রাত দুইটায় ফোন বেজে উঠল। হয়তো কোথাও আগুন লেগেছে, হয়তো রাজনৈতিক কোনো নাটকীয় ঘটনা, কিংবা কোনো দুর্ঘটনা। ঘুম থেকে উঠে তড়িঘড়ি বেরিয়ে গেলেন তিনি। এদিকে ডাইনিং টেবিলে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে রাতের খাবার, অথবা পরিবারের সঙ্গে কাটানোর কথা ছিল যে সময়টা, সেটাও চলে গেল একটা ফোনকলের কাছে। এটাই সাংবাদিকদের জীবনের খুব পরিচিত দৃশ্য। তাই মাঝেমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন ওঠে—জীবনসঙ্গী হিসেবে সাংবাদিকরা কি সত্যিই আলাদা? কেউ বলেন, তারা সবচেয়ে ভালো সঙ্গী। আবার কেউ বলেন, তাদের সঙ্গে সংসার করা সবচেয়ে কঠিন। আসলে কোনটা সত্য?
সাংবাদিকতার অনিশ্চয়তা
সাংবাদিকতা এমন একটি পেশা, যেখানে নির্দিষ্ট অফিস টাইম অনেক সময় কাগজে-কলমেই থাকে। কাজটাই এখানে অনিশ্চয়তার আরেক নাম। সকালের পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে পারে দুপুরের একটি ঘটনা দিয়ে। ছুটির দিনে বের হতে হতে হঠাৎ ফোন আসতে পারে। গভীর রাতেও কাজ শুরু হয়ে যেতে পারে। এই অনিশ্চয়তা শুধু সাংবাদিকের জীবনে নয়, তার সম্পর্কেও প্রভাব ফেলে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কে স্থিতিশীল সময় ও নিয়মিত যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে এই দুটি জিনিসই অনেক সময় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
তবে কি সাংবাদিকরা খারাপ জীবনসঙ্গী?
বিষয়টা এত সহজ নয়। বরং সাংবাদিকদের পেশাগত কিছু বৈশিষ্ট্য সম্পর্কের জন্য ইতিবাচকও হতে পারে। প্রতিদিন নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে কথা বলা, ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা শোনা এবং মানুষের আবেগ-অনুভূতি বোঝার চেষ্টা—এসবের কারণে অনেক সাংবাদিকের যোগাযোগ দক্ষতা ও সহমর্মিতা তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সম্পর্কে টিকে থাকার ক্ষেত্রে খোলামেলা যোগাযোগ, সঙ্গীর অনুভূতি বোঝা এবং দ্বন্দ্ব সামাল দেওয়ার ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সাংবাদিকদের কাজের ধরন অনেক সময় এই দক্ষতাগুলো গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
কিন্তু এর উল্টো দিকও আছে
একজন সাংবাদিক দিনের পর দিন দুর্ঘটনা, সহিংসতা, রাজনৈতিক সংঘাত কিংবা মানবিক বিপর্যয়ের খবর নিয়ে কাজ করতে পারেন। এ ধরনের কাজ মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত ট্রমাটিক বা নেতিবাচক ঘটনার মুখোমুখি হন, তাদের মধ্যে মানসিক ক্লান্তি, উদ্বেগ কিংবা আবেগগত অবসাদ দেখা দেওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। ফলে বাসায় ফিরে তিনি হয়তো চুপচাপ থাকতে চাইবেন, কথা বলতে চাইবেন না, অথবা সম্পর্কের জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক শক্তিটুকুও সবসময় অবশিষ্ট নাও থাকতে পারে।
প্রেমে কি তারা বেশি রোমান্টিক?
এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর নেই। কারণ প্রেম বা সম্পর্কের সফলতা কোনো নির্দিষ্ট পেশা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। কেউ সাংবাদিক হয়েও অত্যন্ত যত্নশীল ও নিবেদিত সঙ্গী হতে পারেন। আবার কেউ পেশাগত চাপের কারণে সম্পর্কে সময় দিতে ব্যর্থও হতে পারেন। অর্থাৎ পেশা নয়, বরং মানুষটি কেমন—সেটাই শেষ পর্যন্ত বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে সামাজিক মাধ্যমে এমন কথা ভাইরাল হয় কেন?
‘জীবনসঙ্গী হিসেবে সাংবাদিকরাই সেরা’—এ ধরনের দাবি প্রায়ই ভাইরাল হয়। কিন্তু এ দাবির পক্ষে বড় আকারের, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণার তথ্য খুব একটা পাওয়া যায় না। বরং বিষয়টি অনেকটাই ধারণা, অভিজ্ঞতা এবং সাংবাদিকদের কিছু ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যকে ঘিরে তৈরি হওয়া একটি জনপ্রিয় বয়ান।
শেষ কথা
জীবনসঙ্গী হিসেবে সাংবাদিকরা সেরা কি না, তার কোনো বৈজ্ঞানিক র্যাঙ্কিং নেই। আবার তারা সবচেয়ে কঠিন সঙ্গী—এমন দাবিও সত্য নয়। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত—এই পেশার সঙ্গে সম্পর্ক মানে কিছু অতিরিক্ত বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া। অনিয়মিত সময়সূচি, হঠাৎ কাজের ডাক, মানসিক চাপ—এসবের পাশাপাশি থাকে মানুষের গল্প শোনার ক্ষমতা, নতুন কিছু জানার আগ্রহ আর পৃথিবীকে একটু বেশি কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা। তাই সাংবাদিকদের প্রেম অন্যদের চেয়ে আলাদা কিনা, তার উত্তর হয়তো পেশার মধ্যে নেই। উত্তরটা আছে এই প্রশ্নে—খবরের পেছনে ছুটতে থাকা একজন মানুষকে, তার ব্যস্ততা আর অস্থিরতাসহ ভালোবাসতে আপনি কতটা প্রস্তুত? কারণ, ব্রেকিং নিউজ একসময় পুরোনো হয়ে যায়। কিন্তু সম্পর্ক টিকে থাকে তখনই, যখন দুজন মানুষ একে অন্যের জীবনের খবর নিতে ভুলে যায় না।



