ছবি: এআই/বন্ধুসভা
দিনটি ছিল ৩১ জানুয়ারি ১৯৯৩। শীতের এক মলিন সকাল। ঘড়ির কাঁটা তখন প্রায় সকাল ১০টা ছুঁই ছুঁই। আমি কলেজপড়ুয়া এক তরুণ। বাবার অসুস্থতার কারণে দিনের পর দিন হাসপাতালের করিডরে উদ্বেগ আর আশার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি।
চিকিৎসকের দুঃসংবাদ
হঠাৎ একজন চিকিৎসক আমাকে তাঁর কক্ষে ডাকলেন। প্রথমে আমাদের পরিবারের খোঁজখবর নিলেন। তারপর কিছুক্ষণ নীরব থেকে ধীর কণ্ঠে বললেন, ‘আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আপনার বাবার অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন। তাঁকে আর বাঁচানো সম্ভব হবে না। যেকোনো সময় তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যেতে পারেন।’
কথাগুলো শুনে মনে হলো, যেন পৃথিবীটা হঠাৎ থেমে গেছে। বুকের ভেতর কেমন একটা শূন্যতা তৈরি হলো। একজন কলেজপড়ুয়া ছেলের জন্য এর চেয়ে বড় দুঃসংবাদ আর কী হতে পারে! চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এল। মনে হচ্ছিল, আমি যেন কোনো গভীর খাদে পড়ে যাচ্ছি।
চিকিৎসক আমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কিছু কিছু দুঃখ আছে, যা কোনো সান্ত্বনাতেই কমে না।
শেষ মুহূর্তের স্মৃতি
ধীরে ধীরে পিজি হাসপাতালের সি-ব্লকের ছয়তলার ৫০ নম্বর বেডের দিকে হাঁটতে লাগলাম। সেখানে শুয়ে ছিলেন আমার বাবা। তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে চিকিৎসকের কথাগুলো বারবার মনে পড়ছিল। বুকের ভেতর এক অজানা ব্যথা জমতে লাগল। সেই কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। শুধু মনে মনে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছিলাম, ‘হে আল্লাহ, আমার জীবনের যেকোনো কিছু নিয়ে নিন, কিন্তু আমার বাবাকে ফিরিয়ে দিন।’
বাবার পাশে বসে ভবিষ্যতের কথা ভাবছিলাম। সামনে কী আছে জানি না; শুধু জানতাম, বাবাকে হারানোর ভয় আমাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিচ্ছে।
ধীরে ধীরে দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এল। হাসপাতালের কক্ষটিতে একধরনের বিষণ্ন নীরবতা। বাবা হঠাৎ আমাকে কাছে ডাকলেন। ক্লান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘তোর মাকে দেখে রাখিস। মানুষ হওয়ার চেষ্টা করিস। জীবনে সৎ পথে চলবি।’
আরও অনেক কথা বললেন। জীবনের কথা, দায়িত্বের কথা, পরিবারের কথা। আজও সেই কথাগুলো কানে বাজে। কিছুক্ষণ পর তিনি বললেন, ‘আমার পা দুটো একটু ম্যাসাজ করে দে।’
আমি তাঁর পায়ের কাছে বসে ধীরে ধীরে ম্যাসাজ করতে লাগলাম। মনে হচ্ছিল, সময় যেন থেমে যায়। এই মুহূর্তটি যেন শেষ না হয়।
শেষ নিশ্বাস
হঠাৎ লক্ষ করলাম, বাবা গভীর নিশ্বাস নিতে শুরু করেছেন। ভয়ে দ্রুত চিকিৎসককে ডাকলাম। তিনি এসে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেন। কিন্তু তখন হয়তো সময় ফুরিয়ে আসছিল।
সন্ধ্যা প্রায় সাড়ে সাতটা। একসময় বাবা আমার কোলে ঢলে পড়লেন। সবকিছু যেন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ঘটে গেল। চিকিৎসক কিছুক্ষণ পরীক্ষা করে নীরব কণ্ঠে জানালেন, তিনি আর নেই।
মুহূর্তেই আমার পৃথিবীটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
আমি দিশেহারা হয়ে পড়লাম। পাশে কোনো আত্মীয় ছিল না। তখন মুঠোফোনের যুগও ছিল না যে কাউকে খবর দেব। হাসপাতালের সেই কক্ষে আমি যেন একা দাঁড়িয়ে ছিলাম—একজন ছেলে, যে মাত্র কয়েক মুহূর্ত আগে তার সবচেয়ে বড় আশ্রয়টিকে হারিয়েছে।
শোকের ছায়া ও দাফন
কিছুক্ষণ পরে মা এলেন। বাবার নিথর মুখ দেখে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়লেন। এরপর একে একে মামা, আত্মীয়স্বজনেরা হাসপাতালে পৌঁছালেন।
রাতের অন্ধকারে বাবার মরদেহ নিয়ে আমরা প্রথমে শেওড়াপাড়ার বাসায় ফিরলাম। বাড়িজুড়ে নেমে এল শোকের ছায়া।
পরদিন সকালে বাবাকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি শৈলানে যাত্রা করলাম। গ্রামের মানুষ, আত্মীয়স্বজন, পরিচিতজন—সবাই শেষবারের মতো তাঁকে দেখতে এলেন।
জানাজার নামাজ শেষে বাবাকে গ্রামের মাটিতে শায়িত করা হলো। মাটি দিয়ে যখন কবর ঢেকে দেওয়া হচ্ছিল, তখন মনে হচ্ছিল আমার জীবনের একটি অধ্যায়ও চিরতরে মাটির নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে।
সেদিন শুধু একজন মানুষকে দাফন করিনি; দাফন করেছিলাম আমার শৈশবের নিরাপত্তা, আমার সবচেয়ে বড় ভরসা, আমার জীবনের প্রথম অভিভাবককে।
বাবার স্মৃতি আজও পাথেয়
৩১ জানুয়ারি ১৯৯৩-এর সেই সন্ধ্যার পর থেকে জীবনের পথচলা আর আগের মতো ছিল না। বাবা ছাড়া, অভিভাবকহীন এক নতুন জীবনের শুরু হয়েছিল। কিন্তু আজও তাঁর শেষ কথাগুলো আমার পথচলার প্রেরণা হয়ে আছে—‘তোর মাকে দেখে রাখিস, মানুষ হওয়ার চেষ্টা করিস।’
বাবা নেই, কিন্তু তাঁর সেই উপদেশ, তাঁর ভালোবাসা এবং তাঁর স্মৃতি আজও আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
উপপরিচালক, বাংলা একাডেমি, ঢাকা।



