রাজারবাগে পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর: ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী
ঢাকার রাজারবাগে অবস্থিত পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে পুলিশ বাহিনীর অমূল্য অবদানের একটি প্রাণবন্ত দলিল। এই জাদুঘরটি কেবলমাত্র ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের স্মারকই নয়, বরং ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে কীভাবে বাংলাদেশ পুলিশ বিবর্তিত হয়েছে, তারও একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস উপস্থাপন করে।
প্রথম প্রতিরোধের ঐতিহাসিক মুহূর্ত
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত সাড়ে ১১টায়, ঢাকার রাজারবাগে তৎকালীন পুলিশের কেন্দ্রীয় ওয়্যারলেস বেজ স্টেশন থেকে বেতার অপারেটর শাহজাহান মিয়া সারা দেশে একটি জরুরি বার্তা প্রেরণ করেন। তিনি বলেছিলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান পুলিশের সব বেজ স্টেশনকে সতর্ক করা হচ্ছে যে পাক সেনাবাহিনী আমাদের আক্রমণ করেছে। নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন।’ এই বার্তাই ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের প্রথম সরকারি সতর্কবার্তা, যা সারা দেশে পুলিশ সদস্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল।
শাহজাহান মিয়া যে ‘হেলিকপ্টার ব্যাজ’ মডেলের বেতারযন্ত্র ব্যবহার করেছিলেন, তা আজও জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। এই যন্ত্রটি মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। সেই রাতেই রাজারবাগ পুলিশ লাইনস থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। শাহজাহান মিয়া পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স ভবনের ছাদে অবস্থান নিয়ে এই প্রতিরোধযুদ্ধে অংশ নেন এবং পরে আটক হন, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।
পাগলা ঘণ্টা ও ঐক্যের আহ্বান
২৫ মার্চ রাতেই, তৎকালীন পুলিশ মহাপরিদর্শকের বডিগার্ড আবদুল আলী ‘পাগলা ঘণ্টা’ বাজিয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পুলিশ সদস্যদের একত্র করেন। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে পুলিশ সদস্যরা অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে সালামি গার্ডে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেন এবং প্রতিরোধের প্রস্তুতি নেন। এই ঐতিহাসিক পাগলা ঘণ্টাটিও জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে, যা ঐক্য ও সংগ্রামের প্রতীক হয়ে আছে।
জাদুঘরের সংগ্রহ ও প্রদর্শনী
পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত নানা ধরনের অস্ত্র সংরক্ষণ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে:
- এসএমজি, এলএমজি, মেশিনগান, রাইফেল
- রিভলবার, বন্দুক, শটগান, বেয়োনেট
- ব্রিটিশ আমলের পুলিশ অস্ত্র ও সরঞ্জাম
এছাড়াও, শহীদ পুলিশ সদস্যদের ব্যক্তিগত সামগ্রী, যেমন পুলিশ সুপার শাহ আবদুল মজিদের ব্লেজার ও প্যান্ট, ডিআইজি মামুন মাহমুদের বেল্ট ও লাঠি, এবং অন্যান্য ইউনিফর্ম, চশমা, হাতে লেখা বার্তা ও আলোকচিত্র প্রদর্শিত হচ্ছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের ব্যবহৃত রিভলবারও এখানে সংরক্ষিত আছে।
ঐতিহাসিক দলিল ও স্মারক
জাদুঘরে মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ দলিলও রাখা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর, প্রায় ১৪ হাজার পুলিশ সদস্য কর্মস্থল ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তখন আইজিপি আবদুল খালেক একটি চিঠির মাধ্যমে পুলিশ সদস্যদের মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার এবং দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত কর্মস্থলে যোগ না দেওয়ার আহ্বান জানান। এই ঐতিহাসিক চিঠিটি জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে, যা পুলিশ বাহিনীর দৃঢ় প্রত্যয়ের নিদর্শন।
দেয়ালচিত্র ও বর্বরতার ইতিহাস
জাদুঘরের দেয়ালে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধের বিবরণ, পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ ও বর্বরতার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। একটি লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে, ২৫ মার্চ রাতে ডন স্কুলের ওপর থেকে ছোড়া প্রথম বুলেটটি একটি পাকিস্তানি সৈনিককে আঘাত করে, যা ছিল স্বাধীনতার সশস্ত্র প্রতিরোধের সূচনা। পরে পুলিশের গোলাবারুদ ফুরিয়ে গেলে পাকিস্তানি বাহিনী রাজারবাগ দখল করে, ব্যাপক লুটপাট ও নির্যাতন চালায়, এবং অনেক পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে।
দেয়ালে রমনা থানা, বংশাল থানা, বাবুপুরা পুলিশ ফাঁড়ি ও কোতোয়ালি থানায় পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের ইতিহাসও বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। একটি লেখায় ‘নির্বিচারে পুলিশ হত্যা’ শিরোনামে উল্লেখ করা হয়েছে, কীভাবে পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতাল থেকে পুলিশ সদস্যদের বিকৃত লাশ সংগ্রহ করা হয়েছিল।
জাদুঘর পরিদর্শনের তথ্য
পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরটি ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে পুলিশ স্মৃতিস্তম্ভের পাশে অবস্থিত। এটি ২০১৭ সালের ২৩ জানুয়ারি উদ্বোধন করা হয়। জাদুঘরটি সপ্তাহের বুধবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ১০টায় খোলা হয়। মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর মাসে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এবং অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। দিনে বেলা ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত এক ঘণ্টার জন্য বন্ধ থাকে। জাদুঘরের দায়িত্বপ্রাপ্ত এসআই আহসান হাবীব দর্শনার্থীদেরকে ইতিহাস সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেন।
এই জাদুঘরটি নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং পুলিশ বাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা সংরক্ষণের একটি অনন্য উদ্যোগ। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্যন্ত পুলিশের বিবর্তন ও অবদান এখানে জীবন্ত হয়ে উঠেছে, যা জাতির জন্য একটি অমূল্য শিক্ষণীয় সম্পদ।



