ঠাকুরগাঁওয়ে স্টাডি গ্রুপের অভিনব উদ্যোগ: দল বেঁধে চাকরির প্রস্তুতিতে সাফল্য
ঠাকুরগাঁও শহরের সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের বড় মাঠে একটি অস্বাভাবিক দৃশ্য। রোববার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে, 'এক-এ তিন, দুই-এ দুই, তিন-এ এক, চার-এ চার, পাঁচ-এ তিন, ছয়-এ ...'—এমন ছন্দময় কণ্ঠস্বর শুনে পথচারীরা থমকে দাঁড়ান। লোহার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখা যায়, ৬০ জনের একটি দল ফুটপাতে বসে বা দাঁড়িয়ে বহুনির্বাচনী প্রশ্নের উত্তরপত্র হাতে নিয়ে ব্যস্ত। তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে একজন সঠিক উত্তর বলে দিচ্ছেন, আর বাকিরা তা নিজেদের উত্তরপত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নিচ্ছেন। এটি কোনো সাধারণ পড়াশোনার দৃশ্য নয়, বরং চাকরিপ্রত্যাশীদের একটি স্টাডি গ্রুপের প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষার অংশ।
গ্রুপের উৎপত্তি ও বিকাশ
এই স্টাডি গ্রুপের মূল দায়িত্বে আছেন জপেন চন্দ্র, যিনি কারমাইকেল কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর পাস করে এখন বাংলাদেশ রেলওয়েতে চাকরি করছেন। ২০১৯ সালে স্নাতকোত্তর শেষে চাকরি খোঁজার সময় আর্থিক সংকটের কারণে প্রস্তুতি নিতে অসুবিধা হলে, জপেন ও তাঁর কয়েকজন বন্ধু মিলে দল বেঁধে পড়াশোনার ধারণা নিয়ে আসেন। শুরুতে সদস্যসংখ্যা ছিল মাত্র ৭-৮ জন, কিন্তু ধীরে ধীরে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের স্নাতকদের যোগদানের মাধ্যমে দলটি বড় হতে থাকে। বর্তমানে গ্রুপে ৬৫ জন সদস্য রয়েছেন, যাদের মধ্যে নিয়মিত ৫০ থেকে ৫৫ জন পরীক্ষায় অংশ নেন।
প্রস্তুতির পদ্ধতি ও কার্যক্রম
গ্রুপটি যখন যে নিয়োগ পরীক্ষার মুখোমুখি হয়, তখন সেই পরীক্ষার আলোকে অভিজ্ঞ সদস্যদের পরামর্শে সিলেবাস তৈরি করা হয়। সপ্তাহের রোববার, মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার মূল্যায়ন পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়, আর বাকি দিনগুলোতে চলে প্রস্তুতিমূলক পড়াশোনা। পরীক্ষার জন্য পর্যায়ক্রমে একজন সদস্য প্রশ্নপত্র তৈরির দায়িত্ব নেন, যেখানে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে মোট ৯০টি বহুনির্বাচনী প্রশ্ন থাকে। প্রশ্নপত্র তৈরিতে সদস্যরা প্রতি মাসে ২০০ টাকা করে চাঁদা দেন, যা দিয়ে প্রশ্ন কম্পোজ, ফটোকপি, পুরস্কার কেনা এবং কখনো কখনো হালকা নাশতার ব্যবস্থা করা হয়।
সাফল্যের গল্প
এই স্টাডি গ্রুপ থেকে ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সদস্য চাকরি পেয়েছেন। জপেন চন্দ্রের মতে, দলটি থেকে নিবন্ধন পরীক্ষায় পাস করে তিনজন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চাকরি করছেন, এবং সমাজসেবা অধিদপ্তর, প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাংলাদেশ রেলওয়েসহ বিভিন্ন দপ্তরে মোট ৫০ জন নিয়োগ পেয়েছেন। বৃষ্টি রানী রায়, যিনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুপারিশ পেয়েছেন, বলেন, 'এখানে রুটিন অনুযায়ী পড়ালেখার পাশাপাশি পরীক্ষার প্রস্তুতি হয়ে যায়, এবং চর্চা করা প্রশ্নগুলো নিয়োগ পরীক্ষায় প্রায়ই আসে।' মো. সোহেলের মতো সদস্যরা একা পড়াশোনায় হতাশ ছিলেন, কিন্তু এখন গ্রুপে যোগ দিয়ে যেকোনো চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিতে আত্মবিশ্বাসী বোধ করছেন।
সম্প্রীতি ও সামাজিক বন্ধন
গ্রুপের কার্যক্রম শুধু পড়াশোনায় সীমাবদ্ধ নেই; সদস্যদের মধ্যে গড়ে উঠেছে গভীর বন্ধন। রতন রায়, যিনি জপেন চন্দ্রের অনুপস্থিতিতে দলটি পরিচালনা করছেন, বলেন যে একসঙ্গে রুটিনমাফিক পড়াশোনা করতে গিয়ে সদস্যরা একে অপরের বিপদে-আপদে সহযোগী হয়ে উঠেছেন। এমনকি সদস্যদের রক্তের গ্রুপের তালিকা তৈরি করা আছে, যাতে কারও রক্তের প্রয়োজন হলে দ্রুত সাহায্য করা যায়। ঠাকুরগাঁওয়ের প্রবীণ শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মনতোষ কুমার দে এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, 'দল বেঁধে পড়ালেখা তথ্য আদান-প্রদান ও জ্ঞানার্জনের কার্যকর কৌশল, যা চাকরিপ্রত্যাশীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং সফলতার দিকে নিয়ে যায়।'
এই স্টাডি গ্রুপের সাফল্য শুধু ঠাকুরগাঁওয়েই নয়, সারাদেশের চাকরিপ্রার্থীদের জন্য একটি অনুপ্রেরণাদায়ী মডেল হিসেবে কাজ করছে, যা প্রমাণ করে যে সমবায়ী প্রচেষ্টা ও পারস্পরিক সহযোগিতা চাকরির বাজারে সফলতার চাবিকাঠি হতে পারে।
