নাতনির বিয়েতে স্বপ্ন পূরণ: নানার ১১ বছরের সঞ্চয়ে ওজন সমান ৭০ কেজি কয়েন উপহার
নাতনির বিয়েতে নানার ১১ বছরের সঞ্চয়ে ওজন সমান কয়েন উপহার

নাতনির বিয়েতে স্বপ্ন পূরণ: নানার ১১ বছরের সঞ্চয়ে ওজন সমান ৭০ কেজি কয়েন উপহার

বগুড়ার ঠনঠনিয়া দক্ষিণপাড়ায় এক ব্যতিক্রমী আয়োজনে নাতনির বিয়েতে তার ওজন সমান পয়সা উপহার দেওয়ার স্বপ্ন পূরণ করেছেন আবদুল কাদের প্রামাণিক। তার মৃত স্ত্রী পাতা বেগমের এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রায় ১১ বছর ধরে জমানো কয়েন এক পাল্লায় আরেক পাল্লায় নাতনিকে রেখে ওজন মিলিয়ে উপহার দিয়েছেন তিনি। শুক্রবার (২৭ মার্চ) রাতে এই অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়, যা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

স্বপ্নের শুরু এবং সঞ্চয়ের গল্প

আবদুল কাদের প্রামাণিকের ভাতিজা আলমগীর হোসেনের বর্ণনা অনুযায়ী, আবদুল কাদের প্রামাণিক ছিলেন একজন মাইক্রোবাস চালক, কিন্তু বয়সের কারণে গত কয়েক বছর তিনি গাড়ি চালাতে পারেন না। তার স্ত্রী পাতা বেগমের স্বপ্ন ছিল তাদের প্রথম মেয়ে ফেরদৌসী বেগমের প্রথম মেয়ে নাইমা আক্তারের বিয়েতে নাতনির ওজন সমান পয়সা উপহার দেওয়া। এই স্বপ্ন পূরণে গত ১১ বছর ধরে তারা বাড়িতে কয়েকটি মাটির ব্যাংকে পাঁচ টাকার কয়েন জমাতে শুরু করেন।

দুর্ভাগ্যবশত, স্বপ্ন পূরণের আগেই ২০২৩ সালে পাতা বেগমের মৃত্যু হয়। তবে আবদুল কাদের তার স্ত্রীর স্বপ্ন পূরণে কয়েন সঞ্চয় অব্যাহত রাখেন। দেড় বছর আগে নাইমার বিয়ে হয় শাজাহানপুর উপজেলার বেজোড়া গ্রামের ঠিকাদার হৃদয় হাসানের সঙ্গে, কিন্তু তখন কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ কয়েন সঞ্চয় না হওয়ায় উপহার দেওয়া সম্ভব হয়নি। গত সপ্তাহে উপহার দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত কয়েন সঞ্চয় হলে তিনি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অনুষ্ঠানের বিবরণ এবং আবেগঘন মুহূর্ত

পরিকল্পনা অনুযায়ী, শুক্রবার সন্ধ্যায় ঠনঠনিয়ার দক্ষিণপাড়ার বাড়িতে নতুন করে নাতনির বউভাতের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে নাইমা, তার স্বামী হৃদয় হাসানসহ পরিবারের সব সদস্য এবং আত্মীয়-স্বজনকে দাওয়াত করা হয়। পোলাও, গরুর মাংস, মুরগির রোস্ট ও ডাল দিয়ে অতিথিদের আপ্যায়ন করা হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আপ্যায়ন শেষে রাত ৮টার দিকে বাড়িতে একটি বড় দাঁড়িপাল্লা আনা হয়। এক পাল্লায় নববধূর সাজে নাইমাকে বসানো হয়, অন্য পাল্লায় তুলে দেওয়া হয় জমানো কয়েন। ওজন হয় ৭০ কেজি ৩০০ গ্রাম, যার বেশিরভাগই পাঁচ টাকার কয়েন। ওজন শেষে কয়েনগুলো নাইমাকে উপহার দেওয়া হয়। এমন প্রতিশ্রুতি পূরণের দৃশ্য দেখতে বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন ছাড়াও প্রতিবেশীরা ভিড় জমান।

আবদুল কাদের প্রামাণিক বলেন, ‘কয়েক বছর আগে বগুড়ার শিবগঞ্জে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে কনের সমান ওজনে উপহার দেওয়ার খবর শুনেছিলেন আমার স্ত্রী। তখন বড় মেয়ের ঘরে প্রথম মেয়েসন্তান নাইমার জন্ম হয়। সে সময় আমার স্ত্রী নাতনি নাইমার বিয়ের সময় তার সমান ওজনে কয়েন উপহার দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন। এরপর দুজনে মিলে কয়েকটি মাটির ব্যাংকে কয়েন জমাতে শুরু করি। দেড় বছর আগে নাইমার বিয়ে হয়। কিন্তু তখন তার ওজন সমপরিমাণ কয়েন জমা হয়নি। এজন্য উপহার দিতে পারিনি। গত সপ্তাহে অনুমান হয়, জমানো কয়েনের ওজন ৬০-৭০ কেজি হবে। তখন উপহার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। এজন্য শুক্রবার সন্ধ্যায় নতুন করে বউভাতের আয়োজন করি। সেখানে দাঁড়িপাল্লায় ওজন করে নাতনির সমান ওজনে কয়েন উপহার দিয়েছি। এর মাধ্যমে পাতা বেগমের স্বপ্ন পূরণ করলাম। তবে সেটি তিনি দেখে যেতে পারলেন না। দেখলে অনেক খুশি হতেন। এরপরও স্ত্রীর স্বপ্ন পূরণ করতে পেরে আমি আনন্দিত।’

নাতনির প্রতিক্রিয়া এবং পারিবারিক আবেগ

এমন উপহার পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন নাইমা আক্তার। তিনি বলেন, ‘নানির দেওয়া এমন প্রতিশ্রুতির উপহার পেয়ে আমার পরিবারের সবাই খুশি হয়েছেন। নানি বেঁচে থাকলে অনেক খুশি হতেন। আমি আমার নানির আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। সবাই আমার নানা-নানির দোয়া করবেন।’

এই আয়োজনটি পারিবারিক ভালোবাসা এবং মমতার অনন্য উদাহরণ হিসেবে উপস্থিত অনেকে অভিহিত করেন। আবদুল কাদেরের দৃেঢ়তা এবং তার স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা এই ঘটনাকে বিশেষ মাত্রা দিয়েছে, যা সামাজিকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে।