণ করা যায়। এছাড়া দর্শনার্থীদের কাছে চিতা বাঘ অত্যন্ত আকর্ষণীয় একটি প্রাণী।
একটি চিতা ছিল, আর চিতা বাঘ এক নয়। চিতা পৃথিবীর দ্রুততম স্তন্যপায়ী প্রাণী। চিতার মতো দ্রুত নয় চিতা বাঘ, তবে চিতার চেয়ে চিতা বাঘ বেশি শক্তিশালী। শিকার ধরার পর তা গাছেও তুলতে পারে চিতা বাঘ। মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানায় আগে একটি চিতা ছিল, যা প্রায় দুই বছর আগে মারা যায়। সেই চিতা হেমোরেজিক এন্টারাইটিস রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিল।
রোগ ও প্রতিরোধ
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানায়, হেমোরেজিক এন্টারাইটিস এক ধরনের জীবাণুবাহিত রোগ। এই রোগে আক্রান্ত হলে শরীরের ভেতরে রক্তক্ষরণ হয়ে প্রাণী মারা যায়। ওই চিতার ক্ষেত্রেও তা ঘটেছিল। এই রোগের জীবাণু মূলত মাটি থেকে ছড়ায়। চিতা বা চিতা বাঘ মাটি থেকে খাবার তুলে খাওয়ার সময় জীবাণু শরীরে প্রবেশ করতে পারে। তবে শরীরে প্রবেশের সঙ্গেই রোগ তৈরি হয় না; হঠাৎ ভারী বৃষ্টি বা প্রচণ্ড গরমের মতো পরিস্থিতিতে প্রাণী যখন চাপের সম্মুখীন হয়, তখন রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায় এবং জীবাণু আক্রমণ করে রোগ তৈরি করতে পারে।
চিড়িয়াখানা সূত্রে জানা গেছে, চিতাকে যে খাঁচায় রাখা হয়েছিল, সেখানেই নতুন চিতা বাঘগুলো রাখা হবে। বর্তমানে সেই খাঁচা সংস্কার করা হচ্ছে। ওই খাঁচার মাটির ওপরের ছয় ইঞ্চি তুলে ফেলা হবে এবং নতুন মাটি দেওয়া হবে, যাতে জীবাণু না থাকে।
অন্যান্য প্রাণীও আসছে
চিতা বাঘের সঙ্গে ওয়াইল্ড বিস্ট ও কমন ইল্যান্ডও কেনা হচ্ছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ফ্যালকন ট্রেডার্স এই প্রাণীগুলোও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে সরবরাহ করবে। ওয়াইল্ড বিস্ট কেনা হচ্ছে মোট দুটি, যার মধ্যে একটি পুরুষ ও একটি স্ত্রী। জাতীয় চিড়িয়াখানায় বর্তমানে দুটি স্ত্রী ওয়াইল্ড বিস্ট আছে। নতুন দুটি যুক্ত হলে মোট ওয়াইল্ড বিস্টের সংখ্যা হবে চার, যার মধ্যে তিনটি স্ত্রী এবং একটি পুরুষ। নতুন দুটি ওয়াইল্ড বিস্ট কিনতে খরচ হচ্ছে ১১ লাখ ৯১ হাজার টাকা।
কমন ইল্যান্ড কেনা হচ্ছে দুটি, যার একটি পুরুষ ও অন্যটি স্ত্রী। এতে খরচ হচ্ছে ৩৩ লাখ ৯৪ হাজার টাকা।
বিদেশ থেকে প্রাণী আমদানির কারণ
জাতীয় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ ২০২২ সালে সর্বশেষ প্রাণী কিনেছিল। প্রায় চার বছর পর আবারও প্রাণী কেনা হচ্ছে। পরিচালক রফিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, আইন অনুযায়ী দেশীয় প্রজাতির প্রাণী বন থেকে ধরা, পরিবহন বা বিপণন নিষিদ্ধ। তাই চিড়িয়াখানার জন্য দেশীয় প্রজাতির প্রাণী সংগ্রহ করা কঠিন। বন বিভাগ বা সাফারি পার্ক যদি কোনো দেশি প্রাণী দেয়, তবে তা পাওয়া যায়; অন্যথায় সম্ভব নয়। ফলে দেশীয় প্রজাতির প্রাণীর প্রয়োজন হলেও তা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বে বহু প্রজাতির প্রাণী রয়েছে এবং দর্শনার্থীদের সামনে এই জীববৈচিত্র্য তুলে ধরতে হয়। বিদেশি প্রজাতির প্রাণী কেনা ছাড়া সংগ্রহের অন্য কোনো সুযোগ নেই। জাতীয় চিড়িয়াখানায় বর্তমানে বাঘ, জিরাফ, ময়ূরসহ অনেক প্রাণী বাচ্চা দেয়। কর্তৃপক্ষ জানায়, যে প্রাণী বাচ্চা দেয়, তাদের আর কিনতে হয় না। যেমন বাঘ, জিরাফ, ময়ূরের মতো অনেক প্রাণী এখন আর কেনা হয় না। চিড়িয়াখানায় যদি কোনো প্রাণী না থাকে বা বাচ্চা না দেয়, তখনই কেনার প্রয়োজন হয়।



