সৈয়দ মুজতবা আলীর স্মৃতিচারণ: শান্তিনিকেতনের দিনগুলি ও বাবার রসবোধ
প্রতিকৃতি: মাসুক হেলাল। গ্রাফিকস: প্রথম আলো। ঘুরে বেড়ানোর অভ্যাস ছিল বাবার মজ্জাগত। বেশির ভাগ সময়ই তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন। তাই তাঁকে কাছে পাওয়াটা ছিল আকাশের চাঁদ পাওয়ারই মতো। আমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে ভাগ্যগুণে আমি বাবাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি; কাছে পেয়েছি। শান্তিনিকেতনে পড়াশোনার কারণেই বাবাকে খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। আমি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাভুক্ত স্কুল পাঠ ভবনের ছাত্র ছিলাম। সেখানে প্রায় আড়াই বছর ছিলাম আমরা। সে সময়ই তাঁর বিভিন্ন অভ্যাস, জীবনধারা সবকিছু দেখেছি পাশাপাশি থেকে।
রাত জেগে পড়া ও রসবোধ
পুরো রাত তিনি পড়তেন। বাবার পাশেই আমার শয্যা ছিল। তাঁর জন্য জেগে বসে থাকতে থাকতে আমি ঘুমিয়ে পড়তাম, ঘুম ভাঙলে দেখতাম, তখনো তিনি পড়ছেন। পড়তে পড়তে বাবা রাতকে সকাল বানিয়ে ফেলতেন। বাবার রসবোধ ছিল অসাধারণ। তাঁর প্রতিটি কথায় হিউমার ছিল। কি সাহিত্য, কি বাস্তব জীবন—সর্বত্র। রাতে পড়তেন বলে বাবার দুপুরে ঘুমানোর অভ্যাস ছিল। একদিন দুপুরে বাবার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটিয়ে এক বাউল গেয়ে উঠল—‘তোরা ভালো করে পড় বেক সকলেনইলে কষ্ট পাবি শেষে কালে...’ বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বাইরে কী হচ্ছে রে?’ আমি বললাম, ‘বাবা, বাউল একতারা বাজিয়ে গান করছে।’ বাবা আমাকে বললেন, ‘তুই ওকে বল, কুকুর আছে, কামড় দেবে।’
মজার গল্প ও ভোজনরসিকতা
বাবা অনেক মজার মজার রসিকতা করতেন, গল্প বলতেন। তেমনই একটি গল্পের কথা আমি অনেককে বলেছি। এক ভদ্রমহিলা তাঁর মেয়েদের ফ্যাশনেবল নাম রেখেছিলেন। বড় মেয়েটির নাম আতশীকায়া, তারপর মেয়ে হলে নাম রাখলেন বিটপীছায়া, তৃতীয়বার মেয়ে হলে ভদ্রমহিলা নাম রাখলেন, কুহকী মায়া, কিন্তু চতুর্থবারও যখন মেয়ে হলো, ভদ্রমহিলা তো আর নাম খুঁজে পান না। শেষে অস্থির হয়ে স্বামীকে ধরলেন, ‘এবার কী নাম রাখব গো?’ স্বামী তখন বললেন, ‘রেখে দাও নেপালি আয়া।’
বাবা ছিলেন ভোজনরসিক। তার মানে পেটুক বা খাদক ছিলেন, তা নয়। তবে খাবারদাবারে তাঁর ছিল প্রবল আকর্ষণ। নানা প্রকারের রান্না তিনি নিজেই রাঁধতে পারতেন। বহুদিন দেশের বাইরে ছিলেন। অনেক দেশে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন। তিনি কায়রোর আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। কাজেই আমাদের দেশের রান্না তো বটেই, ইউরোপ-মধ্যপ্রাচ্যের রান্নাসহ দেশ-বিদেশের বহু রান্না তিনি শিখেছিলেন। তেমনই একটি রান্না হলো ‘কারছি’; এটা গুজরাটিরা খায়। বেসনের সঙ্গে মসলার সংমিশ্রণে এই কারছি রান্না হয়। তারপর মাদ্রাজের একটি খাবার রশম, এটি স্যুপের মতো খেতে হয়। বাবার রান্না করা সে খাবারও আমি খেয়েছি; আর খেয়েছি দোলমা। ম্যাকারনি শান্তিনিকেতনে প্রথম আমাকে বাবা রান্না করে খাওয়ান।
বাবার দুটো প্রেশারকুকার ছিল। একটা হকিন্স, অন্যটা প্রেস্টিজ। হকিন্সে শুধু বাবা রাঁধতেন। প্রেস্টিজ অন্যরাও ধরতে পারত। বাবা একটা কথা প্রায়ই বলতেন, ‘দেখ ফিরোজ, রান্না বিষয়ে আমি এত বেশি লেখালেখি করেছি যে লোকে ভাবে, আমি খুব বেশি খাই।’ পেটুক ও ভোজনরসিকের পার্থক্য বোঝাতে গিয়ে তিনি বলতেন, ‘পেটুক যে, সে পরিমাণ বোঝে, প্রচুর খাবে সে। রান্নার হালহকিকত দেখা তার কর্ম নয়; তার পেট ভরলেই হলো। কিন্তু ভোজনরসিক খাবারের স্বাদ দেখবে; কোথায় মরিচ বেশি হলো, লবণ কম হলো। জিরেটা ঠিকমতো হয়নি বা মাংস-আলু গলেনি ইত্যাদি।’ বাবা খুব কম খেতেন, তবে যতটুকু খেতেন, একেবারে, রস গ্রহণ করে নিতেন।
শান্তিনিকেতনে শিক্ষকতা ও রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি
আমি পাঠ ভবনের ছাত্র ছিলাম। বাবা বিশ্বভারতীতে পড়াতেন। তিনি ছিলেন ইসলামি সংস্কৃতির হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট। আবার সন্ধ্যায় জার্মান ভাষাও শেখাতেন। সাইকেল চালিয়ে সন্ধ্যায় বিশ্বভারতীতে যেতেন, সঙ্গে আমিও। বিভিন্ন বয়সী ছাত্র ছিল বাবার। চমৎকার করে পড়াতেন। স্বর-গুজরালো ভাষা, উচ্চকণ্ঠ। পেছনের ছাত্ররাও তাঁর লেকচার শুনতে পেত। বাবা যখন পড়াতেন, তখন শ্রেণিকক্ষে পিনপতন নীরবতা থাকত। তিনি চাইতেন, ক্লাসে কেউ যেন অমনোযোগী না হয়। তিনি বলতেন, এই যে ছাত্ররা ক্লাসে মনোযোগ দিচ্ছে না, তার কারণ, শিক্ষকেরা ছাত্রদের মনোযোগ আকর্ষণে ব্যর্থ। তাঁরা আন্তরিক নন। আর এত নিম্নস্বরে লেকচার দেন যে পেছনের ছাত্ররা কিছুই শুনতে পায় না। তখন তারা একে অন্যের সঙ্গে কথা বলে।
বাবার সঙ্গে গুরুদেবের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। শান্তিনিকেতন, নির্মল পরিবেশ—সে সম্পর্ক আরও মজবুত হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাবার হৃদয়ে স্থায়ী আসন গেড়ে নিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে বাবার প্রথম দেখা সিলেটে। তারপর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতে ফিরে গেলে বাবা তাঁকে একটা চিঠি লিখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের জবাব এল—‘তোমার অন্তরের সুদূর ইচ্ছাইতোমাকে তোমার পথ দেখিয়ে দেবে।’ বাবা শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে পেয়েছিলেন। বাবা যখন শান্তিনিকেতনে পা রাখছেন, তখনো তাঁর মুখে সিলেট অঞ্চলের ভাষার টান। প্রথম দিন রবিঠাকুর বাবার কথা শুনে বলেছিলেন, ‘তোর মুখে তো এখনো কমলালেবুর গন্ধ আছে রে!’ রবীন্দ্রনাথকে খুব শ্রদ্ধা করতেন বাবা।
আড্ডাবাজ ও শেষ জীবন
খুব আড্ডাবাজ ছিলেন বাবা, ছিলেন গল্পবাজ। ভক্তরা তাঁর কাছে আসত গল্প শোনার জন্য। চমৎকার করে কথা বলতেন তিনি, আবেশে জড়িয়ে পড়ত শ্রোতারা। রাতভর গল্প বললেও বাবার গল্প বলা শেষ হতো না। শ্রোতারা বাড়ি ফিরতে ভুলে যেতেন। বেশ কতগুলো ভাষা জানতেন তিনি। প্রচুর পড়ারও অভিজ্ঞতা ছিল। তাঁর ভান্ডার থেকে তিনি একটার পর একটা গল্প বলে যেতেন। একটার পর একটা খেই ধরে, এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে দর্শন, ইতিহাস, ধর্ম, সাহিত্য কিছুই বাদ পড়ত না। তাঁর প্রতিটি গল্পে রস থাকত। হয়তো কোনো গুরুগম্ভীর বিষয় উপস্থাপনা করলেন, তা থেকেও রস বের হতো। সবার ওই একটাই কথা—সৈয়দদা রসিক বটে।
বাবা মারা যান পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে। স্ট্রোক করার পর তিনি বেশ ভালোই ছিলেন। আগের মতোই হাস্যরস করতেন। সবার সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা দিতেন। বিটিভিতে তিনি কিছু সাক্ষাৎকারও দিয়েছিলেন। সেসব সাক্ষাৎকার অবশ্য বিটিভির আর্কাইভে নেই। কলকাতায় স্ট্রোক হলে কিছুদিনের মধ্যেই বাবাকে আমরা ঢাকায় নিয়ে আসি। তখন তাঁর ডান হাতটা প্যারালাইসিস হয়ে গেছে। একজন লেখকের লেখার হাত নষ্ট হয়ে গেছে, এর চেয়ে মর্মান্তিক আর কী হতে পারে! বাবা শেষ কয়েক মাস নিদারুণ কষ্টে কাটিয়েছেন, কিছুই লিখতে পারতেন না, কী যে বেদনা! সম্ভবত ডিসেম্বর মাসে বাবাকে আমরা ঢাকায় নিয়ে আসি। ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪, তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
বাবার প্রথম ও শেষের দিকের লেখাগুলোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে; এটা একান্তই আমার মত। তবে বাবার যেসব লেখা বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল, সেগুলো প্রথম দিককার লেখা। যেমন দেশ-বিদেশে, পঞ্চতন্ত্র, চাচা কাহিনী, শবনম ইত্যাদি। তবে শেষ দিকের লেখা শাহরিয়ার খুব পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছিল। আমার বাবাকে বলা হয় বাংলা ভাষায় মজলিশি সাহিত্যের বাদশা। এই বাদশার কোনো কিছুই আর আমাদের কাছে অবশিষ্ট নেই। বাবা মারা যাওয়ার পর জাদুঘর কর্তৃপক্ষ বাবার স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য যা কিছু ছিল আমাদের কাছে চাইলে, আমার চাচা সৈয়দ মুরতজা আলীর পরামর্শে আমরা তা জাতীয় জাদুঘরে দিয়ে দিই। বাবার প্রিয় লাইব্রেরিতে প্রচুর বিদেশি ভাষার বই ছিল। আমাদের কাছে থাকলে নষ্ট হবে। জাদুঘরে থাকলে দেশের জনগণের, বাবার ভক্তজনের উপকারে আসবে, এসব ভেবেই সবকিছু জাদুঘরকে দিই।
