‘প্রয়োজনে দলের জন্য জান দিয়ে দেব’— খেলতে গিয়ে এমন কথা কতবার শোনা যায়। কিন্তু দলের জন্য যখন সত্যিই ঢাল হয়ে দাঁড়াতে হয়, তখন সেটা কয়জন পারে? দলকে জেতানোর জন্য নিজেকে বলি দিতেও এক মুহূর্ত ভাবেন না খেলোয়াড়েরা। ২০১০ বিশ্বকাপে লুইস সুয়ারেজ পুরো বিশ্বের কাছে ভিলেন হয়েছিলেন নিজের দলকে বাঁচাতে গিয়ে। আফ্রিকার স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল সুয়ারেজের ‘হ্যান্ড অব গড’-এর কাছে।
ম্যাচের প্রেক্ষাপট
২০১০ বিশ্বকাপের প্রথম কোয়ার্টার ফাইনালে ঘানার মুখোমুখি হয় উরুগুয়ে। বিশ্বকাপে একমাত্র আফ্রিকান দল হিসেবে টিকে ছিল ঘানা। পুরো আফ্রিকা তাকিয়ে ছিল তাদের দিকে। প্রথমার্ধের শেষ মিনিটে গোল করে এগিয়ে যায় ঘানা। উরুগুয়েকে হারানোর স্বপ্ন তখন তাদের চোখেমুখে। ডিয়েগো ফোরলানের দুর্দান্ত ফ্রি কিকে সমতায় ফেরে উরুগুয়ে। নির্ধারিত সময় শেষে অতিরিক্ত সময়ের শেষদিকে ম্যাচ, ফলাফল তখনো ১-১।
সুয়ারেজের হ্যান্ডবল
শেষ মিনিটে ফ্রি কিক পায় ঘানা। জটলার মধ্য থেকে স্টিফেন আপিয়াহর শট প্রথমে হাঁটু দিয়ে ঠেকিয়ে দেন সুয়ারেজ। কিন্তু সেই বল রিবাউন্ডে হেড করেন ডমিনিক আদিয়াহ। আদিয়াহর বুলেট গতির হেড থামানোর সুযোগ ছিল না গোলরক্ষকের। কিন্তু সেখানেই গোলের রক্ষাকর্তা হয়ে হাজির হন সুয়ারেজ। গোললাইন থেকে হাত বাড়িয়ে থামিয়ে দেন নিশ্চিত গোল। হাত দিয়ে গোল ঠেকানোর অপরাধে রেফারি সরাসরি লাল কার্ড দেখান। ঘানার কপালে জুটল শেষ মিনিটের পেনাল্টি।
সুয়ারেজের কান্না ও পেনাল্টি মিস
লাল কার্ড দেখার পর অশ্রুসিক্ত চোখে মাঠ ছেড়ে সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন সুয়ারেজ। ঘানার তখন বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল খেলা সময়ের ব্যাপার মাত্র। ৬০ বছর পর বিশ্বকাপে সেমি খেলার স্বপ্ন যেন স্বপ্নই রয়ে গেল উরুগুয়ের। সুয়ারেজ নামটা তখন উরুগুয়ের ইতিহাসে ভিলেনদের তালিকায় এক নম্বরে। কিন্তু ঘটনার তখনো অর্ধেকটা বাকি। আসামোয়াহ জিয়ান এলেন পেনাল্টি শট নিতে, কিন্তু সেই শট গোলবারে লেগে উড়ে গেল মাঠের বাইরে। পুরো আফ্রিকাবাসী যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল এক মুহূর্তে। ক্যামেরার ফোকাস ঘুরে গেল সুয়ারেজের দিকে। চোখের পানি তখনো শুকায়নি, কিন্তু জার্সি ধরে সেই চিৎকার আর উদ্যাপন হয়ে রইল আইকনিক। মুহূর্তের মধ্যেই সুয়ারেজ ভিলেন থেকে পরিণত হলেন নায়কে।
উরুগুয়ের সেমিফাইনাল জয়
ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজল সঙ্গে সঙ্গেই। টাইব্রেকারে ৪-২ গোলে হারিয়ে ৬০ বছর পর বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের টিকিট কাটল উরুগুয়ে। এক ঘটনায় সুয়ারেজ পুরো আফ্রিকার ভিলেন হলেন বটে, কিন্তু হয়ে উঠলেন উরুগুয়ের জাতীয় বীর। তাঁকে কাঁধে তুলে উদ্যাপন করতেও ভুলেনি উরুগুয়ের খেলোয়াড়েরা। ম্যাচের পর সুয়ারেজ গর্ব করে বলেছিলেন, ‘আসল “ঈশ্বরের হাত” এখন আমার। আমিই এই বিশ্বকাপের সেরা গোলকিপিংটা করেছি!’ ডিয়েগো ম্যারাডোনার ১৯৮৬ বিশ্বকাপের ‘কীর্তি’তে যেন একটু ভাগ বসাতে চাইলেন। উরুগুয়ের ভক্তরা অবশ্য সেটাই ভাবেন।
ঘটনার বিশ্লেষণ
মজার ব্যাপার হলো সেদিন সুয়ারেজ শুধু একা নন, ডিফেন্ডার হোর্হে ফুসিলও লাফিয়ে উঠেছিলেন বল থামানোর জন্য। সুয়ারেজের হাতে লেগেই সেদিন উরুগুয়ে সেমিফাইনাল খেলার স্বপ্ন বেঁচে গিয়েছিল। অন্যদিকে ঘানার মানুষদের কাছে সুয়ারেজ পরিণত হয়েছিলেন আজীবনের ভিলেনে। সুয়ারেজ সেদিন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন, দলকে জেতাতে হলে শুধু ভালো খেললেই চলে না, সময়–সুযোগ বুঝে বাজিও ধরতে হয়। শেষ মুহূর্তের ‘হ্যান্ডবল’ করে একটা বাজি ধরেছিলেন সুয়ারেজ। সেটা ফলে যাওয়ায় হয়েছেন পুরো দেশের কাছে নায়ক।



