১৯৯৮ সালের এক বিকেল। মাদ্রাসার ক্লাস শেষ হতে না হতেই মা এসে দাঁড়ালেন দরজায়। অদ্ভুত এক তাড়াহুড়ো তাঁর চোখেমুখে। কিছু না বলেই আমার ছুটি নিয়ে বাসায় নিয়ে এলেন। মনে হচ্ছিল, যেন ঘরের ভেতর কোনো অজানা আয়োজন অপেক্ষা করছে।
ঘরের ভেতর অচেনা এক পরিবেশ
ঘরে ঢুকতেই দেখি, পরিচিত এক ভাই আমার বড় বোনের পাশে বসে আছেন। চারপাশে একধরনের লাজুক নীরবতা। কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে মাকে জিজ্ঞেস করলাম, 'উনি এখানে কেন?' মা হেসে বললেন, 'ও তোর দুলাভাই।' এক মুহূর্তেই সবকিছু বদলে গেল। বুঝতে পারলাম, প্রিয় বোনটি আজ অন্য কারও জীবনের অংশ হয়ে গেছে। ঘরের ভেতর তখন ব্যস্ততা—কেউ রান্নায়, কেউ অতিথি আপ্যায়নে। অথচ আমার মনে কেমন এক অদ্ভুত শূন্যতা।
ছোট্ট বাড়ির বড় আয়োজন
আমাদের ছোট্ট বাড়িটি ছিল নিচু জায়গায়, পাশে বিস্তীর্ণ বিল। বর্ষা এলেই পানি উঠে যেত উঠানে। বাবা মাটি ফেলে একটি ঘর উঁচু করেছিলেন; সেখানে বসে আজকের এ আয়োজন। সেই ঘরেই বসে ছিলাম আমরা, জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে। দুলাভাইয়ের বাড়ি থেকে লোকজন এলেন—তাঁর বাবা, ভাইয়েরা, আরও অনেকে। পরিচয়, কুশল বিনিময়, এরপর খাওয়াদাওয়া। সবকিছু দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল, অথচ আমার মন যেন আটকে ছিল এক জায়গায়—বোন কি সত্যিই চলে যাবে?
প্রথমবার রেলগাড়ি দেখি
খাওয়ার পর ঠিক হলো, আজই বোন যাবে শ্বশুরবাড়ি গাজীপুর। আশ্চর্যের বিষয়, আমাকেও সঙ্গে নেওয়া হবে। আমি তখন দুই ভাই এক বোনের সংসারের মেজ ছেলে; বোনের সঙ্গে আমার বয়সের ব্যবধান মাত্র তিন বছর। তাই হয়তো আমাকে সঙ্গে নেওয়ার সিদ্ধান্ত। আমরা সবাই মিলে পৌঁছালাম ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট রেলস্টেশনে। জীবনে প্রথমবার রেলস্টেশন দেখা; তার চেয়েও বড় কথা, প্রথমবার রেলগাড়ি দেখা! দূর থেকে যখন ট্রেনটা এগিয়ে আসছিল, মনে হচ্ছিল যেন লোহার এক বিশাল দানব গর্জন করতে করতে আসছে। বিস্ময়ে তাকিয়ে বললাম, 'এটা কী?' কেউ একজন হেসে বলল, 'এটাই রেলগাড়ি।'
ট্রেনের জানালায় নতুন পৃথিবী
সেদিন প্রথমবার ট্রেনে উঠলাম আমি আর আমার বোন। জানালার পাশে বসে রেললাইনের পাশ দিয়ে ছুটে চলা—গাছপালা, ঘরবাড়ি, মাঠ—সবকিছু যেন নতুন এক পৃথিবী। সেই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। মনে হচ্ছিল, আমি যেন জীবনের এক নতুন দরজা খুলে ফেলেছি। ট্রেন ছুটে চলছিল, আর আমার চোখ ছুটে চলছিল জানালার বাইরে। প্রতিটি দৃশ্য মনে গেঁথে যাচ্ছিল স্থায়ীভাবে।
মাটির বাড়ির বিস্ময়
একটা সময় পর আমরা নামলাম কাওরাইদ স্টেশনে। সেখান থেকে রিকশায় করে রওনা দিলাম দুলাভাইয়ের বাড়ির দিকে। তিনি অনেক দিন পর বাড়ি ফিরছেন, তা–ও আবার নতুন বউকে নিয়ে; তাঁর চোখেমুখে ছিল অন্য রকম আনন্দ। বাড়িতে পৌঁছে আবারও এক নতুন বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। সব বাড়ি মাটির! আমার শহুরে চোখে তা যেন অবিশ্বাস্য। ইটের মতো দেখতে, অথচ সবাই বলছে এগুলো মাটির ঘর। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'এটা কীভাবে সম্ভব?' সবাই হেসে বলল, 'হ্যাঁ, এগুলোই মাটির বাড়ি।'
জীবনের গভীরতম অনুভূতি
আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। দেয়ালে হাত দিয়ে অনুভব করার চেষ্টা করলাম এটা কি সত্যিই মাটি? সেই স্পর্শে, সেই বিস্ময়ে, আমার ভেতর জন্ম নিল এক নতুন অনুভূতি; যা ছিল সরল, নির্মল, আর একেবারে অচেনা। সেদিন আমি শুধু একটি নতুন বাড়ি দেখিনি, শুধু প্রথমবার ট্রেনে চড়িনি; অনুভব করেছিলাম জীবনের এক অনন্য পরিবর্তন। প্রিয় বোনের বিদায়, নতুন জায়গার বিস্ময়, আর শিশুমনের প্রশ্নভরা কৌতূহল—সব মিলিয়ে সেই দিনটি হয়ে আছে জীবনের এক গভীরতম অনুভূতির দিন। আজও চোখ বন্ধ করলে দেখি একটি ট্রেন ছুটে চলছে, জানালার পাশে বসে আছে এক কিশোর, আর তার ভেতর জন্ম নিচ্ছে জীবনের প্রথম গভীর উপলব্ধি।



