মনির হোসেনের সাক্ষাৎকারে উঠে এলো তরুণদের ধৈর্যের অভাব ও সিস্টেমের গুরুত্ব
মনির হোসেন: তরুণদের ধৈর্যের অভাব, সিস্টেমের গুরুত্ব

পডকাস্টে মনির হোসেন: তরুণদের ধৈর্যের অভাব, সিস্টেম গড়ার তাগিদ

প্রথম আলো ডটকম ও প্রাইম ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত বিশেষ পডকাস্ট শো ‘লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন–২’–এর পঞ্চম পর্বে অতিথি হিসেবে অংশ নিয়েছেন বিটোপিয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ মনির হোসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিদওয়ানুল হকের সঞ্চালনায় এই পর্বে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ‘ফ্রিল্যান্সিং থেকে সিস্টেম বিল্ডিং: বিটোপিয়ার বিবর্তন ও দক্ষ জনশক্তি নিয়ে ভাবনা।’

তরুণ প্রজন্মের শক্তি ও দুর্বলতা

মনির হোসেন বলেন, ‘এই প্রজন্মের তরুণরা খুব দ্রুত শিখতে পারে, তারা কুইক লার্নার। কিন্তু তাদের মধ্যে ধৈর্যের অভাব লক্ষ্য করা যায়। এই বিষয়ে তাদের উন্নতি করা জরুরি।’ তিনি জোর দেন যে বইয়ের শিক্ষার চেয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও দিকনির্দেশনা তরুণদের ক্যারিয়ার গঠনে বেশি সহায়ক।

ফ্রিল্যান্সিং থেকে প্রতিষ্ঠানের যাত্রা

মনির হোসেন তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন: ‘২০১৩ সালে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করি, কিন্তু প্রোফাইল সাসপেনশন ও অনিশ্চয়তা আমাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। দীর্ঘ সময় কাজ করার ফলে ব্যাক পেইনে ভুগি, যা আমার আয় ৫-৮ হাজার ডলার থেকে ৮০০ ডলারে নামিয়ে আনে। তখনই বুঝতে পারি, ব্যক্তিনির্ভর ফ্রিল্যান্সিং টেকসই নয়। তাই ২০১৭ সালে বিডিকলিং আইটি লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করি।’

তিনি ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ব্যবসা শেখার প্রক্রিয়া বর্ণনা করেন, যেখানে পিপল ম্যানেজমেন্ট, প্রসেস ডেভেলপমেন্ট ও ডেলিগেশনের দক্ষতা অর্জন করেন। কম্পিউটার সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ড ও কন্টিনিউয়াস লার্নিংয়ের মাধ্যমে তিনি জ্ঞান বৃদ্ধি করেন এবং বর্তমানে কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে সিনিয়র লিডারশিপ প্রোগ্রামে পড়াশোনা করছেন।

কোভিডকালীন প্রবৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

মনির হোসেন বলেন, ‘কোভিডের সময় ইউরোপ ও ইউএসএতে আউটসোর্সিংয়ের চাহিদা বেড়ে যায়, যা আমাদের কর্মীসংখ্যা ৩০ থেকে ৪০০ এ নিয়ে যায়। বর্তমানে আমাদের ৪ হাজার কর্মী আছে এবং আমরা ৮৫ হাজারের বেশি প্রজেক্ট সম্পন্ন করেছি।’ তিনি এই বৃদ্ধিকে একটি অসাধারণ অনুভূতি হিসেবে বর্ণনা করেন এবং টেকসই কিছু তৈরি করতে পেরে গর্ববোধ করেন।

বাংলাদেশে ট্যালেন্ট ও সিস্টেমের চ্যালেঞ্জ

মনির হোসেন জোর দিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশে ট্যালেন্টের অভাব নেই, অভাব আছে সিস্টেমের। মেধা বিকাশের জন্য সুযোগের অভাব রয়েছে। বিটোপিয়া গ্রুপ এই বৈষম্য দূর করতে কাজ করছে, যাতে বিশ্বমানের সুযোগ দেশের মেধাবীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়।’ তিনি ফ্রিল্যান্সারদের সামাজিক স্বীকৃতি ও ব্যাংক লোনের সুবিধা দেওয়ার আহ্বান জানান এবং আইটি কার্ডের মতো উদ্যোগকে প্রশংসা করেন।

টেকসই প্রতিষ্ঠান গড়ার পথে বাধা

মনির হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশে টেকসই অর্গানাইজেশন গড়ার সবচেয়ে বড় বাধা হলো উদ্যোক্তাদের অতিরিক্ত অপারেশনাল–নির্ভরতা। উদ্যোক্তাদের কৌশলগত নেতৃত্ব দেওয়া উচিত, দৈনন্দিন কাজে আটকে না থেকে। একটি সফল প্রতিষ্ঠান তখনই, যখন উদ্যোক্তার অনুপস্থিতিতেও সিস্টেম কাজ চালিয়ে যায়।’

ডাইভারসিফিকেশন ও এআইয়ের ভবিষ্যৎ

বিটোপিয়া গ্রুপের আইটি, এনার্জি, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও এআই সেক্টরে কাজ করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘একটি ঝুড়িতে সব ডিম রাখা ঝুঁকিপূর্ণ, তাই ডাইভারসিফিকেশন জরুরি।’ এআই সম্পর্কে তিনি মন্তব্য করেন, ‘এআই মানুষকে রিপ্লেস করবে না, বরং আরও শক্তিশালী করবে। তবে আমাদের দক্ষতা উন্নয়ন করতে হবে।’

মানবিকতার গুরুত্ব

আলোচনার শেষে মনির হোসেন বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে মানবিকতা থাকা আবশ্যক। কোনো কাজ করার আগে ভাবতে হবে এটি সমাজ ও দেশের জন্য ভালো কি না।’ এই পডকাস্ট পর্বটি গত শনিবার প্রথম আলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রচারিত হয়, যা তরুণ ও পেশাজীবীদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।