শহীদুল্লা কায়সার: সাহিত্য ও সংগ্রামের এক অমর প্রতীক
শহীদুল্লা কায়সার: সাহিত্য ও সংগ্রামের প্রতীক

শহীদুল্লা কায়সার: সাহিত্য ও সংগ্রামের এক অমর প্রতীক

বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাসে শহীদুল্লা কায়সার এক উজ্জ্বল নাম। ষাটের দশক থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত তাঁর জীবন ছিল সংগ্রাম, সাহিত্যচর্চা এবং আদর্শের এক অনন্য মিশেল। ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সালে আলবদর গোষ্ঠীর হাতে তাঁর নির্মম হত্যাকাণ্ড আজও জাতিকে ব্যথিত করে।

প্রাথমিক জীবন ও রাজনৈতিক যাত্রা

১৯২৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণকারী শহীদুল্লা কায়সার কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। দেশ বিভাগের পর ঢাকায় চলে আসেন এবং রাজনীতিতে সক্রিয় হন। তিনি গোপন কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হিসেবে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চা

১৯৫৬ সালে সাপ্তাহিক ইত্তেফাকে কাজ করার মাধ্যমে তাঁর সাংবাদিকতা জীবন শুরু হয়। পরে দৈনিক সংবাদের যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কারাগারের অন্ধকার কুঠুরিতে বসে তিনি সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। তাঁর প্রথম উপন্যাস সারেং বউ তাঁকে জাতীয় স্বীকৃতি এনে দেয়।

মহাকাব্যিক উপন্যাস সংশপ্তক

ষাটের দশকের মাঝামাঝি প্রকাশিত হয় তাঁর বৃহৎ উপন্যাস সংশপ্তক। এই উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যে এক যুগান্তকারী সংযোজন। সংশপ্তক শব্দের অর্থ যুদ্ধে জয়লাভ অথবা মৃত্যু। এই উপন্যাসে তিনি বিপ্লবী জাহেদের চরিত্রের মাধ্যমে নিজের আদর্শ ও সংগ্রামের কথা ফুটিয়ে তুলেছেন।

মুক্তিযুদ্ধ ও শেষ দিনগুলো

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয় মাস শহীদুল্লা কায়সার ঢাকায় অবস্থান করেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করতে নানা কাজ করেছেন। ডিসেম্বরের শুরুতে চূড়ান্ত লড়াই শুরু হলে তিনি নতুন উদ্যমে সংবাদপত্র প্রকাশের পরিকল্পনা করেন। কিন্তু ১৩ ডিসেম্বর তিনি নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথে পরিবারের মায়ায় ফিরে আসেন।

নির্মম হত্যাকাণ্ড

১৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় আলবদর গোষ্ঠীর সদস্যরা তাঁর কায়েতটুলির বাসায় হানা দেয়। মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা হত্যাকারীরা তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জিপে তুলে নিয়ে যায়। স্ত্রী পান্না কায়সার এবং বোন বেবী চেষ্টা করেও তাঁকে রক্ষা করতে পারেননি। এরপর তাঁর আর কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

সাহিত্যিক উত্তরাধিকার

শহীদুল্লা কায়সারের সমগ্র রচনাবলি বাংলা একাডেমি চার খণ্ডে প্রকাশ করেছে। এতে রয়েছে ছয়টি উপন্যাস, গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ এবং পত্রাবলি। তাঁর সাহিত্যকর্ম বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও মানবিক মূল্যবোধের এক জীবন্ত দলিল।

পরিবার ও স্মৃতি

তাঁর একমাত্র কন্যা শমী কায়সার বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী। মাত্র ১ বছর ১১ মাস বয়সে বাবাকে হারানো শমী আজও সেই শূন্যতা বয়ে বেড়ান। তিনি বাবার বন্ধুদের স্মরণ করে লেখেন বাবার কথা নামক স্মৃতিকথা।

অনুপস্থিতির বেদনা

বাংলাদেশের উত্থান-পতনের নানা ঘটনায় শহীদুল্লা কায়সারের অনুপস্থিতি গভীরভাবে অনুভূত হয়। তাঁর সাহিত্যকর্মে সৃষ্ট চরিত্রগুলো আজও আমাদের সমাজের সংগ্রামী মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। মানুষের প্রতি অগাধ দরদ ছিল তাঁর চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

শহীদুল্লা কায়সারের জীবন ও মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয় মুক্তিসংগ্রামীদের জন্য দুটি পথই থাকে: জয়লাভ অথবা মৃত্যু। তিনি বেছে নিয়েছিলেন দ্বিতীয় পথ, কিন্তু তাঁর সাহিত্যিক ও আদর্শিক উত্তরাধিকার চিরকাল বেঁচে থাকবে বাংলাদেশের ইতিহাসে।