ছোট্ট একটি ভ্যান। রাজধানীর বনশ্রীর জি ব্লকের ৪ নম্বর সড়কে হাজী নূর বানু জামে মসজিদ, যার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকে প্রতিদিন। ভ্যানজুড়ে সাজানো থাকে নানা ধরনের মৌসুমি শাক। আর সেই ভ্যান ঘিরেই গড়ে উঠেছে হেলালের জীবনের গল্প—সংগ্রাম, দায়িত্ব আর বেঁচে থাকার লড়াইয়ের সাতকাহন।
এক যুগের অটুট অবস্থান
প্রায় ১২-১৪ বছর ধরে একই জায়গায় ভ্যান নিয়ে বসছেন তিনি। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত শাক বিক্রি করেন। শীতের কুয়াশা, গ্রীষ্মের তাপ কিংবা বর্ষার বৃষ্টি—কোনও কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। প্রতিদিনের মতো ভ্যান সাজিয়ে বেরিয়ে পড়েন জীবিকার টানে।
শুক্রবার কথা হয় হেলালের সঙ্গে। তখন উঠে আসে তার দীর্ঘদিনের সংগ্রাম আর জীবনের না বলা অনেক গল্প।
পরিবারের ভরসা এই ভ্যান
হেলাল বলেন, এই শাকের ভ্যানই তার পরিবারের ভরসা। ভ্যানের আয় দিয়েই চলছে সংসার, ছেলে ও মেয়ের পড়াশোনা। এই সীমিত আয়ের মধ্যেও সন্তানদের মানুষ করার স্বপ্ন ছাড়েননি তিনি।
প্রায় ২৭–২৮ বছর আগে জামালপুর সদর থেকে ঢাকায় পাড়ি জমান হেলাল। পরিচিতজনদের সহায়তায় উঠে আসেন নন্দীপাড়ার কাজী বাড়ী এলাকায়। এরপর থেকে সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।
শুরুতে দিনমজুরের কাজ করলেও পরে স্ত্রী মাজেদা বেগমের পরামর্শে শুরু করেন শাকের ব্যবসা। সেই ছোট্ট শুরুই এখন তার জীবনের স্থায়ী জীবিকা—আজও একইভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন এই কাজ।
স্বামী-স্ত্রীর সম্মিলিত প্রচেষ্টা
হেলাল জানান, তার স্ত্রীও এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। হেলাল এই এলাকায় ব্যবসা পরিচালনা করলেও তার স্ত্রী কাজী বাড়ী এলাকায় বসেন। দুজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই টিকে আছে সংসার। এগিয়ে চলছে সন্তানদের পড়াশোনাও।
হেলাল আরও জানান, তাদের সংসারে এক ছেলে মিজানুর রহমান এবং এক মেয়ে মিমিয়া খাতুন রয়েছে। ছেলে এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে, আর মেয়ে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী।
তিনি বলেন, “এই ভ্যানই আমাদের টিকিয়ে রেখেছে। সংসারের খরচ, ছেলের কোচিং, মেয়ের প্রাইভেট, বাড়িভাড়া, থাকা-খাওয়া, চিকিৎসা—সব খরচই এই ভ্যানের আয় থেকেই হয়।”
স্বামী-স্ত্রী মিলে শাক বিক্রি করে প্রতিদিন প্রায় এক থেকে দেড়-দুই হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ হয় বলেও জানান তিনি। এই আয়ের মাধ্যমেই তাদের ছোট্ট সংসার কোনোভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।
রাত জেগে কিনে আনেন শাক
তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন রাত ১০–১১টার দিকে ঘর থেকে বের হন, যান যাত্রাবাড়ী বা রায়ের বাজারে। সেখান থেকে শাক কিনে ফিরতে ফিরতে ভোর কিংবা সকাল হয়ে যায়।
এরপর ভ্যানে শাক সাজিয়ে মসজিদের সামনে বসেন এবং বিক্রি চলে দুপুর পর্যন্ত। কাজ শেষে বাসায় ফিরে গোসল করে কিছুটা বিশ্রাম নেন। আবার রাতে উঠে পড়েন পরের দিনের প্রস্তুতির জন্য।
এভাবেই একই রুটিনে কেটে যাচ্ছে তার প্রায় এক যুগের জীবন—দিনের পর দিন একই সংগ্রাম, একই পরিশ্রম।
স্থানীয়দের কাছে পরিচিত মুখ
এদিকে স্থানীয়রাও জানান, হেলাল দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় শাক বিক্রি করছেন। আশপাশের বাসিন্দারাই মূলত তার নিয়মিত ক্রেতা।
সেলিম নামের এক বাসিন্দা বলেন, “আমরা হেলালের কাছ থেকেই শাক কিনি। তিনি অনেক বছর ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তার শাকগুলো ভালো মানের হওয়ায় সবাই তার কাছ থেকেই কিনতে পছন্দ করে।”
অন্যদিকে জসিম উদ্দীন নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, “আমি বহুদিন ধরে দেখছি হেলাল এখানে শাক নিয়ে বসে থাকেন। সবাই তাকে পছন্দ করে। তার কাছে প্রায় সব রকমের মৌসুমি শাক পাওয়া যায়। শাক বিক্রেতা হিসেবে তিনি এলাকায় বেশ পরিচিত।”



