ছোট এক শান্ত গ্রাম ধলেশ্বরীপুর। এই গ্রামে থাকে তিন বন্ধু—আবদুল হাকিম, রাশেদ আর তাদের প্রতিবেশী প্রাইমারি স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক করিমউদ্দিন। পঞ্চাশ বছর বয়সী চিরকুমার আবদুল হাকিম পরিশ্রমী কৃষক। সব সময় হাসিমাখা মুখের বিনয়ী আবদুল হাকিম সবার কাছে হাকিম ভাই নামে পরিচিত। গ্রামে নতুন কেউ এলে তিনি নিজের নাম হাকিম ভাই বলে পরিচয় দেন। এই গ্রামে জন্ম ও বড় হওয়া রাশেদ। কয়েক বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে এখন এক আন্তর্জাতিক কীটনাশক কোম্পানির স্থানীয় প্রতিনিধি। আর গ্রামের সবার শ্রদ্ধার জ্ঞানী, শান্ত, দয়ালু প্রাইমারি স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক করিমউদ্দিন। তিনজনেরই এক স্বপ্ন—একদিন তারা একসঙ্গে হজ করবে। প্রতিদিন ফজরের নামাজ পড়ে গ্রামের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় এই তিন বন্ধুর কথা হয় তাদের স্বপ্নকে ঘিরে। ছয় বছর ধরে এই রুটিন বদলায়নি একটুও। এই অপেক্ষা—সময়ের কাঁটা যেন থেমে আছে—এক অজানা পবিত্র যাত্রার উদ্দেশ্যে।
হজের নিবন্ধন ও সিদ্ধান্ত
একদিন গ্রামের মসজিদে ঘোষণা হলো—‘এ বছর হজের জন্য নিবন্ধন শুরু হয়েছে।’ হাকিম ভাইয়ের বুক ধক করে উঠল। বহু বছর ধরে ধীরে ধীরে জমিয়ে রাখা টাকা এবার যথেষ্ট হয়েছে। রাশেদ বলল, ‘হাকিম ভাই, তুমি এবার হজে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে আমি তোমার সঙ্গে যাব। আমি চাই জীবনে প্রথম বড় যাত্রা হোক আল্লাহর ঘরে।’ করিমউদ্দিন মৃদু হেসে বললেন, ‘আমার বয়স হয়েছে, হাঁটতে কষ্ট হয়। কিন্তু যদি আল্লাহ ডাকেন, তাহলে আমি তোমাদের সঙ্গে না গিয়ে পারব না।’ তিনজনই সিদ্ধান্ত নিল তারা একসঙ্গে হজে যাবে এ বছরেই।
ঢাকা বিমানবন্দর থেকে মক্কায়
ঢাকা বিমানবন্দরের পাশে হাজী ক্যাম্পে ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে রাশেদের চোখে বিস্ময়। এত মানুষ, এত ব্যস্ততা—ইহরামের পোশাকে সবাই অভিন্ন উদ্দেশ্যে একই গন্তব্যে। হাকিম ভাই বললেন, ‘দেখো রাশেদ, হজ মানুষকে শেখায়—আমরা সবাই সমান। এখানে ধনী-গরিব, বড়-ছোট কিছু নেই।’ করিমউদ্দিন বললেন, ‘হজের আসল শিক্ষা হলো ত্যাগ আর ধৈর্য।’ বিমান আকাশে উঠতেই তিনজনের হৃদয় ভরে গেল এক অদ্ভুত শান্তিতে।
পবিত্র কাবার সান্নিধ্যে
মক্কায় পৌঁছে তারা পৃথিবীর প্রথম ঘর, আল্লাহ কর্তৃক সম্মানিত পবিত্র কাবা শরীফকে লক্ষ্য করে রওনা দিল। কিং আবদুল আজিজ গেট দিয়ে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক...’ তালবিয়া পড়তে পড়তে যখন তারা প্রবেশ করল—তখন এক অপ্রকাশ্য শিহরণ জেগে উঠল, যা অনুভব করা যায় হৃদয় দিয়ে। রাশেদ বলে উঠল ‘আল্লাহু আকবার’। স্বর্ণখচিত পবিত্র কোরআনের আয়াত সংবলিত কালো রঙের গিলাফে মোড়ানো পবিত্র কাবা ঘর যা এত দিন টেলিভিশনের পর্দায়, ছবিতে কিংবা শয়নে-স্বপনে দেখেছি—আজ তা আমাদের চোখের সামনে। করিমউদ্দিন বললেন, ‘প্রথমবারের মতো পবিত্র কাবা ঘর নজরে এলেই দাঁড়িয়ে যেতে হয়, দোয়া করতে হয়। এই সময় দোয়া কবুলের সময়।’ এরপর তিনি পবিত্র কাবার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ দোয়া করলেন—‘হে আল্লাহ, আমাদের এই যাত্রা কবুল করো। আমাদের অহংকার, ভুল, পাপ—সব মুছে দাও।’ হাকিম ভাইও আবেগ চেপে রাখতে পারলেন না। কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে তিনি বললেন, ‘এই সেই পবিত্র কাবা—যেদিকে তাকিয়ে পৃথিবীর কোটি কোটি মুসলিম পরম শ্রদ্ধায় নামাজ আদায় করে। আজ আমরা তার সন্নিকটে—যার টানে আমরা বহুদূর থেকে এসেছি।’ করিমউদ্দিন বললেন, ‘এই সেই পবিত্র কাবা—যার কথা স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বর্ণনা করেছেন।’
তাওয়াফ, সাঈ ও জমজম
ধীরে-ধীরে, হাঁটতে-হাঁটতে অন্যান্য সবার সঙ্গে তারা পৌঁছে যায় মসজিদুল হারামের গ্রাউন্ড ফ্লোর মাতাফে। কাবা শরিফ ঘিরে তাওয়াফ শেষে রাশেদ বলল, ‘হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে এখানে যেন পৃথিবীর সব মানুষ এক পরিবার।’ সাঈ করার সময় হাকিম ভাই বললেন, ‘হাজেরা (আ.)-এর দৌড়ের গল্প মনে আছে? তিনি সন্তানের জন্য পানি খুঁজতে দৌড়েছিলেন। আজ আমরা সেই স্মৃতি অনুসরণ করছি।’ রাশেদ মাথা নেড়ে বলল, ‘হজ শুধু ইবাদত নয়, ইতিহাসের জীবন্ত পাঠ।’ করিমউদ্দিন বললেন, ‘সাঈ শেষে জমজমের পানি পান করার আগে নিয়ত করে নেওয়া সুন্নত। এই পানি আল্লাহর দেয়া বিশেষ নিয়ামতের পানি এবং এই কারণেই ধরিত্রীর বিশুদ্ধতম পানীয়। প্রিয় নবী রাসুলুল্লাহ (সা.) এই পানিকে পৃথিবীর উৎকৃষ্টতম পানি বলে আখ্যা দিয়ে বলেছেন—‘ভূপৃষ্ঠের মধ্যে সর্বোত্তম পানি জমজমের পানি, তাতে ক্ষুধার্ত ব্যক্তির খাদ্য ও অসুস্থ ব্যক্তির আরোগ্য রয়েছে।’
মিনায় অবস্থান ও সালেহ সাহেবের সাক্ষাৎ
মিনায় পৌঁছে তারা তাঁবুতে এল। চারদিকে হাজার হাজার মানুষ। কেউ পবিত্র কোরআন শরিফ পড়ছেন, কেউ দোয়া করছেন, কেউ বিশ্রাম নিচ্ছেন। রাশেদ বলল, ‘এত মানুষ, কিন্তু সবাই শান্ত। এটা কীভাবে সম্ভব?’ করিমউদ্দিন বললেন, ‘কারণ এখানে সবাই আল্লাহর মেহমান। মেহমানরা কেউ কারও সঙ্গে ঝগড়া করে না।’ রাতে তাঁরা তিনজন একসঙ্গে বসে নিজেদের জীবনের ভুল, দুঃখ আর আশা নিয়ে কথা বলল। তাঁদের মনে হলো হজ শুধু শরীরের ভ্রমণ নয়, আত্মারও যাত্রা। মিনার তাঁবুতে থাকার সময় হাকিম ভাই, রাশেদ ও করিমউদ্দিনের পাশের তাঁবুতে ছিলেন এক বৃদ্ধ মানুষ—সালেহ সাহেব। বয়স প্রায় সত্তর। হাঁটতে কষ্ট হয়। কিন্তু তাঁর চোখে ছিল অদম্য ইচ্ছাশক্তি। আলাপচারিতায় রাশেদ জানল—সালেহ সাহেব বহু বছর ধরে হজে আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শরীর খারাপ থাকায় পারছিলেন না। এবার ডাক্তার বলেছেন—‘যদি হজে যেতে চান তবে এখনই যান।’ এই কথা শুনে করিমউদ্দিন মৃদু হেসে বললেন—‘আল্লাহ যাকে ডাকেন, তাকে পথও করে দেন।’
আরাফার দিন ও সাহায্যের হাত
হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন—আরাফা। মাথার ওপরে সূর্য, ৪৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা। কিন্তু বাতাসে অদ্ভুত শান্তি। হাকিম ভাই, রাশেদ, করিমউদ্দিন চোখ বন্ধ করে লাখো মানুষের সঙ্গে হাত তুলে পরম করুনাময় আল্লাহর কাছে দোয়া করল। করিমউদ্দিনের চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল—‘হে আল্লাহ, আমার জীবনের শেষ সময় যেন তোমার সন্তুষ্টিতে কাটে।’ আরাফার দিন সালেহ সাহেবের হাঁটতে খুব কষ্ট হলো। ভিড়ের মধ্যে তিনি বারবার থেমে যাচ্ছিলেন। হাকিম ভাই এগিয়ে এসে বললেন, ‘চাচা, আপনি আমার কাঁধে ভর দিন।’ রাশেদ পানির বোতল দিয়ে বলল, ‘চাচা, গরম অনেক বেশি, একটু পানি খান।’ সালেহ সাহেব কাঁপা কণ্ঠে বললেন, ‘বাবারা, তোমরা না থাকলে আজ আমি দাঁড়াতেই পারতাম না।’ করিমউদ্দিন বললেন, ‘হজ শুধু নিজের ইবাদত নয়, অন্যকে সাহায্য করাও ইবাদত।’ সালেহ সাহেব হেসে বললেন, ‘আজ আমি বুঝলাম, মানুষের আসল শক্তি তার দেহে নয়, তার ঈমানে।’
মুজদালিফা ও কঙ্কর নিক্ষেপ
মসজিদে নামিরাহ থেকে হজের খুতবা দেন সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি। খুতবার পর জোহর ও আসরের নামাজ আদায় করে, সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফা ময়দানে অবস্থানের পর, বাসে করে মুজদালিফায় পৌঁছায় তারা। রাতে মুজদালিফায় গিয়ে খোলা আকাশের নিচে হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে ঘুমানোর আগে মুজদালিফা থেকে কঙ্কর সংগ্রহ করল আগামীকাল শয়তানকে প্রতীকীভাবে প্রতিহত করার জন্য। করিমউদ্দিন বললেন, ‘এ কঙ্করগুলো শুধু পাথর নয়, এগুলো আমাদের রাগ, লোভ, অহংকারের প্রতীক।’ রাশেদ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আজকের রাতে আকাশে এত তারা, মনে হচ্ছে আল্লাহ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন। এটা যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পারিবারিক মিলন।’ পরদিন তাঁরা জামারাতে গিয়ে কঙ্কর নিক্ষেপ করল। হাকিম ভাই বললেন, ‘এটা যেন নিজের ভেতরের খারাপ দিকগুলোকে দূর করা।’ রাশেদ অনুভব করল তার ভেতরের অনেক অন্ধকার যেন হালকা হয়ে যাচ্ছে।
মিনা থেকে বিদায় ও মদিনায় যাত্রা
মিনা ক্যাম্পে মাত্র চার রাত অবস্থানের শেষে ক্যাম্প থেকে বিদায় নেওয়ার সময় রাশেদ বলল, ‘এই সংক্ষিপ্ত সময়ে আমি ধর্মীয় অনেক ঐতিহাসিক তথ্য ও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আহরণের পাশাপাশি মূল্যবান অনেক কিছু শিখেছি, যা আমার ধ্যান ও জ্ঞানের হরাইজনকে আরও প্রসারিত করেছে।’ হজের কার্যক্রম শেষে হাজিরা কেউ দেশে ফেরার কিংবা কেউ মদিনাতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। হাকিম ভাই, রাশেদ আর করিমউদ্দিন মক্কা থেকে ৪৫৩ কিমি দূরত্বে মদিনা শহরে যাবে। সালেহ সাহেব হজের আগে মদিনাতে গিয়েছিলেন। তাই তিনি দেশ ফিরবেন। সালেহ সাহেব বললেন, ‘আপনাদের সঙ্গে পরিচয় হওয়া আমার জন্য বড় সৌভাগ্যের।’ হাকিম ভাই বললেন, ‘আমরা তো একসঙ্গে হজ করেছি। এখন আমরা আত্মার আত্মীয়।’ সালেহ সাহেব রাশেদের হাত ধরে বললেন, ‘বাবা, তুমি আমার ছেলের মতো। আল্লাহ তোমাকে অনেক বড় করবে।’ চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া পানি সামলিয়ে নিয়ে রাশেদ বলল, ‘চাচা, আপনার সঙ্গে দেখা হওয়া আমার জীবনের বড় উপহার।’
মদিনা ও দেশে ফেরা
মক্কার পবিত্র কাবার তুলনায় মদিনার মসজিদে নববিতে মানুষের ভিড় তুলনামূলকভাবে কম থাকে। এখানে নেই কোনো তাড়াহুড়া, ছোটাছুটি—এক প্রশান্তিময় পরিবেশ। মুসলিম উম্মাহর প্রিয় নবী রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র রওজা শরিফ জিয়ারত, ‘রিয়াজুল জান্নাত’-এ সুন্নত নামাজ আদায়, জান্নাতুল বাকিসহ ইসলামের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ও স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো পরিদর্শন শেষে হাকিম ভাই, রাশেদ এবং করিমউদ্দিন নিরাপদে দেশে ফিরে আসেন। ধলেশ্বরীপুর গ্রামে—এই প্রথম একসঙ্গে তিনজন পবিত্র হজ পালন শেষে দেশে ফিরে এসেছেন। গ্রামের মানুষের আনন্দের সীমা নেই। গ্রামবাসী সবাই হাকিম ভাই, রাশেদ আর করিমউদ্দিন—তিনজন হাজী সাহেবদের ফুল দিয়ে সাদর অভ্যর্থনা জানিয়েছে।
গ্রামে ফিরে শিক্ষা ও উপলব্ধি
আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে—করিমউদ্দিন গ্রামবাসীকে বললেন—‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে—আমরা সবাই হজের প্রতিটি কার্যক্রম সুচারুরূপে, নির্ভুলভাবে পালন করার চেষ্টা করেছি। হজে আর্থিক ও কায়িক শ্রমের সমন্বয় রয়েছে। প্রখর রোদে দৈনিক গড়ে ৫-১০ কিলোমিটার হাঁটা, মসজিদুল হারামে প্রবেশের দরজায়, এস্কেলেটরে, মিনা ক্যাম্পে, মুজদালিফায় বিভিন্ন সময়ে বাসে ওঠার জন্য অসংখ্যবার লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে সবাই হজে সৌদি আরবে আসা-যাওয়া ও থাকাকালীন পুরো সময়টাতেই ধৈর্যের নানা রকম পরীক্ষা দেন, যা ইবাদতের সমতুল্য।’ হাকিম ভাই বললেন, ‘হজে এসে শিখেছি, “সাবরান জামিলান” (সুন্দর ধৈর্য)।’ রাশেদ বলল, ‘শুনেছি মহান আল্লাহর কাছে কবুল হওয়া হজের একমাত্র পুরস্কার জান্নাত, তাঁর আমন্ত্রিত মেহমানদের জন্য।’
(প্রিয় পাঠক/পাঠিকা—আজকের গল্প নিতান্তই কাল্পনিক। বাস্তবের সঙ্গে নামের, চরিত্রের কিংবা ঘটনার মিল নিছক কাকতালীয়।)
লেখক: মাসুদ পারভেজ, সিডনি, অস্ট্রেলিয়া



