বগুড়ায় নাতনির ওজনের সমপরিমাণ কয়েন উপহার: স্ত্রীর শখ পূরণে নানার অনন্য উদ্যোগ
বগুড়া শহরের ঠনঠনিয়া দক্ষিণপাড়ায় এক চাঞ্চল্যকর ঘটনায় নাতনি নাইমা বেগমের বৌভাতে তার ওজনের সমপরিমাণ কয়েন উপহার দিয়েছেন নানা আবদুল কাদের প্রামাণিক। শুক্রবার (২৭ মার্চ) রাতে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে একটি বড় দাঁড়িপাল্লার একপাশে নববধূর সাজে সজ্জিত নাইমা বেগম বসেন এবং অন্যপাশে রাখা হয় জমানো কয়েন, যার ওজন দাঁড়ায় ৭০ কেজি ৩০০ গ্রাম।
দশ বছরের সঞ্চয় ও একটি অসম্পূর্ণ শখ
স্থানীয় বাসিন্দা আলমগীর হোসেনের বর্ণনা অনুযায়ী, একসময়ের মাইক্রোবাস চালক আবদুল কাদের প্রামাণিকের স্ত্রী পাতা বেগমের দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল তাদের নাতনি নাইমা বেগমের বিয়ের সময় তার ওজনের সমপরিমাণ কয়েন উপহার দেওয়া। এই শখ পূরণের লক্ষ্যে গত প্রায় ১০ বছর ধরে দম্পতি বাড়িতে কয়েকটি মাটির ব্যাংকে পাঁচ টাকা মূল্যমানের কয়েন সঞ্চয় করতে শুরু করেন।
দুর্ভাগ্যবশত, পাতা বেগম ২০২৩ সালে মৃত্যুবরণ করার আগে তার এই স্বপ্ন পূরণ করতে পারেননি। তবে আবদুল কাদের স্ত্রীর শেষ ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে কয়েন সঞ্চয় অব্যাহত রাখেন, যদিও নাইমার বিয়ে দেড় বছর আগে পার্শ্ববর্তী শাজাহানপুর উপজেলার বেজোড়া গ্রামে ঠিকাদার হৃদয় হাসানের সঙ্গে হওয়ার সময় পর্যাপ্ত কয়েন জমা না থাকায় তখন উপহার দিতে ব্যর্থ হন।
বৌভাতের পুনরায় আয়োজন ও অভূতপূর্ব উপহার
সম্প্রতি কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ কয়েন সঞ্চয় হলে আবদুল কাদের শুক্রবার সন্ধ্যায় নিজ বাড়িতে নতুন করে নাতনির বৌভাতের আয়োজন করেন। অনুষ্ঠানে নাইমা, তার স্বামী হৃদয় হাসান, পরিবারের সদস্য এবং আত্মীয়-স্বজনদের দাওয়াত করা হয়, যেখানে পোলাও, গরুর মাংস, মুরগির রোস্ট ও ডালসহ নানা রকম খাবারের আয়োজন ছিল।
রাত ৮টার দিকে আপ্যায়ন শেষে বাড়িতে একটি বড় দাঁড়িপাল্লা আনা হয় এবং ওজন করার পর কয়েনগুলো নাইমা ও হৃদয় দম্পতিকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়। এই অনন্য দৃশ্য দেখতে স্থানীয়রা ব্যাপকভাবে ভিড় জমায়, এবং ঘটনার ভিডিও শুক্রবার রাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়, যা বগুড়ার জনগণের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
নানার আবেগ ও নাতনির প্রতিক্রিয়া
আবদুল কাদের প্রামাণিক জানান, তিনি আগে বগুড়ার শিবগঞ্জে একটি বিয়েতে কনের সমান ওজনে কয়েন উপহার দেওয়ার খবর পত্রিকায় দেখেছিলেন, যা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তার স্ত্রী পাতা বেগম এই শখ করেন। তিনি ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলেন, "শখ পূরণ ঠিকই হলো, কিন্তু আমার স্ত্রী পাতা বেগম সেটা দেখে যেতে পারলেন না। তবুও তার ইচ্ছা পূরণ করতে পেরে আমি অনেক খুশি।"
অন্যদিকে, কান্নাজড়িত কণ্ঠে নাতনি নাইমা বেগম তার নানার এই অভূতপূর্ব উপহারে পরিবারের সদস্যদের অত্যন্ত খুশি হওয়ার কথা জানান। তিনি বলেন, "নানি বেঁচে থাকলে তিনিও অনেক খুশি হতেন। আমি তার রুহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং আমাদের পরিবারের জন্য সবার দোয়া চাই।"
এই ঘটনা শুধু একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানই নয়, বরং দীর্ঘদিনের অঙ্গীকার ও ভালোবাসার এক জীবন্ত নিদর্শন হিসেবে স্থানীয়ভাবে আলোচিত হয়েছে, যা সামাজিক মাধ্যমেও ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।



