ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে আগামী ৬ জুন ভারতে ফিরছেন। তিনি দেশে ফিরে নিট বা ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্টের প্রশ্নপত্র ফাঁস কেলেঙ্কারির জন্য কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তুলবেন। সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ভিডিও বার্তায় তিনি নিজেই এই তথ্য জানিয়েছেন।
ককরোচ জনতা পার্টির উত্থান
অভিজিৎ দীপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ গঠন করে সাড়া ফেলেছেন। বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলেন তারা। এবার আর শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নয়, সংবিধান মেনে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ময়দানে নেমে আন্দোলন গড়ে তুলতে চান তারা। সেই উদ্দেশ্যেই অভিজিৎ দেশে ফেরার কথা জানিয়েছেন।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে পাবলিক রিলেশনস বিষয়ে স্নাতকোত্তর করছেন। ৩০ বছর বয়সী এই তরুণ পুনে থেকে সাংবাদিকতায় স্নাতক করেছেন। তাঁর মা-বাবা ভারতের মহারাষ্ট্রে বসবাস করেন। ছত্রপতি সম্ভাজিনগরে তাঁদের বাসভবনের বাইরে সার্বক্ষণিক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
সিজেপির ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডলে আজ অভিজিৎ বলেন, ‘আমাদের সবার একজোট হওয়ার সময় এসেছে। সংবিধান মেনে শান্তিপূর্ণভাবে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করব আমরা। সংঘবদ্ধ হয়ে আমরা জোরাল দাবি তুললে তারা তা শুনতে বাধ্য হবে।’
ভিডিও বার্তায় পরিকল্পনা
ভিডিও বার্তায় সিজেপির নেতা বলেন, ‘আগামী শনিবার (৬ জুন) সকালে আমি দিল্লি আসব, ঠিক করেছি। আপনারা অনুগ্রহ করে দিল্লি বিমানবন্দরেই মিলিত হোন। সবাই মিলে আমরা পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় যাব। যন্তর-মন্তরে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ সমাবেশ করার অনুমতি চাইব।’
নিট বা ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট একমাত্র সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষা। এই পরীক্ষার মাধ্যমেই শিক্ষার্থীরা দেশের সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে ভর্তির যোগ্যতা অর্জন করে। এই পরীক্ষারই প্রশ্নপত্র সম্প্রতি ফাঁস হয়েছে। অকুল পাথারে পড়েছেন লাখ লাখ শিক্ষার্থী।
এ ঘটনাকে ঘিরে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জোরালো দাবি উঠেছে। বিরোধীরা দাবি তুলেছেন। ককরোচ বা তেলাপোকা পার্টিও। সিজেপির দাবিতে আট লাখ মানুষ সম্মতি দিয়েছেন, তা সত্ত্বেও শিক্ষামন্ত্রী দায় গ্রহণ করেননি। ককরোচ বা তেলাপোকারা তাই ঠিক করেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছেড়ে বেরিয়ে পথে নেমে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে শামিল হবেন।
এই কথাই অভিজিৎ বলেছেন তাঁর ভিডিও বার্তায়। বলেন, ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার কারণে বহু শিক্ষার্থী আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। লাখ লাখ ছাত্রের পরিশ্রম বৃথা। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে সই করেছেন আট লাখ ককরোচ বা তেলাপোকা। কোটি কোটি মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের দাবি সমর্থনও করেছেন। মহারাষ্ট্র, লক্ষ্ণৌ, জয়পুরসহ বহু স্থানে মানুষ বিক্ষোভও দেখাচ্ছেন।’
প্রধান বিচারপতির মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়া
অভিজিৎ বলেন, মানুষ প্রতিবাদে সরব থাকলেও সরকার নির্বিকার। বিভিন্ন পরীক্ষার এক কোটি ছাত্রছাত্রীর জীবন আজ কৌতুকে পরিণত। শিক্ষার্থীরা তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। কাউকে এর দায় নিতে হবে।
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত সম্প্রতি এক মামলার শুনানিতে দেশের তরুণ সমাজের একাংশের প্রতি বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেন, এক শ্রেণির তরুণ রয়েছেন, যাঁরা কোথাও কিছুই করতে পারেননি। কোনো পেশায় জায়গা করে নিতে পারেননি। কোনো কাজ জোগাড় করতে পারেননি। তাঁদের কেউ সাংবাদিক হয়েছেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকে গেছেন, কেউ আইন পেশায়, কেউ বা তথ্য জানার অধিকার আন্দোলনের কর্মী। প্রধান বিচারপতি এই তরুণদের ‘পরজীবী ও তেলাপোকা’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।
এই মন্তব্যের পরই অভিজিৎ দীপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জন্ম দেন ককরোচ জনতা পার্টির। ব্যঙ্গাত্মকধর্মী কণ্ঠস্বর হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গড়ে ওঠে এক অভূতপূর্ব আন্দোলন। কয়েক দিনের মধ্যেই সিজেপির ‘এক্স’ হ্যান্ডলে সদস্যসংখ্যা দুই লাখ ছাড়িয়ে যায়। ইনস্টাগ্রামে অনুসারীর সংখ্যা হয় দুই কোটি। দিকে দিকে গড়ে ওঠে তেলাপোকাদের ব্যঙ্গাত্মক সংগঠন। তৈরি হতে থাকে হাজার হাজার মিম।
সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ও হুমকি
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এই সামাজিক আন্দোলনের পেছনে পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী জর্জ সোরসের হাত দেখতে পাচ্ছে। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, এই আন্দোলনের লক্ষ্য হলো ভারত সরকারের বিরোধিতা করা। সরকারকে দুর্বল করে তোলা। সেই জন্য জনমত সংগ্রহ করা। আধুনিক প্রজন্মকে সরকারের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলা।
গত সপ্তাহে সিজেপির ‘এক্স’ অ্যাকাউন্ট স্থগিত করে দেওয়া হয়। অভিজিৎ দীপকে ও ভারতে বসবাসকারী তাঁর পরিবারের সদস্যদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হতে থাকে। অভিজিৎ নিজেই শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, দেশে ফিরলে সম্ভবত তাঁর স্থান হবে তিহার জেল। তবুও তিনি দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সরেজমিন সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরুর আহ্বান জানিয়েছেন। এখন দেখার, ৬ জুন দিল্লি অবতরণের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর আশঙ্কা সত্য প্রমাণিত হয় কি না।



