সুন্দরবনসংলগ্ন শাকবাড়িয়া নদীতে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে ভারত থেকে আসা ফ্লাই অ্যাশবাহী একটি জাহাজ। এমভি শরীয়ত উল্লাহ-৫ নামের জাহাজটিতে ছিদ্র হয়ে অনবরত পানি ঢুকছে। এ অবস্থায় আজ সোমবার সকাল থেকে জাহাজটিকে খুলনার কয়রা উপজেলার সুন্দরবনের পাশে নদীর একটি চরে আটকে রাখা হয়েছে। এতে পরিবেশ ও নৌপথ ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জাহাজের অবস্থা
জাহাজটির দায়িত্বপ্রাপ্ত মাস্টার সৈয়দ জুয়েল রানা আজ দুপুরে প্রথম আলোকে জানান, বাংলাদেশ থেকে খালি জাহাজ নিয়ে তাঁরা ভারতের কলকাতা বন্দরে ফ্লাই অ্যাশ আনতে গিয়েছিলেন। ১১ জুন বন্দরে মালামাল তোলার সময় ইঞ্জিনরুমের নিচে পানি জমতে শুরু করে। পাম্প চালিয়ে পানি কমানোর চেষ্টা করা হলেও পানি পুরোপুরি কমছিল না। তিনি বলেন, ‘তখনই বুঝতে পারি, জাহাজের কোথাও ছিদ্র হয়েছে। ৮৯০ টন ধারণক্ষমতার জাহাজ হলেও ঝুঁকি বিবেচনায় ৫৭২ টন ফ্লাই অ্যাশ নিয়ে যাত্রা শুরু করি। শুরুতে পাম্প চালিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেলেও পরে পানি ঢোকার পরিমাণ বাড়তে থাকে।’
ভারত থেকে যাত্রা
সৈয়দ জুয়েল রানা আরও জানান, ভারতের হেমনগর বন্দর থেকে জরুরি ছাড়পত্র নিয়ে জাহাজ চালিয়ে গতকাল রোববার রাতে তাঁরা বাংলাদেশের আংটিহারা শুল্ক স্টেশনের সামনে এসে পৌঁছান। তখন দেখা যায়, জাহাজে পানি ঢোকা মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। বর্তমানে জাহাজটি চলাচলের সম্পূর্ণ অযোগ্য অবস্থায় রয়েছে এবং বোঝাই করা ফ্লাই অ্যাশের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, এখন কোনোভাবে পাম্প চালিয়ে জাহাজটিকে ভাসিয়ে রাখা হয়েছে। সুন্দরবনের পাড়ঘেঁষা চরের পাশে নোঙর করে গাছের সঙ্গে রশি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। দ্রুত মালামাল অন্য জাহাজে স্থানান্তর করা না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা
আংটিহারা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ফারুক হোসেন বলেন, জাহাজটি ভারতের দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় বাংলাদেশে এসেছে। বর্তমানে এটি মোংলা বন্দর পর্যন্ত যাওয়ার মতো অবস্থায় নেই। পরিদর্শনে জাহাজটিকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পাওয়া গেছে। এ কারণে মূল নৌ চ্যানেল থেকে সরিয়ে আংটিহারা শুল্ক স্টেশনের বিপরীত তীরে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় রাখা হয়েছে।
পরিদর্শন প্রতিবেদন
কয়রা উপজেলার শাকবাড়িয়া নদীর তীরে অবস্থিত আংটিহারা শুল্ক স্টেশনের কর্মী মো. আবু বকর জানান, আজ সকালে জাহাজটি পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, সামনের হ্যাচে থাকা ফ্লাই অ্যাশের ওপর এক হাতের বেশি পানি জমে আছে। পরে বিষয়টি কোস্টগার্ড ও নৌ পুলিশকে জানানো হয়।
আবু বকর বলেন, জাহাজটি যাতে ডুবে মূল চ্যানেলে বাধা না সৃষ্টি করে, সে জন্য নদীর অপর পাড়ে সুন্দরবনের কাছে একটি চরে নোঙর করা হয়েছে। জাহাজটি রশি দিয়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। পানি অপসারণে জাহাজের নিজস্ব পাম্পের পাশাপাশি শুল্ক স্টেশনের একটি পাম্প ও অতিরিক্ত একটি তিন ইঞ্চি পাম্প চালানো হচ্ছে। পাম্প বন্ধ হলে ইঞ্জিন রুম অনেক আগেই ডুবে যেত। বর্তমানে সার্বক্ষণিক পানি সেচে বাইরে ফেলা হচ্ছে।
পরিবেশগত উদ্বেগ
বন বিভাগের খাশিটানা টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘জাহাজটি আমাদের ফাঁড়ির কাছাকাছি অবস্থান করছে। নৌ পুলিশ ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। জাহাজটি যাতে সুন্দরবনের নদীতে ডুবে পরিবেশগত ক্ষতির কারণ না হয়, সে জন্য দ্রুত বিকল্প জাহাজে মালামাল সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আমরাও সার্বক্ষণিক নজরদারিতে আছি।’
আইনগত ব্যবস্থা
এ ঘটনায় আজ কয়রা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারত থেকে ৫৭২ টন ফ্লাই অ্যাশ নিয়ে নরসিংদীর ঘোড়াশালের উদ্দেশে যাত্রা করার পর জাহাজের সামনের অংশ দিয়ে পানি ঢুকতে শুরু করে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে জাহাজটি কয়রা উপজেলার নদীর চরে রাখা হয়। আজ দুপুরে জাহাজটির মাস্টার থানায় এসে সাধারণ ডায়েরি করেন বলে জানিয়েছেন কয়রা থানার ওসি মো. শাহ আলম।
পটভূমি
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সূত্রে জানা গেছে, সিমেন্টশিল্পে ব্যবহৃত ফ্লাই অ্যাশের বড় একটি অংশ ভারত থেকে আমদানি করা হয়। নৌপথে পরিবহন ব্যয় কম হওয়ায় বাংলাদেশ–ভারত নৌ প্রটোকলের আওতায় নিয়মিত এসব পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করে।
আংটিহারা শুল্ক স্টেশনের কর্মী মো. আবু বকর জানান, ভারতের কলকাতা ও হেমনগর থেকে রায়মঙ্গল নৌসীমান্ত হয়ে জাহাজগুলো কয়রার আংটিহারা শুল্ক স্টেশনে পৌঁছে। সেখান থেকে মোংলা, খুলনা ও দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পণ্য পরিবহন করা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত এমভি শরীয়ত উল্লাহ-৫ জাহাজটিও এর আগে একাধিকবার একই নৌপথে চলাচল করেছে।



